রবিবার, ২১ এপ্রিল ২০২৪, ৮ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

নদী রক্ষার দায়িত্ব কার

আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৯:৩৩ পিএম

কয়েকদিন আগে সুপ্রিম কোর্ট থেকে নদীবিষয়ক যে রায়টি বেরিয়েছে, তা অনেক প্রকৃতি ও নদীপ্রেমিক মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। সুপ্রিম কোর্ট তুরাগ নদকে একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর আগে ২০১৭ সালে নিউজিল্যান্ডের উচ্চ আদালত তাদের একটি নদীকে কেন্দ্র করে রায় ঘোষণা করে। নদীটি সে দেশের আদিবাসী মাউরি সম্প্রদায়ের কাছে খুবই প্রিয়। শুধু প্রিয় বললে ভুল হবে, কেননা ওই নদীটিকে তারা দেবতা জ্ঞান করে। তারা দীর্ঘদিন ধরে নিউজিল্যান্ড সরকারের সঙ্গে লড়াই করেছে। তারা লড়াই করেছে নদীটি যেন রক্ষা পায়, দূষণের শিকার না হয়। তাদের এই লড়াইয়ের ফলে সরকার অবশেষে এই নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে ঘোষণা করেছে। মাউরি সম্প্রদায় ১৭০ বছর ধরে লড়াই করে তাদের দেবতার প্রকৃত সম্মান আদায় করতে পেরেছে। এই নদীকে ঘিরে নিউজিল্যান্ড সরকারের যে বিচারিক প্রক্রিয়া তা থেকে বাংলাদেশের প্রকৃতিপ্রেমীরা শিক্ষা নিতে পারে।

নিউজিল্যান্ড সরকার গোটা বিচারিক প্রক্রিয়ায় দুজনকে যুক্ত করেছিল। একজন মাউরি সম্প্রদায় থেকে নির্বাচিত ব্যক্তি, আরেকজন সরকার দ্বারা নির্ধারিত। লক্ষ্যণীয় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট এই দায়িত্ব নদী রক্ষা কমিশনের হাতে ন্যস্ত করেছে। ২০১৩ সালে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে গৃহীত ‘নদী রক্ষা কমিশন আইন’ দ্বারা নদী রক্ষা কমিশন গঠিত হয়েছে। সুতরাং এই কমিশনের একটি পরিচয় আছে, একটি সাংবিধানিক শক্তি আছে। নিউজিল্যান্ডের নদীটিকে কেন্দ্র করে যে বিচারিক প্রক্রিয়া তার আরেকটি শিক্ষণীয় দিক আছে। তা হলো উচ্চ আদালত নদীটিকে রক্ষা এবং পুনরুদ্ধার অর্থাৎ নদীটিতে যে দূষণ হয়েছে তা পরিষ্কার করা, যে জায়গা দখল হয়েছে তা ফিরিয়ে আনা। এ জন্য আদালত সরকারকে আট কোটি ডলার বরাদ্দের নির্দেশ দিয়েছে। নদীটি রক্ষার জন্য পাঁচ কোটি আর পুনরুদ্ধারের জন্য তিন কোটি ডলার বরাদ্দের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশে সুপ্রিম কোর্ট যে নির্দেশনা দিয়েছে, তার জন্যও বিপুল পরিমাণ অর্থ দরকার। কেননা নদীটি যেমন ভৌতভাবে রক্ষা করা দরকার, আবার নদীটি রাসায়নিকভাবে যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অর্থাৎ যে বর্জ্য নদীটিতে রয়েছে, যে মাত্রার দূষণ নদীটিতে হয়েছে তা পরিষ্কার করা দরকার। আবার নদীর বিপুল অংশ দখলও হয়ে গেছে, তা পুনরুদ্ধার করা দরকার। এ জন্য বিপুল অর্থ দরকার।

নিউজিল্যান্ডের ঘটনায় অনুপ্রাণিত হয়ে ভারতের উত্তরাখ-ের একটি ফিল্ম সোসাইটির সদস্যরা গঙ্গা ও তার উপনদী যমুনা রক্ষার জন্য আইনি লড়াই শুরু করে। উত্তরাখ-ের আদালতও এই আইনি লড়াইয়ে একই প্রক্রিয়া অবলম্বন করে এবং একই ধরনের রায় দেয়। তারা অবশ্য তিনজন অভিভাবক ঠিক করে। একজন উত্তরাখ-ের অ্যাডভোকেট জেনারেল, একজন সরকারি কর্মকর্তা এবং একজন বেসরকারি কর্মকর্তা। কিন্তু দুঃখের বিষয়, উত্তরাখ-ের সরকার এই রায়ের বিপরীতে অবস্থান নেয়। তারা সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে এই রায়কে স্থগিত করে দিয়েছে। তাই ভারতীয় সিভিল সোসাইটি বা সুশীলসমাজের একাংশ যে দাবি করে ভারতের দুটি নদীকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করা হয়েছে তা অর্থে ভুল। কেননা উত্তরাখ-ের আদালতের রায়কে আটকে দিয়েছে সেখানকার সরকার। অবশ্য কয়েকদিন আগে সংবাদপত্রে পড়লাম, ভারতের মধ্যপ্রদেশের সরকার সেখানকার নর্মদা নদীকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণার জন্য প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় এই যে, এখানে সরকার ভূমিকা নিচ্ছে। তাই সরকার বা প্রশাসন যদি এই ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয় তাহলে এই বিষয়ে সম্মানজনক সমাধান দ্রুত নেওয়া সম্ভব।

এই বিষয়ে তৃতীয় নজির হচ্ছে ইকুয়েডর। এমনিতে ইকুয়েডর, বলিভিয়া, কোস্টারিকার সংবিধান খুবই প্রকৃতিবান্ধব, খুবই পরিবেশবান্ধব। ইকুয়েডরে একটি নদীতে খনি থেকে বর্জ্য ফেলে নদীটির অনেকাংশ ভরাট করা হয়। তখন এই বিষয়টি সেই দেশের বিচারপতিদের দৃষ্টিতে আসে। তারা তখন রায় দিয়ে নির্দেশনা দেন যে, অনতিবিলম্বে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে এবং সঙ্গে সঙ্গে যে পরিমাণ বর্জ্য ফেলে নদী ভরাট করা হয়েছে তা অপসারণ করতে হবে। একই ধরনের রায় দেওয়া হয়েছে বলিভিয়াতেও।

এতক্ষণ যে তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করলাম তার বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে পাঠকদের সামনে একটি বিষয় তুলে ধরতে চাই। তা হলো অভিভাবক লাগবে। অর্থাৎ নদী রক্ষার জন্য অভিভাবক লাগবে। এখন বাংলাদেশে যদি ছোট-বড় মিলিয়ে হাজার খানেক নদী ধরি, তাহলে প্রত্যেক নদীর জন্য একজন করে অভিভাবক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব নয়। তাহলে কী করা যায়? আসলে নদী রক্ষার দায়িত্ব ভূমি অধিদপ্তরের। আর ভূমি অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রণ করে জেলা প্রশাসন। এখন জেলা প্রশাসন যদি তৎপর হয় তাহলে নদী রক্ষা করা সম্ভব। আর এর জন্য প্রচুর অর্থও প্রয়োজন। এখন বাংলাদেশে হাইকোর্ট নদী রক্ষার দায়িত্ব নদী রক্ষা কমিশনের হাতে দিয়েছে। এখন নদী রক্ষা কমিশন যদি জেলা প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করে, জেলা প্রশাসন যদি এই ব্যাপারে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়, তাহলেই নদী রক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা নেওয়া সম্ভব। নদী রক্ষা কমিশনের নির্বাহী ক্ষমতা নেই। তা থাকারও দরকার নেই। এই নির্বাহী ক্ষমতা রয়েছে জেলা প্রশাসনের। তাকেই এগিয়ে আসতে হবে।

আবার আমরা দেখছি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ও নদী রক্ষার ব্যাপারে দায়িত্ব পালন করছে। আমার জানামতে, এই মন্ত্রণালয় যেসব এলাকায় নৌবন্দর রয়েছে সেখানকার নদীর পাড়ের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকে। আবার নদীর পানির ব্যাপারটি দেখে পানি মন্ত্রণালয়। পরিবেশ মন্ত্রণালয় নদীর পানির গুণগত মানটি দেখে। এখন এই তিন-চারটি সংস্থার কাজগুলোর সমন্বয় দরকার। আর সেটিই করবে নদী রক্ষা কমিশন।

আমরা দেখতে পাই যে নৌ-মন্ত্রণালয় বিগত ১০-১৫ বছর ধরে নদীর ওপরিভাগে যেসব দখল হয়েছে, সেগুলো পুনরুদ্ধারে অভিযান চালায়। তারা বিভিন্ন অবকাঠামো ভেঙে ফেলে। এবার দেখছি তারা বড় বড় অবকাঠামো ভেঙে ফেলেছে। তারা তো শুধু নদীর ওপরিভাগে অবস্থিত অবকাঠামোই ভেঙে ফেলছে। কিন্তু নদীর ওপর যে মাটি ফেলে নদী দখল করা হয়েছে, সেই মাটি অপসারণ করা হচ্ছে না। অর্থাৎ নদীর ওপর মাটি ফেলে যে অংশ ভরাট করা হয়েছে তা অপসারণ না করলে নদীর পুরনো অবয়ব তো ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না। এখন অনেকে দলিল দেখিয়ে বলে যে আমি জমির এই ভরাট অংশ ওমুকের কাছ থেকে কিনেছি। কিন্তু সেটি গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা নদীর ওই ভরাট অংশ তো সরকারি খাসজমি। তাহলে খাসজমির জন্য যেসব দলিল প্রণীত হয়েছে তা ভুয়া। আর এ ক্ষেত্রে এসব ভুয়া দলিল শনাক্ত করে দখলকৃত জমি ফিরিয়ে আনা এবং সেখান থেকে উচ্ছেদের জন্য জেলা প্রশাসনকে ব্যবহার করার দায়িত্ব ভূমি মন্ত্রণালয়ের।

আমরা দেখেছি শুধু বেসরকারিভাবেই নদীর জমি দখল করা হয় না। অনেক সময় সরকারিভাবেও জমি দখল করা হচ্ছে। আর যারা নদীর জমিতে প্রতিষ্ঠান তৈরি করছে, কারখানা তৈরি করছে তাদের জন্য শাস্তির বিধান রাখা উচিত। কয়েকদিন আগে একটি ইংরেজি দৈনিকে দেখলাম, মেঘনা নদীর জমিতে কংক্রিট কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। একে আমরা গ্রোয়েন বলি। এই গ্রোয়েন নদীর শাসনপথ বদল করে দেয়। এখন যে কংক্রিট কাঠামো তৈরি করা হয়েছে, তার ফলে সৃষ্ট গ্রোয়েন নদীকে সরিয়ে দেবে এবং নদীতে আরও জায়গা বেদখল হয়ে যাবে।

নদী কাকে বলে? নদী কতটুকু? ২০০৯ সালে দেশের মাননীয় বিচারপতিরা নদীর সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। বর্ষাকালের নদীই নদী অর্থাৎ তখন নদী কানায় কানায় পূর্ণ থাকে। আর শীতকালের নদী শীর্ণ নদী। এই আইনের অপব্যাখ্যা করে আমরা দেখতে পাই ঢাকা, গাজীপুর এবং নারায়ণগঞ্জের অনেক জায়গায় নদীর শীর্ণ জায়গায় জমি দখল করতে সহায়তা করেছে জেলা প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা। এদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।

দেশের যে প্রচলিত আইন আছে তা দিয়েই নদী রক্ষা করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা সরকারি আধিকারিকদের। আমরা দেখতে পাই কিছু সরকারি আমলার সঙ্গে যোগসাজশ করে বেআইনি দখলদারীরা নদীর জমি দখল করছে। এদের উভয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অঙ্গীকার মনে রাখতে হবে। সংবিধানের ১৮ অনুচ্ছেদের ক ধারায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্র প্রকৃতি, জলাভূমি, জীববৈচিত্র্য ও বনভূমি রক্ষায় দায়বদ্ধ। আমাদের সবার সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ পালন করতে হবে। তাহলেই নদীতে প্রাণ ফিরে আসবে, নদীতে পানি টলটল করবে, আমরা সেই নদীতে সাঁতার কাটতে পারব, নদীতে মাছ পরিপূর্ণ থাকবে। প্রকৃতিকে প্রকৃতির কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রকৃতি ভালো থাকলে মানুষ ভালো থাকবে, মানুষ ভালো থাকলে প্রকৃতি ভালো থাকবেএই বিশ্বাস আবার ফিরে আসবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত