শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৬ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ভারতীয় রাজনীতির গতিপথ কোনদিকে

আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৯:৩৫ পিএম

রাজধানীর খুব সাধারণ ছাত্রের কাছেও এটা পরিষ্কার, ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এক নতুন মোড় নিয়েছে। নানা প্রশ্ন উঠে আসছে যা নিঃসন্দেহে কিছু অভিনব এবং অবশ্যই চমকপ্রদ। পশ্চিম বাংলার কথাই ধরুন, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের মধ্যকার সংঘাত সরাসরি রাস্তায় নেমে এসেছে। এমনিতেই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের নামের শেষে দিদি বা তৃণমূল নেত্রী বিশেষণের চেয়ে জননেত্রী শব্দটা অনেক বেশি পছন্দ করেন। যেভাবেই ব্যাখ্যা করি না কেন, তার ক্যারিশমা, রাজনৈতিক উত্থান পুরোটাই ঘটেছে গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। আজ ভারতের সংসদীয় নির্বাচন যখন আসন্ন প্রায়Ñ তখন স্বাভাবিকভাবেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও নিজের রাজনীতিকে ফের একবার রাস্তায় নামিয়ে এনেছেন। ধরনা মঞ্চে তার অবস্থান আরও কয়েকদিন আপাতত চলবে।

অনেকেই জানেন, তবু মনে করিয়ে দিই অতীব নাটকীয় এক ঘটনার মধ্য দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ধরনা মঞ্চে অবস্থান। সিবিআই কলকাতার পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারের বাড়িতে তার খোঁজখবর করতে গেলে পুলিশ বাধা দেয় এবং সিবিআই অফিসারদের প্রায় জোর করেই থানায় যেতে বাধ্য করেন। কলকাতা পুলিশের যুক্তি, সিবিআই কোনোরকম সার্চ ওয়ারেন্ট ছাড়াই রাজীব কুমারের বাড়িতে ঢুকতে গেলে তারা আইনমাফিক তার বিরোধিতা করেন। সিবিআই বলাবাহুল্য এই যুক্তি মানতে নারাজ। তারা অন্তত প্রকাশ্যে জানিয়েছে প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্রই তাদের কাছে ছিল। সময়মতো সুপ্রিম কোর্টে তারা এই কাগজপত্র পেশ করবেন। বিষয়টি নিছক পুলিশ-সিবিআই দ্বন্দ্ব বলে এড়িয়া যাওয়া যাচ্ছে নাÑ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তার দল খোলাখুলিভাবে রাজ্য পুলিশের পাশে এসে দাঁড়ানোয়। ভারতীয় রাজনীতির সন্ধিকাল এ জন্যই বলছি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে প্রশ্নে কলকাতা পুলিশের পাশে এসেছেন তা আদৌ আইনশৃঙ্খলাজনিত কোনো বিষয় নয়। পুরোটাই কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের টানাপড়েন নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

এ বিষয়টা  কিন্তু আজ পশ্চিম বাংলায় প্রথম তুললেন তাও নয়। ১৯৭৭ সালে এ রাজ্যে প্রথম বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরই তৎকালীন অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্র বিষয়টা নিয়ে সোচ্চার ছিলেন। দেয়ালে দেয়ালে বাম কর্মীদের দেয়াল লিখনÑ ‘রাজ্যের হাতে অধিক ক্ষমতা দিতে হবে’ আবছা হয়ে গেলেও তা পুরোপুরি মুছে যায়নি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কখনো নরমে কখনো গরমে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এই একই দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন। এর পেছনে একটা কারণ নিঃসন্দেহ স্থানীয় জনগণের সেন্টিমেন্টকে উসকে দিয়ে বেশিসংখ্যক ভোট নিজেদের দিকে নিয়ে আসা। আবার পাশাপাশি এটাও ঠিক স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের শাসকদের অতিকেন্দ্রায়ন নীতি যত দিন যাচ্ছে রাজ্যে রাজ্যে জনসাধারণ এবং সরকারকেও ক্ষুব্ধ করে তুলছে। অস্বীকার করে লাভ নেই শক্তিশালী কেন্দ্র এই কনসেপ্টটা ভারতীয় জনতা পার্টির নেতৃত্বাধীন সরকারের পছন্দের বিষয়।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক বিশ্বাস, বীক্ষা জন্মই নিয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের মতাদর্শের ভিত্তিতে। ১৯২৫ সালে আরএসএসের জন্ম সময় থেকেই তাদের তাত্ত্বিক নেতারা বিশ্বাস করে এসেছেন ভারতবর্ষ একটি নির্দিষ্ট জাতির আবাসভূমি। সেখানে অন্য কোনো মত, বিশ্বাস বা তত্ত্বের জায়গা নেই। আরএসএস তাত্ত্বিকদের সেøাগানই ছিল এক নেতা, এক জাতি, এক পতাকা। ফলে নব্য হিন্দুত্ববাদের ঘোষিত এজেন্টরা আজ আমাদের কেন্দ্রীয় সরকারের পছন্দের বিষয় হবে, এটাই স্বাভাবিক।

ইতিহাসের দিকে যদি চোখ ফেরাই তাহলে দেখব মওলানা আবুল কালাম আজাদ লিখেছিলেন ‘পৃথিবীর সর্বত্র ক্ষমতা হচ্ছে বিকেন্দ্রীকরণের দিকে, যেখানে জনগণের মধ্যে ভাষা, রীতিনীতি ও ভৌগোলিক অবস্থার এত বিভিন্নতা সেখানে স্পষ্টই এককেন্দ্রিক সরকার সবচেয়ে অনুপযোগী। যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের মধ্যে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আশঙ্কাকেও দূর করতে পারে।’ বস্তুত ভারত ভাগ হওয়ার অন্যতম কারণই ছিল স্বাধীনতার পরে দেশ কোন পথে চলবে? যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় না কঠিন কেন্দ্রায়ন। বাস্তবে জওহরলাল নেহরু ও অন্যান্য কংগ্রেসী শাসকরা অধিকাংশই মুখে যাই বলুন চিরকাল শক্তিশালী কেন্দ্রকে পছন্দ করে এসেছেন। তবে নানান রাজনীতির বাধ্যবাধকতা কংগ্রেস নেতৃত্ব বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সামলে নিয়েছে।

আমাদের জাতীয় নেতা ‘লৌহমানব’ বল্লভ ভাই প্যাটেলের ভাবশিষ্য নরেন্দ্র মোদি যিনি কোনো রকম নরম পথে বিশ্বাসী নন, তা তার বিভিন্ন সময়ের বক্তব্য থেকে পরিষ্কার। ফলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে বিষয়টি সামনে এনেছেন তা কোনোভাবে শুধুমাত্র এ রাজ্যের এজেন্ডা নয়। ভারতের অন্যান্য রাজ্যে এই দাবি ক্রমশই সামনে আসছে। ভোট যত এগোবে ততই এই বিষয়গুলো জটিল থেকে জটিলতর হবে। ভয়টা অন্য জায়গায়। যেটা প্রথমেই বলেছিলাম, আবার রিপিট করব। ভারত সংকটকালে। তার একটা কারণ যদি কেন্দ্র রাজ্যের সংঘাত হয়, অন্যান্য আরও কিছু বিষয় আছে যা আগে ভারতীয় রাজনীতিতে এত পরিষ্কারভাবে সামনে আসেনি। পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগের যা দেখে আমেরিকান বিভিন্ন নিউজ এজেন্সিও সতর্কবার্তা পাঠাচ্ছে যে, আগামী নির্বাচনের আগে দেশে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ আরও অনেক বেশি তীব্র হবে।

কাশ্মীর ’৪৭ সাল থেকেই ভারত রাষ্ট্রে চর্চার বিষয়। কোনোরকম স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্ন এলেই তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে চিহ্নিত করা আমাদের পুরনো রোগ। মুশকিল হচ্ছে মোদি সরকার যে ‘সিটিজেন অ্যামেন্ডমেন্ট’ বা নতুন নাগরিক বিল আনার কথা ভাবছে তা এরই মধ্যে উত্তর-পূর্ব ভারতে নতুন করে অশান্তির জন্ম দিয়েছে। এই প্রথম সংসদে তথাকথিত নিরাপত্তার নামে একটি সম্প্রদায়কে খুশি করতে এমন এক বিল আনা হচ্ছে যা পুরোপুরি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ নীতির বিরোধী। এই বিল উত্তর-পূর্ব ভারতের জনগণের মধ্যে এমন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে যা আগে কখনো আমরা দেখিনি। আসামের বিশিষ্ট কৃষক নেতা অখিল গগই প্রকাশ্যে জনসভায় এরই মধ্যে আসামের স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যা যা অভিযোগ কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে করেছেন তার মধ্যে একটি অভিনব না হলেও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মনে করেন নানা অসিলায় কেন্দ্রীয় সরকার সিবিআইকে বিরোধীদের দমনের জন্য ব্যবহার করছে।

পাশাপাশি অভিযোগ উঠেছে, মোদি সরকার দেশের যাবতীয় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে বিজেপির স্বার্থে কাজে লাগাচ্ছে। অভিযোগ যিনিই তুলুন পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিছু দিন আগে কেন্দ্রীয় সরকারের যে সংগঠন আমাদের দেশের কত বেকার যুবক চাকরি পায়নি বা পেয়েছেন, অর্থনীতির হাল কী- সব নিয়ে গবেষণা করে, তার চেয়ারম্যান পদত্যাগ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ভারতীয় অর্থনীতির আসল চেহারা কী তা নিয়ে কোনো রিপোর্ট তাকে পেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। কিছুদিন আগে রিজার্ভ ব্যাংকের চেয়ারম্যান উর্জিত প্যাটেলও নিজের দায়িত্ব থেকে সরে গেছেন। ডিমনিটাইজেশন বা বিমুদ্রিকরণের ফলে কত অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে, কতজন কাজ হারিয়েছেন, তা নিয়েও আজ পর্যন্ত মোদি সরকার জানেনি বা জানাতে পারেনি। ২০১৪ নির্বাচনের আগে মোদি সরকার যা যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার প্রায় কোনোটাই উনি রাখতে পারেননি। এক কোটি যুবকের চাকরি তো হয়ইনি, বরং বেকারি বেড়েছে। ভারতীয় সরকারি ব্যাংকের অবস্থাও উদ্বেগজনক। কৃষক আত্মহত্যা ক্রমবর্ধমান। সংগঠিত ও অসংগঠিত শিল্পের হাল সঙ্গীন।

এই অবস্থায় আমাদের দেশে আবার নির্বাচন আসতে চলেছে। এবারের নির্বাচন অন্যান্য বারের চেয়ে নিঃসন্দেহে কিছুটা অন্যরকম। এবার স্রেফ ভোটের লড়াই নয়, সামনে উঠে আসছে অনেক নীতিগত প্রশ্ন। বিরোধী দলগুলো এরমধ্যে যা নিয়ে সোচ্চার হয়েছে। এক. কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কী! দুই. ভারত কোন পথে হাঁটবে ধর্মনিরপেক্ষ না হিন্দুত্ববাদের দিকে! তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনশন, ধরনার পেছনে আরও নানান কারণ থাকতে পারে, আছেও। যা নিয়ে অন্য সময় বিশদে বলা যাবে। কিন্তু এই ধরনা সামনে নিয়ে এসেছে এমনসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন যা এরই মধ্যে অন্যান্য রাজ্যের বিজেপিবিরোধী মুখ্যমন্ত্রীরা সমর্থন করেছেন। কে বলতে পারে আগামী নির্বাচনে সাবেক, চিরকালীন বামপন্থি নীতি রাজ্যের হাতে অধিক ক্ষমতা দেওয়ার সেøাগানই নির্ণায়ক ভূমিকা নেবে। 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত