মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

লাল নববর্ষ

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১০:০৭ পিএম

৫ ফেব্রুয়ারি। চাইনিজদের নববর্ষ ও বসন্ত দুয়েরই আগমন ঘটেছে একই সময়। বিশ্বের সবচেয়ে বর্ণাঢ্য ও জাঁকজমকপূর্ণ উৎসবগুলোর একটি হচ্ছে এই নববর্ষ। এই নববর্ষের সঙ্গে বেশ কিছু উপকথা ও রীতি-নীতি জড়িয়ে রয়েছে। ঐতিহ্যবাহী নাচ ও বর্ণিল মিছিল, লণ্ঠন উৎসব, আতশবাজির খেলা, ফানুস ইত্যাদি এই উৎসবটিকে করে তোলে আরও জমকালো। এটাকে বলা হয়ে থাকে চীনের সব থেকে বড় উৎসবও। শুধু চীন কেন পৃথিবীর বড় উৎসবগুলোর মধ্যেও এটি অন্যতম। এই উৎসব ঘিরে যে পরিমাণ মানুষ বাড়িতে ফেরে তা সামাল দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয় চীনা প্রশাসনকে। উৎসব সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছেন লায়লা আরজুমান্দ

দানব ও নববর্ষ

চীনা নববর্ষ নিয়ে অনেক ধরনের কল্পকাহিনী প্রচলিত রয়েছে। তার মধ্যে সব থেকে বেশি প্রচলিত ‘নিয়েন’-এর গল্প। এর থেকে ধারণা পাওয়া যায় কেন চীনা নববর্ষে লাল রংকে প্রাধান্য দেওয়া হয়? কেন আলো বা আগুন জ্বালানো হয়? কেন এত জাঁকজমকভাবে এটাকে পালন করা হয়। খ্রিস্টপূর্ব এক হাজার সালের কাছাকাছি সময়ের অধিবাসীরা বসন্ত উৎসবকে চীনা ভাষায় ‘নিয়েন’ বলত। ‘নিয়েন’ অর্থবছর, তবে তখনকার বছরের অর্থ ছিল সুফসল। মানে শস্যের ভালো ফলন হতো।

সেই সময়ে ‘নিয়ান’ নামে একটি দানব ছিল, যা দেখতে খুবই ভয়ংকর। সে বসবাস করত গভীর সমুদ্রে। বছরে একবার গভীর রাতে সে ওপরে উঠে এসে মানুষ এবং প্রাণী যা পেত সব খেয়ে ফেলত। আর সেই দিনটাতে সবাই গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে পাহাড়ে লুকিয়ে থাকত।

একবার বছরের এই দিনটাতে তাদের গ্রামে আশ্রয় নিতে আসল এক ভিখারি। কিন্তু সেই সময় গ্রামের সবাই বাড়িঘর ছেড়ে পলায়নে ব্যস্ত। তবে গ্রামের এক বৃদ্ধা তাকে আশ্রয় দিলেন। ভিখারি জানালেন, এই আশ্রয়ের পরিবর্তে তিনি দানবটিকে আজীবনের জন্য তাড়িয়ে দেবেন।

রাত যখন গভীর হলো, দানব নিয়ান সাগর ছেড়ে উঠে এলো ওপরে। ঢুকল গ্রামে। পুরো গ্রাম অন্ধকার থাকলেও সেই বৃদ্ধার ঘরে আলো জ্বলছিল। দরজা-জানালায় ঝুলছিল লাল কাগজ। নিয়ান খুব ধীরে যেই না ঘরের কাছে গেল, অমনি তাকে ঘিরে ফুটতে শুরু করল আতশবাজি বা বিস্ফোরক। আর সেই সময় অট্টহাসিতে লাল পোশাক পরে সেই ভিখারি হাজির হলেন দানবের সামনে। দানব ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ভয়ে পড়িমরি করে দৌড় লাগাল সমুদ্রে। সেই যে গেল আর ফিরে এলো না। কারণ এই দানব লাল রং, আতশবাজি, আগুন এসব ভয় পেত।

পরদিন গ্রামবাসী ফিরে তাদের ঘরবাড়ি অক্ষত অবস্থায় আছে দেখে খুব অবাক হলো। সেই থেকে প্রতি বছর এই দিনটি পালন করা হয় এভাবেই। বছরের প্রথম দিনে তারা একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করে। ঘর-বাড়ি সাজায় লাল রঙের জিনিস দিয়ে। পোড়ায় আতশবাজি-পটকা, জ্বালায় লণ্ঠন, ওড়ায় ফানুস।

চীনের বৃহত্তম উৎসব

চাঁদের হিসেবে চলে চীনা ক্যালেন্ডার। তাই প্রতি বছর একই সময় এই উৎসব পালিত হয় না। এবার ৫ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়েছে চন্দ্রবছর, আর এর শুরু মানেই চীনের সবচেয়ে বড় উৎসব। এই চন্দ্রবর্ষ চীনা নববর্ষ নামেই অধিক পরিচিত। একে এটিকে চীনের বসন্ত উৎসবও বলা হয়। নববর্ষের প্রথম দিনে ধর্মীয় আচার দিয়ে শুরু হয় এই উৎসব। শেষ হবে ১৯ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় প্রদীপ প্রজ্ব্ালন উৎসবের মধ্য দিয়ে। নববর্ষের আগের দিন ঐতিহ্যবাহী খাবারের আয়োজন করা হয়। পরিবারের সবাই মিলে এই নৈশভোজে অংশ নেওয়া এই উৎসবেরই অংশ। উৎসব উপলক্ষে ছুটি শুরু হয়ে গেছে গত ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে। মোট সাত দিন আনুষ্ঠানিকভাবে সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। এরই মধ্যে দেশটিতে শুরু হয়ে গেছে সাজ সাজ রব। পুরো দেশ ছেয়ে গেছে আলোকসজ্জায়। চলছে বাড়ি ফেরার ধুম। খাওয়াদাওয়া, কেনাকাটার ধুম বাড়তে থাকে।

রাষ্ট্রীয়ভাবে নববর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠানকে লুনার ইয়ার বলা হয়। চীনা নববর্ষের এ বার্ষিক উদযাপন দেখতে বেইজিংয়ে লাখ লাখ মানুষ জড়ো হয়। নাচ, গান, প্যারড, অভিনয় ইত্যাদি নানা বর্ণিল প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে চার ঘণ্টা ধরে চলে এ আয়োজন। এ অনুষ্ঠান রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্প্রচারও করা হয়। চন্দ্রবর্ষবরণের বর্ণাঢ্য এ আয়োজন টেলিভিশনের পর্দায় দেখে কোটি কোটি মানুষ।

এবারের প্রতীক শূকরছানা

চীনের নববর্ষ তাদের নিজস্ব রীতিতে পালিত হয়। তাদের রাশিচক্রে ১২টি প্রতীক রয়েছে। প্রতীকগুলো ১২টি প্রাণীর নামে। প্রতি বছরই এই প্রতীকগুলো ঘুরেফিরে আসে। এবাবের প্রতীক শূকরছানা। এই প্রতীক এসেছিল ১৯২৩, ১৯৩৫, ১৯৪৭, ১৯৫৯, ১৯৭১, ১৯৮৩, ১৯৯৫ ও ২০০৭ সালে। আবার সামনে আসবে ২০৩১, ২০৪৩ সালে। বাকি প্রতীকের প্রাণীগুলো হলো ইঁদুর, ষাঁড়, বাঘ, ড্রাগন, সাপ, ঘোড়া, ভেড়া, বানর, মোরগ ও কুকুর। পঞ্জিকা অনুযায়ী এই প্রতীক নির্ণয় করা হয়ে থাকে।

এই বছরকে আশাবাদ, উদ্যম, পরিশ্রম, সমৃদ্ধির বছর হিসেবে বিবেচনা করেছেন চীনা রাশি বিশেষজ্ঞরা। শূকরছানা প্রতীকের শক্তি হচ্ছে সৌভাগ্য, সমৃদ্ধি ও সন্তুষ্টি।

ঐতিহ্যবাহী নাচ

বর্ষবরণের অন্যতম অনুষঙ্গ ঐতিহ্যবাহী নাচ ও বর্ণিল মিছিল। বাদ্যের তালে, নাচেগানে মুখরিত থাকে চারপাশ। তাদের ঐতিহ্যবাহী নাচে ড্রাগন ও সিংহ বিশেষ স্থান জুড়ে আছে। বিশালাকৃতির ড্রাগনকে নিয়ে অনেক মানুষকে একসঙ্গে নাচতে দেখা যায়। তাদের পরনে থাকে বিশেষ পোশাক। আবার সাধারণ পোশাক পরেও ড্রাগন নিয়ে নাচতে দেখা যায় তাদের। সবচেয়ে বড় আকৃতির যে ড্রাগন রেকর্ড করা হয়েছে, সেটার দৈর্ঘ্য ১৮ হাজার ৩৯০ ফুট। সিংহ নাচে সাধারণত থাকে দুজন। বিশেষ পোশাক পরে তারা শারীরিক কসরত করতে থাকে। এই নাচের কোনো বয়স ভেদ নেই। শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই আনন্দের সঙ্গে এই নাচে অংশ নেয়, উপভোগও করে। স্থানীয় উদ্যোগের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয়ভাবেও এই নাচের আয়োজন করা হয় রাজধানী বেইজিংসহ অন্য প্রদেশগুলোর রাজপথে।

লণ্ঠন উৎসব

চীনা বর্ষবরণ ও বসন্ত উৎসবের একটি অন্যতম অনুসঙ্গ লণ্ঠন। এই উৎসব ঘিরে দেখা যায় ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। আলোকসজ্জায় ছেয়ে যায় পুরো দেশ। লণ্ঠন জ্বালিয়ে উৎসব পালনের প্রচলন শুরু হয় আজ থেকে প্রায় দুই হাজার বছর আগে। এই উৎসবে জ্বালানো হয় লণ্ঠন, পোড়ানো হয় আতশবাজি ও পটকা, ওড়ানো হয় ফানুস। লুনার ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, বছরের প্রথম ১৫ দিন হয় এই উৎসব। সেই হিসাব অনুযায়ী এবার ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চীনের বাড়িতে বাড়িতে ও পথে চলবে আলোর এই খেলা। তবে বিশেষ করে সন্ধ্যা হলে মেঘমুক্ত আকাশে উড়িয়ে দেওয়া হবে হাজার হাজার ফানুস। শুরু হবে আতশবাজির খেলা। চায়নিজরা বিশ্বাস করে, তীব্র এই আতশবাজির শব্দে এবং উজ্জ্বল আলো দেখে সব অশুভ শক্তি ভয় পেয়ে দূরে সরে যাবে।

লাল রঙের আধিপত্য

লাল রং চীনা নববর্র্ষে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। চায়নিজদের কাছে লাল রং মানে আনন্দ, শান্তি ও সুখের প্রতীক। লাল রংকে দেখে ভয় পেয়ে পালিয়ে যায় অশুভ শক্তি। প্রতিটি পরিবার তাদের বাড়িঘর সাজায় এই রঙের জিনিস দিয়ে। নিয়ানের গল্পের কথা মনে আছে? শুধু আতশবাজি বা পটকা দেখে কিন্তু ভয়ে পালিয়ে যায়নি নিয়ান। লালও কিন্তু নিয়ানকে ভয় দেখানোর একটি অস্ত্র ছিল। চায়নিজরা ঘরে-বাইরে ঝুলিয়ে রাখে লাল লণ্ঠন। ঘরের দেয়ালে করে লাল রং। দরজা-জানালায় ঝুলিয়ে রাখে লাল পর্দা। মোট কথা, তাদের সব কিছুতেই থাকে লাল রঙের প্রাধান্য। তবে শুধু বাড়ি ঘরে কেন, খাবারদাবারের প্লেট, টেবিল ডেকোরেশন, গিফটের প্যাকেট, নতুন পোশাকে সব কিছুতে থাকে লালের ছোঁয়া।

উদ্্যাপন হয় বিশ্বজুড়ে 

পুরো বিশ্বজুড়ে উদ্্যাপিত হয় এই নববর্ষ। এশিয়ার বাইরে লন্ডন, ইংল্যান্ড, সান ফ্রানসিসকো, ইউএসএ, সিডনি, অস্ট্রেলিয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে অনেক জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হয় এই নববর্ষ। বর্ণিল সাজে সেজে ওঠে শহরগুলোর রাজপথ। চোখধাঁধানো এ আয়োজন দেখতে ঢল নামে হাজারো দর্শনার্থীর। একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া, সিংহ নাচ, ড্রাগন নাচ, বাহারি আতশবাজি ও নানা রকম উৎসবের আয়োজন করা হয় শহরগুলোতে। তা ছাড়া ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, জাপান, ভারত এমনকি বাংলাদেশেও এই নববর্ষ উদযাপন করা হয়।

৩০ কোটি লোকের বাড়ি ফেরার ঝক্কি

নববর্ষ বা বসন্ত উৎসবটি পরিবারের সঙ্গে কাটাতে প্রতি বছর বাড়ি ফেরে প্রায় ৩০ কোটির মতো মানুষ। ৪০ দিনের এই উদযাপনে সরকারি ছুটি থাকে সাতদিন। এর সঙ্গে অনেকে সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে নেয়। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠান থেকেও পায় বাড়তি ছুটি।

দেশটির বেশির ভাগ বাবা-মায়েরা গ্রামে থাকে। কাজের প্রয়োজনে সন্তানদের থাকতে হয় শহরে। এই লম্বা ছুটি তাই পরিবারের সঙ্গে কাটাতে সবার বাড়ি ফেরা শুরু হয়। যারা দেশের বাইরে থাকে, তারাও এই সময় দেশে ফিরে আসে। তাই এই বাড়ি ফেরা ‘ওয়ার্ড লারজেস্ট অ্যানুয়াল হিউমান মাইগ্রেশন’ হিসেবেও পরিচিত। একসঙ্গে এত মানুষের ঢল সামাল দিতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয় চীনা প্রশাসনকে। এর মধ্যে দেশটিতে সবচেয়ে জনপ্রিয় হচ্ছে রেল ভ্রমণ। তবে এই সময়ে রেল স্টেশনে দেখা যায় বেশ বিড়ম্বনা। টিকিটের সংকট থাকে সবচেয়ে বেশি। দেখা যায় মাত্রাতিরিক্ত ভিড়। স্টেশনের খাবারের দোকানগুলোতে দেখা দেয় খাবারের সংকট। দেশটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অন্তত দুই মাস আগে থেকে ট্রেনের টিীকট কেটে রাখতে। নিষেধ করা হয়েছে বড় কোনো সুটকেস নিয়ে ভ্রমণ না করতে। অন্তত দুই ঘণ্টা আগে রেল স্টেশনে আসতে বলা হয়েছে।

তা ছাড়া এই সময় বিমানবন্দরগুলোতেও দেখা যায় প্রচ- চাপ। ২০১৬ সালে একবার তো বিমানবন্দরে টিকিটের জন্য মারামারির ঘটনাও ঘটেছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত