সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

শ্রেণিকক্ষই হোক পাঠদানের কেন্দ্র

আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১০:৪১ পিএম

প্রাথমিক থেকে শুরু করে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক তো বটেই, বিস্ময়কর হলেও সত্য দেশের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীরাও শিক্ষকদের কাছে ব্যাচ ধরে প্রাইভেট পড়ে বা কোচিং করে।  স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষকদের কাছে কোচিং করার সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে এবং তা যেন শিক্ষাজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।  অনেক ক্ষেত্রে স্কুল-কলেজের কিছু শিক্ষকের কাছে এ নিয়ে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের জিম্মি হয়ে থাকার ঘটনাও ঘটে।  এ নিয়ে বহু আলোচনা-সমালোচনার পর প্রায় সাত বছর আগে ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা-২০১২’ অনুমোদন করে সরকার।  কিন্তু এর বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আইনি লড়াইয়ের কারণে এতদিনেও তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। অবশেষে উচ্চ আদালত গত ৭ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত রায়ে সরকারের এই নীতিমালাকে বৈধ ঘোষণা করায় তা বাস্তবায়নে এখন আর কোনো বাধা নেই।

বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চের রায়ে সরকারি নীতিমালা মোতাবেক কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরিরত শিক্ষকদের প্রাইভেট পড়ানো বা কোচিং করানোকেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।  অর্থাৎ স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসায় চাকরি করেন না, এমন স্বাধীন বা স্বনিয়োজিত শিক্ষকরা কোচিং করাতে পারবেন।  ফলে ‘কোচিং সেন্টার’ হিসেবে গড়ে ওঠা নানা ছোট-বড় প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে কোনো বাধা থাকবে না।  তবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরিরত শিক্ষকরা এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারবেন না। এতে চাকরিরত শিক্ষকদের বাড়তি উপার্জনের কোচিং পন্থা বন্ধ হলো। আর এর মধ্য দিয়ে সমাজের উচ্চশিক্ষিত বেকারদের প্রাইভেট টিউশন করানো এবং কোচিং সেন্টারে পড়ানোর ক্ষেত্রটি প্রসারিত হলো। ফলে আগের মতোই একে খণ্ডকালীন পেশা হিসেবে কাজে লাগিয়ে উপার্জনের পথ হিসেবে গ্রহণ করতে পারবেন অনেকে।

অবশ্য, ‘কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালার’ দুই নম্বর অনুচ্ছেদে স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসায় শ্রেণিকক্ষের নিয়মিত পাঠদানের বাইরে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনে ‘বিশেষ ক্লাস’ করানোর বিধান রাখা হয়েছে। অভিভাবকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানের অনুমতি সাপেক্ষে এই অতিরিক্ত ক্লাস করানোর সুযোগ পাবেন শিক্ষকরা।  বিভাগীয় ও মেট্রোপলিটন এলাকাসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এই ‘বিশেষ ক্লাসের’ সংখ্যা, ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা এবং এজন্য ফি হিসেবে আদায়যোগ্য অর্থের পরিমাণও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে নীতিমালায়। পাশাপাশি তিন নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনোভাবেই নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কোচিং বা প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না শিক্ষকরা। তবে, প্রতিষ্ঠান প্রধানের অনুমতি সাপেক্ষে অন্য প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ দশ জন শিক্ষার্থীকে বিশেষ ব্যবস্থায় প্রাইভেট পড়াতে পারবেন। পিছিয়ে পড়া বা দুর্বল শিক্ষার্থীদের বিশেষ প্রয়োজনের কথা বিবেচনায় রেখে এমন সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, মাঠ পর্যায়ে এই নীতিমালা কতটা মেনে চলা হচ্ছে তা কে বা কারা তদারকি করবেন। নীতিমালায় প্রাথমিকভাবে ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পরিষদ’ এবং বিভাগীয় ও জেলা-উপজেলা পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পরিষদ সদস্য ও শিক্ষক প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত কমিটিকে বিষয়টি তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে নানারকম শাস্তির বিধানও রাখা হয়েছে। কিন্তু এই নীতিমালা বাস্তবায়নে সবার আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের বিষয়ে শিক্ষকদের সর্বোচ্চ মনোযোগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষকরা যাতে আর্থিক বঞ্চনা বা অন্য কোনো সুযোগ-সুবিধার অভাবের কারণে উদাসীনতা দেখাতে না পারেন সে বিষয়টিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নইলে আইনি বিধান মান্য হলেও সত্যিকারের পাঠদানে কোনো অগ্রগতি হবে না।

প্রাইভেট পড়ানো বা কোচিং নয়, যে কোনো মূল্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শ্রেণিকক্ষকেই স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার পাঠদানের কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে। এজন্য এই নীতিমালার কঠোর বাস্তবায়নে অভিভাবকসহ শিক্ষার কাজে সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্বশীল উদ্যোগ প্রয়োজন। ইতিবাচক উদ্দেশ্য থেকে প্রস্তুত এ নীতিমালা শুধু আদালতের রায়ের কারণে নয়, শিক্ষার সুষ্ঠু ও সুস্থ পরিবেশ তৈরি করতে অত্যন্ত জরুরি। একইসঙ্গে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থী-শিক্ষকের সংখ্যার অনুপাতসহ আমাদের শিক্ষাকাঠামো ও শিক্ষাপদ্ধতির আনুষঙ্গিক কতগুলো বিষয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়ে জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত