শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৬ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে

আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৯:৩৯ পিএম

মঙ্গলকাব্যের কবি ভারতচন্দ্র সন্তানের মঙ্গল কামনায় অন্নপূর্ণার কাছে বর চেয়ে বলেছিলেন, ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’।  এ বাসনা কেবল প্রার্থনা হয়েই থাকেনি। জলে মাছ আর জমিনে ফলে-ফসলে সমৃদ্ধ বাঙালি, যুগে যুগে মাছে-ভাতে আর দুধে-ভাতেই থেকেছে। যুগ পাল্টেছে। যুগের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে গেছে আমাদের কৃষি ও খাদ্য সংস্কৃতিও। বিপুল জনসংখ্যার জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে কৃষিতে সার-কীটনাশকের পাশাপাশি হাইব্রিড বীজে-ফসলে ভরেছে আমাদের ক্ষেত-খামার। গবাদিপশুর খাদ্য চাহিদা মেটাতেও এখন কিনতে হয় বিশেষ পোলট্রি ফিড। এভাবে খাদ্য উৎপাদন করতে গিয়ে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়ছে জনগণ।

সরকারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরি দেশে গাভীর কাঁচা দুধ, দুধজাত পণ্য এবং গোখাদ্য নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গাভীর কাঁচা দুধে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি পরিমাণে কীটনাশক, নানা অ্যান্টিবায়োটিক ও নানা অণুজীব শনাক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে প্যাকেটজাত গাভীর দুধেও মাত্রাতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ও সিসা পাওয়া গেছে।  দইয়েও মিলেছে সিসা। গবেষকরা বলছেন, প্রায় সব গোখাদ্যে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। কোনো কোনো খাবারে কীটনাশক, সিসা ও ক্রোমিয়ামও আছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন নিয়মিতভাবে এমন খাদ্য খেলে, সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি পরিমাণে থাকা এসব কীটনাশক এবং টেট্রাসাইক্লিন, এনরোফ্লোক্সাসিন, সিপ্রোসিন ও আফলাটক্সিনের মতো অ্যান্টিবায়োটিক যে কোনো বয়সের মানুষের শরীরে প্রবেশ করে তার রোগ প্রতিরোধ শক্তি নষ্ট করে দিতে পারে। পাশাপাশি গাভীর দুধে এবং প্যাকেটজাত দুধে সিসা ও ক্রোমিয়াম পাওয়ার খবর ভয়ংকর। কেননা, কিডনি শরীরের নানা অপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ছেঁকে ফেলে দিতে পারলেও এসব দ্রব্য ছেঁকে ফেলতে পারে না। ফলে এগুলো শরীরে জমা হয়ে চূড়ান্ত পরিণতিতে ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে। আর কাঁচা দুধ ফুটানোর পর কিছু কিছু অণুজীবও নষ্ট হতে পারে, কিন্তু এসব অ্যান্টিবায়োটিক, কীটনাশক বা সিসা নষ্ট হয় না।

সম্প্রতি দেশে রুটি-পরোটা-নানরুটির মতো নিত্যদিনের খাদ্যে অ্যামোনিয়াম সালফেট ও ইউরিয়া সার মেশানোর খবর গণমাধ্যমে এসেছে। এর আগে নানা গবেষণায় গাজর, করলা, বেগুন, লাউ, শসা, পুঁইশাক, ডাঁটাশাক, মরিচ ও ঝিঙ্গায় সালমোনেল্লা ও ই-কোলাই ব্যাক্টেরিয়া শনাক্ত হয়েছে, যা টাইফয়েড ও ডায়রিয়া রোগের জন্য দায়ী।  এছাড়া ব্রয়লার মুরগির মগজ, মাংস, চামড়া, কলিজা ও হাড় এবং মাছ ও মুরগির খাবারেও সহনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। সর্বশেষ এই গবেষণায় দুধ ও দুধজাত খাবারে এসব ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতির খবর বিশেষভাবে শঙ্কার। কেননা দুধ ও দুধজাত খাবার-দাবার একদিকে শিশু ও প্রবীণদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, অন্যদিকে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় শিশু ও প্রবীণরাই বেশি রোগাক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।    

নাগরিকদের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে ‘নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩’ অনুসারে ২০১৫ সালে ‘বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্র্তৃপক্ষ’ গঠিত হয়েছে। পাশাপাশি গত বছর থেকে ২ ফেব্রুয়ারি ‘জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস’ পালিত হচ্ছে। দেশে খাদ্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মেশানোর দায়ে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও ২০ লাখ টাকার জরিমানার বিধানও আছে। কিন্তু নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হলে চাষাবাদ থেকে শুরু করে গবাদিপশু পালন, কৃষিজমির সুরক্ষার পাশাপাশি ঝুঁকিমুক্ত ও ভেজালমুক্ত খাদ্য উৎপাদন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, খাদ্য সরবরাহ ও খাদ্য গ্রহণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করাটা বাধ্যতামূলক।

প্রকৃত অর্থে নিরাপদ খাদ্যের জন্য পুরো কৃষিব্যবস্থা এবং প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ বিষয়ে সামগ্রিক সচেতনতা প্রয়োজন। খাদ্য উৎপাদনের নামে রাসায়নিক ব্যবহার করে মাটি ও পানি দূষণ বন্ধে কৃষিজমি সুরক্ষা আইন যুক্ত করতে হবে। গবাদি প্রাণিসম্পদের খাদ্যকেও ভেজালমুক্ত ও নিরাপদ করতে হবে। এজন্য নিরাপদ খাদ্য কর্র্তৃপক্ষকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। ভোক্তা অধিকার আন্দোলনকে আরও জনবান্ধব ও সক্রিয় করতে হবে। খাদ্য ভেজাল ও দূষণমুক্ত রাখতে প্রচলিত সব আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং মাঠ পর্যায়ের নজরদারি বাড়াতে হবে।  অবিলম্বে দুধ ও দুধজাত খাদ্য, শিশুখাদ্যসহ খাদ্যে ভেজাল মেশানোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। নইলে বাংলা মায়ের সন্তানদের ‘দুধে ভাতে’ থাকা নিয়েও আর ভরসা করা

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত