শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৬ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বিএনপি এখন কী করবে?

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৯:৫৫ পিএম

বিএনপি ও তার মিত্ররা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে তারা আর কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না। এর অংশ হিসেবে তারা আসন্ন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচন ও উপজেলা নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তাদের দেখাদেখি বাম গণতান্ত্রিক জোট ও চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলনও একই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নির্বাচনগুলোতে বাম জোট বা ইসলামী আন্দোলনের অংশ না নেওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। অন্তত নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করার ক্ষেত্রে তাদের শক্তি-সামর্থ্য বিবেচনায় নিলে এমন কথাই বলতে হয়। দেশের কোনো অঞ্চলেই বাম জোটের উল্লেখ করার মতো ভোট নেই বললে ভুল বলা হবে না। কিছু কিছু এলাকায় ইসলামী আন্দোলনের জামানত রক্ষার মতো ভোট থাকলেও তা আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে চ্যালেঞ্জ দেওয়ার মতো নয়।

তাই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বড় অংশের মত হলো, বিএনপি নির্বাচনগুলোতে অংশগ্রহণ করুক, এতে নির্বাচনগুলো অন্তত একতরফা হবে না। এমনকি বিশ্লেষকদের মধ্যে যারা বিএনপিকে সমর্থন করেন তাদেরও অনেকে এমনটা মনে করেন। তাদের যুক্তি হলো, যেহেতু বিএনপির এখন প্রধান কাজ হলো সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করা, আর রাজপথে জোরদার আন্দোলন গড়ে তোলার শক্তি দলটির নেই, তাই সামনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে অংশগ্রহণই তাদের জন্য সবচেয়ে ভালো পন্থা হতে পারে। তারা এমনকি বিএনপি ও তার নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের যে আটজন একাদশ সংসদ নির্বাচনে পাস করেছেন, তাদেরকেও পরামর্শ দিচ্ছেন অবিলম্বে শপথ নিয়ে সংসদে গিয়ে দল ও জোটের কথাগুলো বলতে। এতে অন্তত, বাইরে বসে কথা বললে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যতটুকু জায়গা পাওয়া যাবে, তার চেয়ে বেশি ফল পাওয়া যাবে। কারণ সংসদীয় রাজনীতিতে সংসদই সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। তারা মনে করেন, সংখ্যা এখানে কোনো বিষয় নয়, সরকারবিরোধী  একটা কণ্ঠের উপস্থিতিই বড় বিষয়।

আন্দোলন করার শক্তি যে বিএনপির নেই তা বোঝার জন্য সবচেয়ে কাছের উদাহরণ হলো, চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাভোগের বিষয়ে দলটির কুসুম-কোমল প্রতিক্রিয়া। দুর্নীতির দায়ে দ- পেয়ে এক বছর ধরে তিনি কারাগারে বন্দি; গত ৮ ফেব্রুয়ারি ছিল তার কারাগারে যাওয়ার বছরপূর্তির দিন। কিন্তু একসময়ের দোর্দ- প্রতাপশালী প্রধানমন্ত্রীর অনুসারীরা অনেকটা নিভৃতেই তা চলে যেতে দিয়েছেন।কিন্তু এসব কোনো কিছুই বিএনপির নীতিনির্ধাকদের, আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে দলটির লন্ডনপ্রবাসী সুপ্রিম লিডার, দুর্নীতি ও নানা ফৌজদারি অপরাধের কারণে এরই মধ্যে যিনি আদালত কর্তৃক বিভিন্ন মেয়াদে সাজা পেয়েছেন, বোঝানো যাচ্ছে না বলে মনে হচ্ছে। তারা বলছেন, এ সরকারের অধীনে নির্বাচন করে আর ‘লাভ’ হবে না। তাদের মতে, এমনকি স্থানীয় কোনো নির্বাচনে অংশ নিলেও নাকি এ সরকারকে ‘বৈধতা’ দেওয়া হবে। এ সরকারকে বিএনপি ও তার মিত্ররা ‘অবৈধ’ বলছে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর থেকে। এমনকি ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিপুল বিজয় পেয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পরও বিএনপি বলেছিল, এটা হলো ফখরুদ্দীন-মইনউদ্দিনের অবৈধ সরকারের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ‘আঁতাতের’ ফল। ওই নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ফখরুদ্দীনের সেনাসমর্থিত সরকারের অধীনে। কিন্তু বাস্তব যে সত্যটা আমাদের সামনে জ্বলজ্বল করছে তা হলো, ওই সব কিছুই এখনো কথার কথা রয়ে গেছে, আওয়ামী লীগ টানা ১৫ বছরের জন্য ক্ষমতায় আছে। শুধু তা নয়, এ সরকারের অধীনে ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনটি ছাড়া আর প্রায় সব কটি নির্বাচনেই তারা অংশ নিয়েছে। এগুলোর বেশ কটিতে তারা বিপুল ব্যবধানে জয়লাভও করেছে।অন্তত রাজনীতিতে ‘বর্জনে অর্জন নেই’ কথাটা এমনি এমনি চালু হয়নি। মূল ধারার একটা দল একটা জাতীয় নির্বাচন তখনই বর্জন করতে পারে, যখন তা বন্ধ করা যাবে বা এর মাধ্যমে যে সরকার গঠিত হবে তাকে দ্রুত আরেকটা নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাধ্য করা যাবে। না হলে সরকার তার মতো করে চলতে থাকবে আর ওই বর্জনকারী দলটিকে মূল ধারার রাজনীতি থেকে ছিটকে যাওয়ার শঙ্কায় পড়তে হবে। বিএনপি আজকে এমনই একটা অবস্থায় পড়েছে। এটা কি অস্বীকার করা যাবে যে ২০১৪ সালে নির্বাচন প্রতিরোধ করতে গিয়ে আন্দোলনের নামে যদি নাশকতা না করা হতো,  তাহলে আজকে সরকারের পক্ষ থেকে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে যেভাবে পাইকারি হারে নাশকতার মামলা দেওয়া হচ্ছে, অন্তত তা সম্ভব হতো না।

স্মরণ করা যেতে পারে, আওয়ামী লীগ জন্মের পর থেকে এ পর্যন্ত দুবার নির্বাচন বর্জন করেছে প্রথমবার ১৯৮৮ সালে এরশাদের সামরিক শাসনের সময়, দ্বিতীয়বার ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপি তখন ক্ষমতায়। দুবারই শেষমেশ আওয়ামী লীগই বিজয় অর্জন করেছে। ১৯৮৮-এর একতরফা নির্বাচন করে এরশাদ দুবছরও ক্ষমতায় থাকতে পারেনি; আর ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির একতরফা নির্বাচন করে বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে পেরেছিল মাত্র আড়াই মাস। নির্বাচন বর্জনের এ ধারা দেখে কেউ কেউ বলেন, বিএনপি আওয়ামী লীগের জুতা পায়ে দিয়ে হাঁটার চেষ্টা করছে। কিন্তু বিএনপি খেয়াল করেনি, জুতাগুলো তাদের পায়ের চেয়ে বেশ বড়, যা পায়ে দিয়ে স্বাভাবিকভাবে হাঁটা যায় না।

তা ছাড়া, বিএনপির ইতিহাসে কোনো সফল গণ-আন্দোলন পরিচালনার রেকর্ড নেই। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় বসার পর নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিএনপি জামায়াত ও জাতীয় পার্টিকে নিয়ে সংসদ বর্জন করে আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সে-আন্দোলন অচিরেই মুখ থুবড়ে পড়েছিল। আর আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে পেরেছিল। এরশাদবিরোধী আন্দোলনেও আওয়ামী লীগ যখন তার জোটসঙ্গীদের নিয়ে ১৯৮৬-এর নির্বাচনে গেল, বিএনপি তখন মাঠ চাঙ্গা করতে পারেনি।

বিএনপি যে একাদশ সংসদ নির্বাচনকে ‘জালিয়াতিপূর্ণ’ ও ‘প্রতারণার’ নির্বাচন বলছে, অভিযোগ তুলছে যে ২৯ ডিসেম্বর রাতেই ভোটবাক্স ভর্তি করা হয়েছে, যে কারণ দেখিয়ে তারা এখন স্থানীয় সরকার নির্বাচনও বয়কট করছে, তার সপক্ষে কি ন্যূনতম সাক্ষ্য-প্রমাণ তারা হাজির করতে পেরেছে? দলটির নেতারা ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঘোষণা দিয়েছিলেন, সাক্ষ্য-প্রমাণ ‘সংগ্রহ’ করে এ বিষয়ে অচিরেই তাদের পক্ষ থেকে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করা হবে। এ জন্য তারা বেশ ঘটা করে সব প্রার্থীকে ঢাকায় ডেকে এনে প্রতিনিধি সভাও করলেন। কিন্তু তর্জন গর্জনই সার। এখন তারা বলছেন নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করে কোনো লাভ হবে না। তা লাভ যে হবে না এ বিষয়টা তারা আগে বোঝেননি কেন?

আরও হাস্যকর হলো, নির্বাচনের দিন বেলা ১১টার দিকেও বিএনপি মহাসচিব বলেছেন, যেভাবে নির্বাচন হচ্ছে সেভাবে সারা দিন চললে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে, আর এখন বলছেন আগের রাতেই ভোট হয়ে গেছে। বিষয়টা হাস্যকর এ কারণে যে বিএনপি দাবি করে, জনগণ মুখিয়ে ছিল তাদেরকে ভোট দেওয়ার জন্য, সে অনুসারে তারা জনগণের প্রতি ভোটকেন্দ্র পাহারা দেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছিলেন, তা ভোটকেন্দ্রগুলো কি লোকালয়ে ছিল না? সেখানে রাতে কোনো অনিয়ম হলে তারা টের পেল না? এতে অন্তত এটা পরিষ্কার যে বিএনপি এরই মধ্যেই একটা জনবিচ্ছিন্ন দলে পরিণত হয়েছে। আর একটা জনবিচ্ছিন্ন দল রাগ করল না অভিমান করল তার খোঁজ কেউ রাখে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নির্বাচনে ত্রুটি-বিচ্যুতি যাই ঘটুক, তার ফল দেশে যেমন প্রশাসন, ব্যবসায়ী সম্প্রদায়সহ প্রায় সব মহল মেনে নিয়েছে, আন্তর্জাতিক মহলও তাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এ অবস্থায় নির্বাচন নিয়ে বিএনপির অভিযোগ শোনার ধৈর্য কারোরই থাকার কথা নয়।

বিএনপি যদি উপজেলা বা অন্যান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন বয়কট করে, এতে দলটির নিজেরই ক্ষতি হবে। কারণ স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য তৃণমূল পর্যায়ে একদিকে দল গোছানোর, আরেকদিকে নতুন নেতৃত্ব তুলে আনার সুযোগ তৈরি করে দেয়। বিএনপি সেই সুযোগটা হারাবে। তা ছাড়া দলীয় ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হলেও এখনো এসব নির্বাচনে স্বতন্ত্র অনেক জনপ্রিয় প্রার্থীর পাদপ্রদীপের আলোয় আসার সুযোগ আছে। অর্থাৎ বিএনপি না এলেও নির্বাচনগুলো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। শুধু আশঙ্কা যা থাকে, তা হলো বিএনপির অনুপস্থিতিতে কোনো কোনো আসনে ‘নিশ্চিত বিজয়ের প্রত্যাশায়’ সরকারি দলের একাধিক প্রার্থী দাঁড়িয়ে যেতে পারে এবং জয়লাভের জন্য তারা  বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে। এতে নির্বাচনে সহিংসতার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যেতে পারে। তবে স্থানীয় প্রশাসন যদি এসব ক্ষেত্রে তাদের অঙ্গীকার অনুযায়ী নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করে, তাহলে সে আশঙ্কা দিনশেষে অমূলক বলে প্রমাণিত হতে পারে।যা হোক, রাজনীতি একদিকে যেমন দুই পক্ষের মধ্যে আদর্শের লড়াই, আরেকদিকে তা কৌশলেরও খেলা। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, বিএনপি আওয়ামী লীগের নেওয়া বিভিন্ন কৌশলের সঙ্গে পেরে উঠছে না। বিএনপির এই যে ব্যর্থতা তার কারণ শুধু এ নয় যে দলটির প্রাণভোমরা যে জিয়া পরিবার সে, পরিবারটি এখন প্রায় ছিন্নভিন্ন; অথবা এখন যারা দলটিকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারা প্রতিপক্ষ দলটির নেতৃত্বের তুলনায় কম প্রাজ্ঞ বা রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় পিছিয়ে। সমস্যার কারণটা আসলে এর চেয়েও অনেক গভীরে নিহিত। আমাদের আলোচনাকে আগামী দিনে সেই গভীরে নিয়ে যাব এ প্রত্যাশাই করছি। আলোচনাটা দরকার এ কারণে নয় যে বিএনপি দুর্বল হয়ে গেলে দেশ কার্যত বিরোধী দলবিহীন হয়ে পড়বে বরং এ কারণে যে স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত এখানে যে একটাও কার্যকর বিরোধী দল দাঁড়াল না তার কারণ অনুসন্ধানও জরুরি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত