সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বাংলা যখন প্রান্তিক ভাষা

আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১০:৩৭ পিএম

একুশে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বাঙালি জনগণের লড়াইয়ের চিহ্ন দিবস হলেও এটা ছিল সকল জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় কথা বলা, লেখা ও ভাব প্রকাশের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইও। সে জন্য একুশে ফ্রেব্রুয়ারি প্রকৃতপক্ষে প্রথম থেকেই একটি বহুজাতিক প্রেরণার উৎস হয়ে আছে। এই অন্তর্নিহিত শক্তির প্রকাশই ঘটেছে এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে। বস্তুত মাতৃভাষায় শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা ও ভাব প্রকাশের অধিকার বিশ্বের অধিকাংশ ভাষাভাষী মানুষই এখন কার্যকর করতে পারছে না। অধিকাংশ ভাষাই এখন হুমকির সম্মুখীন। অধিকাংশ ভাষাভাষী মানুষই বর্তমানে পরাজিত, বিপর্যস্ত অবস্থায় প্রাণপণে চেষ্টা করছেন নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য। একুশে ফেব্রুয়ারি তাদের সে চেষ্টায় একটি প্রতীকী অবলম্বন।

এটা বলা দরকার যে, দেশে দেশে জনগণের যে গণতান্ত্রিক আন্দোলন এর মধ্যে একটি আন্তর্জাতিক মাত্রা থাকেই। প্রতিটি দেশে মানুষ লড়াই করে তার নিজ দেশের অগণতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধে, অগণতান্ত্রিক মতাদর্শের বিরুদ্ধে; মানুষ লড়াই করে নিজের ভূমিতে তার জায়গা তৈরির জন্য। কিন্তু এসব লড়াই ভৌগোলিক সীমাও অতিক্রম করে, কখনো সঙ্গে সঙ্গে, কখনো একটু বিলম্বে। প্রতিটি দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক লড়াই অন্যান্য দেশের গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহকে শক্তি জোগায়। এক দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন অন্য দেশের অগণতান্ত্রিক শক্তির জন্য হুমকি হয়ে ওঠে। মাতৃভাষা নিয়ে লড়াইও তাই।

কিন্তু আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারি স্বীকৃতি পেতে পেতে বাংলা ভাষার ‘বাজারদর’ বাংলাদেশে একদম নিচের দিকে পড়ে গেছে। বাজার অর্থনীতির চাহিদা জোগানের ভারসাম্যে বাংলা ভাষার অবস্থান এখন করুণ। অতএব যে বাংলা ভাষার জন্য লড়াইকে কেন্দ্র করে একুশে ফেব্রয়ারি একটি বিশেষ দিন হয়ে উঠল সেই ভাষা মোটামুটি পরিত্যক্ত পর্যায়ে আসবার সময়েই দিনটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে।

বেশিরভাগ জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষাকে এরকম প্রান্তিক অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার বর্তমান উন্নয়ন ধারার প্রত্যক্ষ স¤পর্ক আছে। এই প্রত্যক্ষ সম্পর্ক অনুসন্ধান করতে গেলে আমরা এটাও উপলব্ধি করব যে যাকে আমরা বিশ্ব^ায়ন বলে জানি তা আসলে একচেটিয়াকরণ। বিশ্বের সকল অঞ্চলের মানুষের জায়গা করে দিয়ে এই বিশ্বায়ন  ঘটছে না। এই বিশ্বায়ন বস্তুত সকল অঞ্চলের মানুষকে শৃঙ্খলিত করে ক্ষুদ্র অংশের একক ভাষা, সংস্কৃতি, মতাদর্শ, রুচি এবং একচেটিয়া মালিকানার সকলের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার আরেক নাম।

অর্থনীতি ক্ষেত্রে আমরা এর প্রকাশ দেখি পুরো বিশ্বকে কতিপয় বহুজাতিক সংস্থার করতলগত করবার মধ্যে; মতাদর্শিক ক্ষেত্রে আমরা এর প্রকাশ দেখি শ্রেণি, লিঙ্গ, জাতিগত, বর্ণগত নিপীড়ন ও মতাদর্শের পষ্ট অপষ্ট একটি কাঠামোর আধিপত্য সৃষ্টির মধ্যে; এবং আমরা এর প্রকাশ দেখি অন্য সব ভাষার ওপর কয়েকটি ভাষার বিশেষত একটি ভাষার একচেটিয়া আধিপত্যের মধ্যে।

বাংলাদেশসহ বিভিন্ন উপনিবেশ-উত্তর দেশে ঔপনিবেশিক ভাষার যে আধিপত্য দেখা যায় তা এক ঐতিহাসিক আধিপত্যেরই ধারাবাহিকতা। বাংলাদেশে ফরাসি বা প্যানিশ ভাষাও প্রধান ভাষা হয়ে উঠতে পারতো যদি এই অঞ্চলের ঔপনিবেশিক প্রভু ফ্রান্স বা স্পেন ইত্যাদি হতো। ইংরেজি এই অঞ্চলে এখন প্রভুভাষা কারণ ব্রিটিশরা এখানে ঔপনিবেশিক প্রভু ছিল। ইংরেজি এখন সারা বিশ্বের প্রভুভাষা কারণ পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় এখন কেন্দ্রীয় ও প্রধান শক্তি ইংরেজিভাষী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ব্রিটিশ ইংরেজি থেকে মার্কিন ইংরেজিতে ভর স্থানান্তরের পেছনেও বিশ্ব ক্ষমতার বিন্যাস-পুনর্বিন্যাস সম্পর্কিত।

ইংরেজি ভাষা এখন শুধু একটি ভাষাই নয় এটি একটি ক্ষমতার প্রতীকও। ইংরেজি ভাষা জানা মানে সেই ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া, এই ভাষা জানা মানে অনেক সুযোগের দরজা খুলে যাওয়া, এই ভাষা জানা মানে হীন দীন অবস্থা থেকে সমৃদ্ধ শক্তিধর অবস্থায় পৌঁছে যাওয়া। বাংলাদেশে ইংরেজি ভাষা জানলে শুধু ক্ষমতার স্বাদই পাওয়া যায় তা নয়; কর্মসংস্থান ও উপার্জনের বিভিন্ন রাস্তার সঙ্গেও তার যোগ প্রত্যক্ষ। ইংরেজি ভাষা জানা না থাকলে জ্ঞানবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় স্বচ্ছন্দ বিচরণ, বিশ্বের খবরাখবর, এমনকি চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে যোগাযোগও বাধাগ্রস্ত হয়।

বাংলা ভাষার তাহলে সমস্যা কী? বাংলা ভাষায় এই কাজগুলো হয় না কেন? এটা কি ভাষার গাঠনিক সমস্যা না এই ভাষা যে সমাজের, তার অবস্থান ও গতিপ্রকৃতির প্রকাশ? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে গেলে অন্যান্য ভাষার এবং অন্যান্য ভাষাভাষীদের অবস্থাও আমাদের দেখতে হবে। পার্শ্ববর্তী দেশের হিন্দি ভাষার কি একই অবস্থা? না। হিন্দি ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান অধিপতি ভাষা। বিশ্বেও তার প্রভাব বাড়ছে। হিন্দি ভাষাতে বিভিন্ন ভাষা থেকে রূপান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়া অব্যাহত এবং শক্তিশালী থাকায় কেউ শুধু হিন্দি ভাষাভাষী হলেও তার বিশ্ব-বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কায় নেই। ইংরেজির দাপট সেখানেও আছে কিন্তু হিন্দি পাল্টা দাপটের জায়গাও তৈরি করেছে। পাশাপাশি হিন্দি ভাষা এই অঞ্চলের অন্যান্য ভাষার জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। কারণ হিন্দিভাষী একচেটিয়া মালিকদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্যও বাড়ছে।

আরবি ভাষাভাষীদের অবস্থাও অতটা করুণ নয়। এই ভাষাটিও সচল, সক্রিয় এবং বিশ্বের গতিধারাকে ধারণ করবার মতো গতিশীলতা সেখানে আমরা দেখি। চীনা ও জাপানি ভাষা এখন বিশ্ব পরিসরে পাল্টা ক্ষমতার জায়গা তৈরি করছে। ক¤িপউটার থেকে শুরু করে সর্বত্র এই চেষ্টা উপলব্ধি করা যায়। এছাড়া কোরিয়া বা থাইল্যান্ডও ইংরেজি দিয়ে ভেসে যায়নি। এসব দেশের মানুষ তাদের নিজস্ব ভাষা নিয়ে যুদ্ধ করে টিকে থাকছে বিকশিত হচ্ছে।

বস্তুত পৃথিবীতে এমন কোনো দেশ নেই যে দেশ, পুঁজিবাদী বা সমাজতান্ত্রিক যে কাঠামোতেই হোক, অর্থনৈতিক উন্নয়ন করেছে বা করছে অথচ সে দেশের জনগণের ভাষা পরিত্যক্ত হয়েছে। চীন, জাপান তো বটেই এমনকি দুর্বলতর কোরিয়া, থাইল্যাণ্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন সর্বত্রই আমরা দেখি জোরদারভাবে তাদের জনগণের ভাষা যথেষ্ট গুরুত্ব ও কার্যকারিতা নিয়ে টিকে আছে। আর সেসব দেশেই ঔপনিবেশিক প্রভুর ভাষার দাপট একচেটিয়া, যেসব দেশে উন্নয়নের কোনো শেকড় তৈরি হয়নি। যে দেশে শাসক শ্রেণি পরগাছার মতো ঝুলে থাকে সে দেশে শাসক শ্রেণির পরজীবী লুণ্ঠন/পাচার প্রক্রিয়ায় মাতৃভাষা সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় ভাষা হিসেবে কোণঠাসা হয়ে পড়তে বাধ্য। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমরা এই ঘটনাই দেখি।

বাংলাদেশে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, কর্মসংস্থান ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা যে রীতিমতো প্রান্তিক বা অপাঙ্ক্তেয় ভাষায় পরিণত হয়েছে তার অনেকখানি ব্যাখ্যা তাই এদেশের শাসক শ্রেণির অবস্থান ও ঐতিহাসিক ধারা থেকে পাওয়া যাবে। পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান প্রান্তিক, এবং এই প্রান্তিক অবস্থান তৈরি হয়েছে ও টিকে থাকছে এদেশের পরজীবী শাসক শ্রেণির কারণে। এই শ্রেণি তার গঠন প্রকৃতি ও বিকাশধারার কারণে দেশে উৎপাদনশীল ভিত্তি নির্মাণ করবার চাইতে দ্রুত লুটপাট করে সম্পদ গঠন ও পাচারেই বেশি আগ্রহী।

উৎপাদনশীল ভিত্তি যে দেশে নির্মিত হয় না সেদেশে শিক্ষা, স্বাস্থ্যের সাধারণ ভিত্তি নির্মাণের তাগিদও তৈরি হয় না। তৈরি হয় না দেশীয় কর্মসংস্থানের ভিত্তি। তৈরি হয় না জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। সুতা দিয়ে ঝুলে থাকা শাসক শ্রেণি এদেশে প্রতিনিধিত্ব করে বাইরের ক্ষমতার, এই ক্ষমতাই তার দেশের ভেতরের দাপট নিশ্চিত করে। ‘লোকাল এজেন্ট’ হতেই তারা বেশি আগ্রহী। তাদের নিজস্ব পরিচয় নেই। সেজন্য তাদের আধিপত্য থাকা অবস্থায় সামগ্রিকভাবে যে নৈরাজিক ধ্বংসাত্মক অবস্থার সৃষ্টি হয় তাতে দেশীয় ভাষা/ভাষাসমূহ বাদ যায় না। মধ্যবিত্তের প্রবল হীনমন্যতাবোধ এর সঙ্গে যোগ হয়ে বিচ্ছিন্নতা আরও বৃদ্ধি করে।

ক্ষমতার জায়গা চর্চা হয় তারপরও। প্রান্তিক অবস্থানে কোণঠাসা বাংলা ভাষা দিয়ে আবার ক্ষমতার চর্চা হয় দুর্বলতর জাতিগোষ্ঠীর ওপর। মাতৃভাষার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত বাংলা ভাষাকে শাসক শ্রেণি অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষার অধিকার খর্ব করবার কাজে লাগায়। বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষা এবং জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার সাংবিধানিক অধিকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা এখনো নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণও সমর্থিত হয়নি।

তার মানে তরল আবেগ, প্রতারণা আর প্রহসনের আনুষ্ঠানিকতা থেকে বেরিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারিকে ঠিকমতো উপলব্ধি করতে চাইলে এই বিষয়গুলোর দিকে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। অন্য ভাষা জানা, বিশ্ব দরবারে নিজের জায়গা মজবুত করা আর নিজ ভাষা নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগা এক কথা নয়। মাতৃভাষায় দক্ষতায় পায়ের নিচে মাটি মজবুত হয়, তার ওপরেই অন্য ভাষা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের ডালপালা ছড়াতে পারে। শেকড়বিহীন জনগোষ্ঠীর ডালপালাও শুষ্ক হয়। একদিকে সমাজের ভেতর বৈষম্য আর নিপীড়ন বাড়তে থাকবে, জাতিগতভাবে গভীর হীনমন্যতা লালন করা হবে, সুযোগ পেলে দুর্বল জাতিগুলোর ওপর দমন-পীড়ন চলবে আর ভাষা নিজে নিজে স্বমহিমায় দাঁড়াবে এটা কী করে হয়? বাংলাভাষার ভবিষ্যৎ তাই ভবিষ্যৎ সেই বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কিত যে বিশ্বে সৃজনশীল বিভিন্ন জনগোষ্ঠী তাদের নিজ নিজ ভাষা নিয়ে বিশাল ঐক্যের জায়গা তৈরি করবে। সেখানে কেউ নিজ ভাষা বা জাতিগত পরিচয় নিয়ে আলগা ফুটানি করবে না আবার কেউ মন ছোটও করে রাখবে না। এটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে হবে না, বলাই বাহুল্য। বাংলাভাষার মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা না হলে ভাষার মর্যাদা কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে?

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত