মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

জনবান্ধব চিকিৎসক নীতিমালা চাই

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১০:৩৮ পিএম

দেশের চিকিৎসা খাতের পেশাজীবীদের জন্য একটি ‘পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা’ তৈরির লক্ষ্যে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চিকিৎসকদের ‘প্রাইভেট প্র্যাকটিস’ বন্ধের আদেশ চেয়ে করা একটি রিট আবেদেনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাথমিক শুনানির পর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এ আদেশ দেয়।

সরকারের তরফে দাবি করা হয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি ঘটেছে। শুধু রাজধানীতে নয়, গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলেও গড়ে উঠেছে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান। উপজেলার হাসপাতালগুলোতে এখন প্যাথলজি পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে; কিছু ক্ষেত্রে জরুরি অস্ত্রোপচারও করা যায়। কমিউনিটি হাসপাতালের সংখ্যা ১৩ হাজারেরও বেশি এবং সেখানে চিকিৎসা সুবিধা বাড়ছে। কিন্তু শহর ও গ্রাম সর্বত্রই অভিন্ন চিত্রÑ চিকিৎসকদের অনেকেই নিজ নিজ কর্মস্থলে অনুপস্থিত। তারা সরকারের কাছ থেকে বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধা গ্রহণ করেন, কিন্তু দায়িত্ব পালনে আন্তরিক থাকেন না। বরং তাদের মনোযোগ থাকে প্রাইভেট প্র্যাকটিসে।  অনেক খ্যাতিমান চিকিৎসক নিজের কর্মস্থলে যতটা থাকেন, তার তুলনায় ঢের বেশি সময় দেন এক বা একাধিক প্রাইভেট ক্লিনিক ও চেম্বারে। চিকিৎসকদের যুক্তি হলোÑ সরকারি হাসপাতালে বেতন ও অন্যান্য সুবিধা কম। এ অভিযোগ সত্ত্বেও তারা সরকারি চাকরিতে বহাল থেকেই বাড়তি উপার্জনের প্রতি মনোযোগী থাকেন। এ মনোভাব চিকিৎসকদের পেশাগত দায়িত্বের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। জনগণের সক্ষমতা বুঝে চিকিৎসাসেবা প্রদান করা চিকিৎসকদের দায়িত্ব। 

এক জন চিকিৎসকের দায়িত্ব শুধু তার রোগীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, সার্বিকভাবে সমাজের প্রতিও তার সমান দায়িত্ব থেকে যায়। সহমর্মিতা ও সংবেদনশীলতার সঙ্গে এক জন রোগীকে উপযুক্ত পরিষেবা দেওয়াই চিকিৎসকের ধর্ম। শুধু তা-ই নয়, কর্তব্যবোধ, মানবিকতাও এক জন চিকিৎসকের পেশার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রোগীর রোগ প্রশমনে উৎকৃষ্ট চিকিৎসা করার জন্য প্রতিনিয়ত একজন চিকিৎসককে সাম্প্রতিক চিকিৎসাশাস্ত্রের হালহকিকত জানতে হবে।

চিকিৎসকদের ভুল চিকিৎসা ও দায়িত্বে অবহেলার ভয়াবহ শিকার হওয়ার কিছু ঘটনাও সামনে আসে। এ ধরনের ঘটনায় চিকিৎসক এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়।  দেশে এখনো চিকিৎসক-রোগীর আনুপাতিক হার আশানুরূপ নয়। দেশ থেকে প্রচুর রোগী ভারতসহ নানা দেশে যায়। এক্ষেত্রে রোগীরা প্রধানত পেশাদারিত্ব ও আন্তরিকতার অভাবের অভিযোগ করেন। তাই চিকিৎসানীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত দেশেই আন্তর্জাতিক মানের পেশাদারি ও আন্তরিক সেবা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি ডায়াগনস্টিক ও ল্যাবগুলোর মান নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি।

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় হাইকোর্টের যে নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশনা তা একটি শুভ উদ্যোগ। এই নির্দেশনাকে বাস্তবে রূপদান করার দায়িত্ব সরকারের। তবে নীতিমালা প্রণয়নের সময় কিছু বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। দেশে সরকারি হাসপাতালে আসন সংখ্যা ও শয্যাসংখ্যা এখনো অনেক কম। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের ওপর নির্ভরতা থাকবে।  এ হাসপাতালগুলো চালানোর জন্য অভিজ্ঞ চিকিৎসকদেরও প্রয়োজন হবে। কিন্তু হাসপাতালগুলোকে নিয়মের মধ্যে আনা জরুরি। প্রাইভেট প্র্যাকটিসের ফি সাধারণের আয়ত্তের মধ্যে রাখতে হবে, আবার চিকিৎসকরাও যেন সাধারণদের সাদরে গ্রহণ করে সেই বিবেচনাটি রাখা বাঞ্ছনীয়। তবে এক্ষেত্রে চিকিৎসকদের দুই ধরনের রোগীর ক্ষেত্রে সমান মনোযোগী হতে হবে। প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসাব্যয় সাধারণের নাগালের মধ্যে থাকে সেই ব্যবস্থাও করতে হবে। একটি স্বাধীন কমিশনের মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতের সমস্যাগুলো সমাধানের কথা ভাবা যেতে পারে। রোগীরা যাতে তাদের অভিযোগ জানাতে পারেন এবং সে অভিযোগ বিবেচনায় নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয় সে ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারি হাসপাতাল অপ্রতুল হলেও সাধারণ বা মধ্যবিত্ত রোগীদের শেষ আশ্রয় সরকারি হাসপাতাল। তাই এই হাসপাতালগুলোর সেবার মান বাড়ানো যেমন জরুরি তেমনি অবকাঠামো ও চিকিৎসক, চিকিৎসা সরঞ্জামের মান নিশ্চিত করা ও সেগুলোর সংখ্যা বাড়ানোও দরকার। দক্ষ চিকিৎসকের সংখ্যাও বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে গ্রাম ও শহরের বৈষম্য কমিয়ে আনতে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে নীতিমালায়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত