শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৭ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বাংলা পঞ্জিকা : পহেলা ফাল্গুন ও আটই ফাল্গুন

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১০:৩১ পিএম

বাংলা পঞ্জিকার বয়স ১৪২৫ বছর শেষ হচ্ছে। কিন্তু অনেকে বলেন, মোগল সম্রাট আকবরের সময় তার সভাসদ আমির ফতেউল্লা সিরাজী ১৫৫৬ ইংরেজি সালে এই পঞ্জিকার প্রচলন করেছিলেন। তাহলে তা হয় না। তারা বলেন, ফতেউল্লা সিরাজী হিজরি সন অনুযায়ী খাজনা আদায়ের অসুবিধা দূর করার জন্য চান্দ্র হিজরি বছরকে সৌর বছরে রূপান্তরিত করে বাংলা সনের জন্ম দেন। কিন্তু এই কথাটি সত্য নয়। কারণ, বাংলা সন দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশে প্রচলিত একই সময়ে শুরু হওয়া পঞ্জিকাগুলোরই অন্যতম একটি ঐতিহ্যপূর্ণ পঞ্জিকা। মোগল সম্রাট আকবরের সভাসদ ফতেউল্লা সিরাজী বাংলা সন নতুন করে উদ্ভাবন করেননি বরং তিনি বাংলার সমতলে চলতি বাংলা পঞ্জিকাকে খাজনা আদায়ের বছর হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।

বর্তমান বাংলা পঞ্জিকা একটি ফসল পঞ্জিকা। এর প্রথম দিনটি থেকে শেষ দিন পর্যন্ত সময়ে রয়েছে বাংলার তিনটি ফসল মৌসুম। এই মৌসুমগুলো যথা আউশ, আমন ও রবি অনুযায়ী বাংলা বছরকে চার মাস ধরে সহজেই ভাগ করা যায়। এই পঞ্জিকার প্রথমদিন নববর্ষ হিসেবে ও শেষদিন হালখাতা হিসেবে যথেষ্ট গুরুত্ব ও ধুমধামের সঙ্গে পালন করা হয়। বাংলা পঞ্জিকার ব্যাপারে একটি বিষয় বেশ গুরুত্বপূর্ণ এই যে, কেবল বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গ নয়, বাংলা নতুন বছর আগমণের সন্ধিক্ষণের কয়েকটি দিন সারা দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় একই সময়ে (১৪-১৫ এপ্রিল) বিশেষ ধুমধামের সঙ্গে পালন করা হয়। এ সব দেশগুলো হচ্ছে কম্বোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড, মায়ানমার; চীন, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার কিছু অংশ; শ্রীলঙ্কা, তামিলনাড়–, অন্ধ্র, কেরালা, উড়িষ্যা, বিহার, আসামসহ সমগ্র উত্তর ও উত্তর-পূর্ব ভারত; ভুটান, নেপাল ও পাকিস্তানের পাঞ্জাব ও কাশ্মীর।

বাংলাদেশ এবং ভারতের বেশ কিছু গবেষক বাংলা পঞ্জিকার উৎপত্তি নিয়ে বই লিখেছেন। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত (১৯৯৩) ‘বাংলা সনের জন্মকথা’ শীর্ষক একটি বইতে জনাব মো. আবু তালিব নানামতের কথা বলে ‘আইন-ই-আকবরি’র বর্ণনা দিয়ে দেখাতে চেয়েছেন যে, আকবরের সময়ই বাংলা সনের উৎপত্তি হয়। কিন্তু ‘আইন-ই-আকবরি’ গ্রন্থে বাংলা সনের উৎপত্তি বিষয়ে লেখা হয়নি বরং এতে লেখা হয়েছে হিজরি সন অনুযায়ী রাজস্ব আদায়ের ব্যাপারে সমস্যার কথা এবং ‘এলাহি সন’ প্রবর্তনের কথা। মোগলরা তাদের সাম্রাজ্যে খাজনা আদায়ের জন্য হিজরি সন ব্যবহার করছিল। হিজরি সন চান্দ্রবছর হওয়ায় সৌর বছরের তুলনায় প্রতি বছর গড়ে ১১ দিন এগিয়ে যায়। দিল্লির মোগল শাসকরা ১৫৭৬ সালে আফগানদের হাত থেকে বাংলা জয় করে নেয়। বাংলা অঞ্চলে শস্যচাষ এই এলাকায় মৌসুমি বায়ুর আগমনের ওপর নির্ভরশীল বিধায় হিজরি সন অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করতে গিয়ে সমস্যা দেখা দিল। সম্রাট আকবর তার সভাসদ জ্যোতির্বিদ আমির ফতেউল্লা সিরাজীর পরামর্শে ১০ মার্চ ১৫৮৫ এক ফরমানের মাধ্যমে বাংলা অঞ্চলের রাজস্ব আদায় পদ্ধতি স্থানীয় শস্য পঞ্জিকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করেন।

‘বাংলা সনের জন্মকথা’ বইটিতে আইন-ই-আকবরির কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, আকবরের সভার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি রাজস্ব আদায়ের ব্যাপারে সৌর বছর প্রয়োগ করার পক্ষপাতী ছিলেন। আকবর এটা জেনে ভারতে প্রচলিত সৌর বছরগুলোর অনুরূপ খাজনা আদায় পঞ্জিকা প্রণয়নের জন্য ১০ মার্চ ১৫৮৫ এক হুকুম জারি করেন। আকবরের এই হুকুমনামা অনুযায়ী যে নতুন সনের প্রবর্তন করা হয় তার নাম ‘এলাহি সন’। আমির ফতেউল্লা সিরাজী একই সময়ে খাজনা আদায়ের জন্য এলাকাভিত্তিক কয়েকটি ফসলি পঞ্জিকা চালু করেন (পৃষ্ঠা ৪৫)। সেগুলো হলো বাংলা, আমলি (উড়িষ্যা), বিলায়েতি (মধ্য ভারত), ফসলি (উত্তর ভারত) এবং সুরসেনি (মহারাষ্ট্র)। আকবরের সিংহাসনে আরোহণের বছর ধরে এলাহি সনের বছর শুরুর দিন হলো ১১ মার্চ ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ/২৮ রবিউস সানি ৯৬৩ হিজরি। যদিও তার সিংহাসনে আরোহণের প্রকৃত দিন ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৫৫৬ (পৃষ্ঠা ১৪)। আমির ফতেউল্লা সিরাজী এলাহি সন প্রবর্তনের সময় আকবরের সিংহাসনে আরোহণের বছরটি ঠিক রাখেন, কিন্তু বছর শুরু করেন ঐ সময়ে হিজরি সনের বছর শুরুর দিন দিয়ে (পৃষ্ঠা ৩২)। আজকের বাংলা পঞ্জিকার ১৪২৫ বছর শেষ হচ্ছে, হিজরির চলছে ১৪৪০ সাল। বাংলা যেহেতু সৌর বছর এবং হিজরি যেহেতু চান্দ্রবছর আমরা পেছনের দিকে গেলে এমন এক সময়ে পৌঁছাব যখন বাংলা ও হিজরির বয়স একই ছিল। আকবরের সিংহাসনে আরোহণের বছর ছিল ১৫৫৬ ইংরেজি সাল যখন বাংলা ও হিজরির উভয়েরই বয়স ছিল ৯৬৩ বছর। আমাদের কাছে লক্ষণীয় যে, খলিফা ওমর ৬৩৮ সালে হিজরি পঞ্জিকা গণনার আদেশ দেন হিজরতের প্রকৃত বছর ৬২২ সাল থেকে। এমনকি হিজরতের প্রকৃত দিন অনুযায়ী বছর গণনার শুরু না করে চলতি আরবি মাসের প্রথম দিন ১ মহররম থেকে ঐ হিজরি সনের প্রারম্ভ ধরা হয়েছিল। (পৃষ্ঠা ৩২)

প্রতীয়মান হয় যে, কোনো রাজার রাজ্যাভিষেকের বছর ধরে যেসব সন গণনা শুরু করা হয় সে সব বছরে যেদিনই রাজার অভিষেক হোক না কেন, ঐতিহ্যের খাতিরে পঞ্জিকার শুরুর দিন অপরিবর্তিত রাখা হয়। আরও প্রতীয়মান হয় যে, আকবরের সভাসদ ফতেউল্লা সিরাজী ‘এলাহি সন’ প্রবর্তনের সময় (কার্যকর ১১ মার্চ ১৫৫৬) হিজরি সনের শুরুর দিনটি গ্রহণ করেন। কিন্তু সিরাজী বাংলা অঞ্চলে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে পূর্বে আরোপিত হিজরি সনের পরিবর্তে বাংলা অঞ্চলে ঐতিহাসিকভাবে প্রচলিত বাংলা পঞ্জিকা গ্রহণ করেন। সিরাজীর এই ব্যবস্থার ফলে বাংলা পঞ্জিকার শুরুর দিন বা সৌর বছর গণনার কোনো পরিবর্তন হয়নি।

দেখা যাবে, পৃথিবীর সকল দেশের মানুষই ঐতিহাসিকভাবে কোনো সৌর অথবা চান্দ্র পঞ্জিকার সঙ্গে অভ্যস্ত থেকেছে। এই পঞ্জিকাগুলো ভিন্ন দেশের জলবায়ুর কারণে মাস ও ঋতুতে ভিন্ন ছিল। যে সকল দেশে চান্দ্র পঞ্জিকা প্রচলিত ছিল, যেমন আরব দেশগুলোতে, প্রতি তিন বছর অন্তর একটি মাস দুবার প্রয়োগ করে (মলমাস বা   intercalary months) সৌর বছরের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনা হতো (‘আল বেরুণী’ লেখক এম. আকবর আলী। ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা ১৯৮০)। দক্ষিণ এশিয়াতে ধর্মীয় আচার পালন ও ফসল উৎপাদনের সময় হিসাবের জন্য চান্দ্র-সৌর পঞ্জিকা ব্যবহার করা হতো। মোগল আমলে রাজস্ব আদায়ের গুরুত্ব কিংবা অন্য কোনো প্রয়োজন যাই ছিল না কেন, আমাদের আজকের জাতীয় জীবনে বাংলা পঞ্জিকার গুরুত্ব অপরিসীম। এই পঞ্জিকা হিজরি থেকে ভিন্ন জাতের, শকাব্দ থেকে ভিন্ন ঐতিহ্যের এবং খ্রিস্টাব্দ থেকে ভিন্ন ঋতুবৈচিত্র্যের। তাছাড়া বর্তমান বাংলা পঞ্জিকার গোড়ার বছর এমন এক সময় (৫৯৩ খ্রিস্টাব্দ) নির্দেশ করে যখন বাংলার সমতলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে গেছে।

খ্রিষ্টীয় ৬ শতকের শেষ দশকে রাঢ়বঙ্গে শশাঙ্ক নামের এক শক্তিশালী রাজার উত্থান হয়। মগধের রাজা মহাসেনগুপ্তের মৃত্যুর পর (৫৯৫ খ্রিস্টাব্দ) এই শশাঙ্ক গৌড় ও মগধ দখল করে নেন এবং নিজেকে পঞ্চ গৌড়েশ্বর বলে ঘোষণা করেন। শশাঙ্ক এরপর থানেশ্বরের রাজাকে পরাজিত করে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। ড. রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতে শশাঙ্কই প্রথম বাঙালি রাজা যার অধীনে এত বড় এক সাম্রাজ্য ছিল। ঐতিহাসিকদের মতে শশাঙ্ক ৫৯৩ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান মুর্শিদাবাদের ১০ কিমি দূরে কর্ণসুবর্ণ (বর্তমানে কানসোনা) নামক স্থানে তার রাজধানী স্থাপন করেন। এই ইতিহাস যদি সত্যি হয়, বর্তমান কালের বাংলা সৌরপঞ্জিকার শুরুর বছর আর শশাঙ্কের রাজধানী স্থাপনের বছর একই বছর বলে নির্দেশ করে, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘দেশ’ পত্রিকার ১৬ নভেম্বর ১৯৯৬ সংখ্যায় প্রকাশিত এক পত্রে শ্রী সুধীর কুমার চট্টোপাধ্যায় জানান, ভারতের সৌর এবং চান্দ্র-সৌর পঞ্জিকাগুলো অন্তত ১৬০০ বছরের বেশি পুরনো। এই পঞ্জিকাগুলো নাক্ষত্রিক এবং এদের বছর শুরুর দিনটি পহেলা বৈশাখ যা সাধারণত ১৪ এপ্রিল নির্দিষ্ট করে। তবে এসব পঞ্জিকার মাসগুলো বিভিন্ন দৈর্ঘ্যরে হতো। এমনকি একই পঞ্জিকার মাস ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন দৈর্ঘ্যরে হতো। ব্রিটিশ রাজত্বের অবসানের পর সারা দেশের জন্য একটি একই প্রকার পঞ্জিকা প্রণয়নের উদ্দেশ্যে ভারতীয় সরকার ১৯৫২ সালের নভেম্বরে ড. মেঘনাদ সাহার নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে। সরকারের কাছে মেঘনাদ সাহা কমিটির সুপারিশ ছিল ১) নাক্ষত্রীয় পঞ্জিকার (sidereal calendar)) পরিবর্তে ক্রান্তীয় পঞ্জিকা (tropical calendar) চালু করা, ২) বছরের শুরু বৈশাখের পরিবর্তে চৈত্র থেকে শুরু করা, ৩) চৈত্র মাস ৬/৭ দিন দেরি করে শুরু করা (tropical year), ৪) শকাব্দকে জাতীয় পঞ্জিকা ঘোষণা করা।

পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে বাংলা পঞ্জিকা সংশোধনের জন্য অনুরূপ একটি কমিটি গঠন করা হয়। শহীদুল্লাহ কমিটির সুপারিশ ছিল ১) মোগলদের সময় থেকে চালু বাংলা পঞ্জিকাকে জাতীয় পঞ্জিকা করা, ২) বছরের হিসাব হিজরি বছরের গণনা হিসাবে গ্রহণ করা ৩)   বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাস ৩১ দিনের এবং অন্যান্য ৩০ দিনের করা, ৪) অধিবর্ষের (leap year) জন্য চৈত্র মাসে একটি অতিরিক্ত দিন হিসাব করা। মেঘনাদ সাহা কমিটির সুপারিশ ভারতীয় সরকার গ্রহণ করলে ঐতিহ্যবিরোধী হওয়ায় পরে বাতিল হয়। বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৭ সালে বাংলা পঞ্জিকার ক্ষেত্রে শহীদুল্লাহ কমিটির সুপারিশ গ্রহণ করে, তবে ১৪ এপ্রিল বছর শুরুর দিন এবং খ্রিষ্টীয় পঞ্জিকার অধিবর্ষের বছরে ফাল্গুন মাসে একদিন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

আমাদের জাতীয় জীবনে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির গুরুত্ব অপরিসীম। ঐ দিনটি ছিল আটই ফাল্গুন ১৩৫৮। বর্তমান বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে একুশে ফেব্রুয়ারি ৯ ফাল্গুন হয়। কিন্তু একুশে ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে গৃহীত হওয়ায় আটই ফাল্গুন উদযাপনের কথাও আছে। বাংলাদেশের পঞ্জিকাটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বা পৃথিবীর অন্যান্য বাংলাভাষী অঞ্চলে গৃহীত হয়নি। সেখানে ঐতিহ্যবাহী বাংলা পঞ্জিকাই চলে। সেখানে ১৪ এপ্রিলের পরিবর্তে ১৫ এপ্রিল নববর্ষ উদযাপিত হয়। আমি তাই বাংলা পঞ্জিকার ঐতিহ্য মেনে পহেলা বৈশাখ ১৪ এপ্রিলের পরিবর্তে ১৫ এপ্রিল করতে বলছি। এর ফলে একুশে ফেব্রুয়ারি আটই ফাল্গুন হবে, দুই বাংলায় একই দিন নববর্ষ হবে। আমাদের দেশের মেয়েরা ফাল্গুনের প্রথম দিনে শখ করে হলুদ শাড়ি পরে যে বসন্ত উৎসব করে, এই সংস্কারের ফলে পহেলা ফাল্গুন হবে ১৪ ফেব্রুয়ারি যা কিনা ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’ বা পুনর্বার ‘ভালোবাসার দিন’ও বটে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত