শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৬ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

মিয়ানমারে ফিরতে ৭ শর্ত রোহিঙ্গাদের

আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৩:২৫ এএম

নাগরিকত্ব ফেরত, পর্যাপ্ত নিরাপত্তাসহ সাতটি শর্ত পূরণ না হলে ফিরে যাবে না বলে জানিয়েছে প্রাণভয়ে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা। তারা মনে করছে, মিয়ানমারের জান্তা সরকার তাদের রাখাইন রাজ্যে নিয়ে আগের কায়দায় হত্যা করবে। কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার কয়েকটি ক্যাম্পে রোহিঙ্গারা দেশ রূপান্তরকে এমন অবস্থানের কথা জানিয়েছে। তাদের একজন সৌদল আমিন। তিনি বলেন, ‘জান্তা-সুচি সরকার আমাদের দেশে ফেরত নিয়ে আগের কায়দাই মেরে ফেলবে। ওই দেশে আমাদের কিছুই নেই। তারপরও কে না চায় নিজ দেশে থাকতে। ধন-সম্পদ সবই ছিল আমাদের। ওরা সবকিছুই কেড়ে নিয়েছে। এখন আমরা বাংলাদেশেই অনেক ভালো আছি।’

আনোয়ারা বেগম নামে এক রোহিঙ্গা নারী জানান, বার্মিজ এক হাজার মুদ্রা বাংলাদেশে ৭৫ টাকা। সারা দিন পাহাড়ে লাকড়ি সংগ্রহের পর মুংডুর পরীরঢাল হাটে তা বিক্রি করে তিন হাজার টাকা আয় করতেন। মিয়ানমারে চাল, মাছ, ডালের দাম হাতের নাগালে।

তাই স্বল্প আয়ের মধ্যে দিয়েই সংসার জীবনের দুই যুগ পেরিয়ে গেছে। তার স্বামী এখনো নিখোঁজ। প্রাণ বাঁচাতে তিনি এ দেশে এসেছেন।

ক্যাম্পগুলোতে আশ্রয় নেওয়া কয়েকজন রোহিঙ্গা জানায়, মিয়ানমার সরকার হত্যা-নির্যাতন চালিয়েছে দেশ রোহিঙ্গাশূন্য করতেই। এখন প্রাণ হাতে নিয়ে মিয়ানমারে যাওয়ার সুযোগ হলে তারা অর্থনৈতিকভাবে আগের মতো উঠে দাঁড়াতে পারবে না। অন্যদিকে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়েছে অনেক আগেই। নতুন করে আবার নিজ বাসভূমিতে শরণার্থী করে নিলে যে পরিমাণ জমিজমা ছিল, তাতে অধিকার ফিরে পাওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে রোহিঙ্গাদের বেশিরভাগই সাত শর্তের কথা বলে। এগুলো হলোÑ মিয়ানমারে নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়া, সবাইকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দেওয়া, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের অন্য নাগরিকদের মতো সুবিধা দেওয়া, স্থানীয় বৌদ্ধ ও সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা সম্পত্তি ফেরত দেওয়া, গৃহপালিত পশু ফেরত দেওয়া, সবুজ রঙের পরিচয়পত্র ফেরত ও নতুন করে কার্ড তৈরি করে দেওয়া এবং রোহিঙ্গাদের ওপর কোনো অত্যাচার না করা। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের নামে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের গণহত্যা শুরু করে সেনাসদস্যরা। তারা রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণ, বিভিন্ন বয়সীদের ওপর নির্যাতন করে। এতে প্রাণভয়ে সীমান্ত পেরিয়ে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। তারা কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ার শিবিরগুলোতে দিন কাটাচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মিয়ানমার থেকে এখনো প্রতিদিনই গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসছে। তবে সীমান্তের পয়েন্টগুলোতে তাদের ওপর কড়া নজরদারি করা হচ্ছে। সম্প্রতি ঢাকায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘রাখাইনে এখনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করছে, যে কারণে এখনো সেখান থেকে বাসিন্দারা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আসছে। তবে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের জন্য যা যা করা দরকার, সব আমরা করব। রোহিঙ্গা সমস্যা দীর্ঘায়িত হলে এই অঞ্চলে অনিশ্চয়তা ও অস্থিতিশীলতা দেখা দিতে পারে।’

বাংলাদেশে আসার পর থেকে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন। গত সোমবার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে যান হলিউড অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলি। তিনি সেখানে বিভিন্ন বয়সী রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেন।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে দেখা যায়, প্রতিটিতেই রোহিঙ্গাদের আনাগোনা বেড়েছে। তাদের কেন্দ্র করে সক্রিয় বেসরকারি সংস্থাগুলো (এনজিও)। অন্তত অর্ধশত এনজিও রোহিঙ্গাদের উন্নয়নে কাজ করছে। এনজিওকর্মীরা রোহিঙ্গা নারী ও পুরুষদের নানা উপদেশ দিচ্ছেন। শিক্ষালয়ে শিশুদের পড়াশোনা করাচ্ছেন। তবে বাংলা ভাষায় কাউকে পড়ানো হচ্ছে না। বার্মা ও ইংরেজি ভাষায় শিশুদের পাঠদান করানো হচ্ছে। তাছাড়া জন্মবিরতির উপকরণ ব্যবহারে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ঘনঘন সন্তান না নিতে নারীদের বলা হচ্ছে। যৌন মিলনের সময় কনডম ব্যবহার করার অনুরোধ করা হচ্ছে। রহিমউল্লাহ নামে এক রোহিঙ্গা জানান, গত দুই বছরে তার দুটি সন্তান হয়েছে। এনজিওর পক্ষ থেকে তাকে জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী দেওয়া হয়েছে। এখন তিনি সেগুলো ব্যবহার করছেন।

তিনি বলেন, ‘এখনো বাংলাদেশে রোহিঙ্গা আসছে। প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন নাগরিক বাংলাদেশে আসছে। আমরা চাই নিজ দেশে ফিরতে। কিন্তু যাওয়ার কয়েক মাস পরই সু চি সরকারের অত্যাচার আরও বেড়ে যাবে। পরে আবার বাংলাদেশেই চলে আসতে হবে।’

ডেনিস রিফিউজিস কাউন্সিল নামে একটি এনজিওর কর্মী আবু তাহের বলেন, ‘এখানে শিশুরা বেশি অবহেলিত। তারা সর্দি, কাশি জ্বর, ডায়রিয়াসহ নানা সমস্যায় ভোগেন। বয়স্করা ঠা-ার সমস্যায় ভোগেন। আর নারীরা ভোগেন মেয়েলি সমস্যায়। ঘনঘন সন্তান না নিতে তাদের বেশি বলা হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইউনিসেফের সহযোগিতায় শতাধিক স্কুল আছে। ক্যাম্পগুলোতে বিয়ের প্রবণতা বেশি। মাসে চার-পাঁচটি করে বিয়ে হচ্ছে। তবে যৌতুকের কোনো কারবার নেই।’ স্কুলশিক্ষক সেকেন্দার হায়াত বলেন, ‘ইংরেজি ও বার্মা ভাষায় তাদের শিক্ষা দেওয়া হয়।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত