রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ভালোবাসার অনুভূতি আছে পাখিদেরও

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১১:৪২ পিএম

আবেগ-অনুভূতি কি শুধু মানুষের? পশুপাখিরা কি একে অপরকে ভালোবাসে না, ব্যথায় কাঁদে না? এই প্রশ্ন মানুষের চিরন্তন। যদিও গত শতাব্দীতে মানুষ ছাড়াও অন্য প্রজাতিগুলোর আবেগ-অনুভূতি আছে বলে মত দিয়েছেন বেশ কিছু গবেষক। এই গবেষণা এখনো চলমান। এখনো অনেক গবেষক পশুপাখিদের মন খুঁজে বেড়াচ্ছেন। সম্প্রতি মার্কিন পত্রিকা দি আটলান্টিকের সাংবাদিক রস এন্ডারসন ভারত ভ্রমণে এসে পাখিদের একটি হাসপাতাল পরিদর্শন করেছিলেন। পশুপাখিদের আবেগ-অনুভূতি সম্পর্কে তার পর্যবেক্ষণ নিয়ে লিখেছেন পরাগ মাঝি

 

দিল্লির বার্ড হসপিটাল

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে বেশ কটি বার্ড হসপিটাল আছে। গত বসন্তে এন্ডারসন এমনই একটি হাসপাতাল পরিদর্শন করেছিলেন। তিনতলা হাসপাতালটির দোতলায় তিনি দেখতে পান ২৭-২৮ বছরের একজন যুবক পাখিদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আছেন। তার নাম ধীরাজ সিং। আর ছিলেন একজন বয়স্ক মহিলা যিনি একটি সাদা রঙের টিয়া পাখিকে পরিচর্যা করছিলেন। বেড়ালের আক্রমণে টিয়াটি রক্তাক্ত ছিল। সাত বছরের ছোট্ট এক মেয়ে এসেছিল একটি আহত মোরগ হাতে নিয়ে। হাসপাতালটির প্রধান ওয়ার্ডটি ছিল সরু এবং প্রায় ৪০ ফুট দীর্ঘ। দুপাশে অসংখ্য খাঁচায় বন্দি ছিল পাখি। তাদের কারও ডানা ভাঙা, কেউ রোগাক্রান্ত। জিনস পরা এই হাসপাতালের সবচেয়ে কম বয়সী কর্মী ধীরাজের মুখে ছিল একটি মাস্ক। হাসপাতালের সবচেয়ে বয়স্ক কর্মীটি রাতের বেলায় ডিউটি করেন। সিকি শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে তিনি এই হাসপাতালের সঙ্গে জড়িত। তার হাত ধরেই এ হাসপাতালের অসংখ্য পাখি সুস্থ হয়ে নীড়ে ফিরে গেছে। তিনি পাখিদের ব্যথা কমানোর জন্য চিকিৎসা থেকে শুরু করে ওষুধ সরবরাহ ও অ্যান্টিবায়োটিক দেন। হাসপাতালের কর্মীরা এত সাবলীল ও দক্ষতার সঙ্গে পাখিদের নাড়াচাড়া করেন, তা সত্যিই দেখার মতো। কেউ তার দামি মোবাইলটিকে যেভাবে হাতের তালুতে নিয়ে ব্যবহার করেন, অনেকটা তেমনই। অন্যান্য পাখি হাসপাতালের মতো এই হাসপাতালটিও পরিচালনা করেন জৈন ভাবধারার মানুষরা।

জৈন ভাবধারা

জৈন ধর্ম অনুসারে শুধু মানবতার বিরুদ্ধে হিংস্রতাই গর্হিত কাজ নয়, বরং পশুপাখিদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধও সমান গর্হিত কাজ। দিল্লির বার্ড হসপিটালের ওয়াল জুড়ে জৈন ধর্মের বিভিন্ন উপদেশ ও চিত্রকর্ম দেখা যায়। ভারতে জৈন ধর্মীয় মানুষের সংখ্যা এক শতাংশেরও কম। যদিও এ ধর্মটি হাজার বছরের পুরনো।

ত্রয়োদশ শতকে জৈনরা একজন হিন্দু রাজাকে নিজেদের দলে টেনেছিলেন এবং তাকে দিয়ে পশুপাখিদের নিরাপত্তার জন্য একটি আইন পাস করেছিলেন। স্বয়ং বুদ্ধ জৈন বিশ্বাস থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন। মহাত্মা গান্ধী যখন তার অহিংস মতবাদ চালু করেন, এর নেপথ্যে তার কয়েকজন জৈন বন্ধুরও প্রভাব ছিল।

জৈন ধর্মে বিশ্বাসী মানুষ যান্ত্রিক জীবনের বাইরে থাকতে চায়। তারা বিশ্বাস করে ছোট্ট একটি পোকা থেকে শুরু করে বড় যেকোনো প্রাণীরই ব্যথার অনুভূতি আছে। জৈন সন্ন্যাসীরা কোনো গাছের শিকড় খাওয়াও পরিহার করেছিলেন। তাদের গায়ে চড়ানো সাদা কাপড়টিও সুতি। তারা সিল্কের কোনো কাপড় পরেনা, কারণ রেশম পোকাদের গর্ভ থেকে এই কাপড়ের সুতো বের করা হয়। বর্ষাকালে তারা ভ্রমণও পরিত্যাগ করে। কারণ তারা মনে করে এই ঋতুতে ব্যাকটেরিয়া থেকে শুরু করে অন্য ক্ষুদ্রাকৃতির প্রাণীরা প্রকৃতিতে ছড়িয়ে থাকে। মানুষের চলাচলে তারা সীমাহীন ব্যথার সম্মুখীন হতে পারে। মানুষের মতো সব প্রাণীরই ভয়, ব্যথা, দুঃখ ও আনন্দ আছে। আছে ভালোবাসারও অনুভূতি।

বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান

আধুনিক বিজ্ঞান, বিশেষ করে পশ্চিমা গবেষক ও দার্শনিকরাও সুদীর্ঘকাল ধরে পশুপাখিদের আবেগ-অনুভূতির ব্যাপারটিকে পাশ কাটিয়ে এসেছে। ভাবা হতো, মানুষ ছাড়া অন্যান্য প্রাণী অনুভূতিহীন সৃষ্টি। যদিও ডারউইন বহু আগেই চেতনার বিবর্তন নিয়ে তার মত দিয়েছিলেন। তবে দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের পর অসংখ্য গবেষক প্রাণীদের আচরণ এবং মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। এসব গবেষণালব্ধ অনেক তথ্যই প্রতি বছর প্রকাশিত হচ্ছে। এসব গবেষণাপত্র অনুযায়ী বিজ্ঞানীরা বেশ কিছু পশুপাখির মানবিক চেতনার হদিস পেয়েছেন।

পিথাগোরাস ও অন্যান্য হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া, পশ্চিমা দার্শনিকদের কেউই মানুষ ছাড়া অন্যান্য প্রাণীর আবেগ-অনুভূতি নিয়ে ভাবেননি। তবে, প্রাচ্যের দার্শনিকদের মধ্যে এই ভাবনাটার জোরালো প্রমাণ পাওয়া যায়, বিশেষ করে জৈনদের মধ্যে। পশুপাখিদের নৈতিক অধিকার নিয়ে তারা অন্তত তিন হাজার বছর আগেই ভাবনাচিন্তা শুরু করেছিলেন।

বার্ড হসপিটালের অভিজ্ঞতা

এন্ডারসন হাসপাতালকর্মী ধীরাজ সিংকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এমন কোনো পাখি কি আছে, যে আপনার কাজে বিঘœ ঘটিয়েছে? কিংবা পাখিদের আচরণ নিয়ে আপনার অভিজ্ঞতা কী? ধীরাজ জানিয়েছিলেন, একটি পাখি ছিল যে তার হাত থকে খাবার খাওয়া প্রত্যাখ্যান করেছিল। একটি কাক ছিল যে চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল ছাড়ার পর মাঝেমধ্যেই এসে খাবার চাইত। কাকটির খাবার চাওয়ার ডাকটিকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে পারেন ধীরাজ। একটি বাদামি রঙের তোতাপাখি ছিল, যে কি-না মানুষের ৯০০ শব্দকে আয়ত্ত করেছিল। এ ক্ষেত্রে দেখা যায়, পাখিরা সেসব শব্দই আওড়ে বেড়াও, যেগুলো তাদের শেখানো হয়েছে। কথা বলতে পারে এমন অসংখ্য পাখির চিত্র একই রকম। তাদের কেউই আজ পর্যন্ত নিজের আবেগ কিংবা সচেতনতার কথা মুখ ফোটে বলে ওঠেনি।

জানা যায়, জাপানে একটি কাকসমাজ গড়ে উঠেছে, যারা ট্রাফিক সিগন্যালগুলোতে ভূমিকা পালন করে। গাড়িতে বসে থাকা চালককে আখরোটের বিচি ফেলে সিগন্যাল সম্পর্কে সতর্ক করে। শরীরের তুলনায় কাকের মস্তিষ্কের আয়তনও অন্য পাখিদের চেয়ে বেশি। প্রাণিজগতে তিমি মাছের মস্তিষ্কই সবচেয়ে বড়। ধীরাজের সঙ্গে যখন এন্ডারসন কথা বলছিলেন, ঠিক তখনই একটি কাক তার আচরণে জানিয়ে দিয়েছিল, সে খুব বিরক্ত হচ্ছে।

২০০৮ সালে কাক গোত্রেরই একটি ম্যাগপাই পাখি আয়না পরীক্ষায় পাস করেছিল। পাখিটির ডানায় রঙিন চিহ্ন এঁকে তাকে একটি আয়নার সামনে দাঁড় করানো হয়েছিল। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে পাখিটি তার ডানায় আঁকা চিহ্নটি পরখ করে দেখেছিল।

বার্ড হসপিটালে যেসব পাখি মারা যায় তাদের দিল্লির ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া একটি নদীর পাশে সমাহিত করা হয়। আর সুস্থ হলে হাসপাতালের ছাদ থেকে তাদের মুক্ত করে দেওয়া হয়। ধীরাজ জানান, ছেড়ে দেওয়া অনেক পাখিই আবার ফিরে আসে হাসপাতালে। তাদের মধ্যে দু-একটি আবার কর্মীদের কাঁধে চড়ে বসে। যদিও কাকরা কখনো কাঁধে এসে বসেনি। তবে, সুস্থ হওয়া অনেক কাকই হাসপাতালের চারপাশে এসে পাক খেয়ে যায়। তাদের ভাবটা এমন, পুরনো আত্মীয়দের একবার দেখে যেতে এসেছে। কা কা করে ধীরাজকে ডাকে। কাকরা মানুষের চেহারা আলাদা আলাদা করে চিহ্নিত করতে পারে। কোনো মানুষকে পছন্দ না হলে তারা তাদের অনবরত কর্কশ ডাকে বুঝিয়ে দেয়। যাদের পছন্দ করে তাদের জন্য আবার উপহারও নিয়ে আসে। এসব উপহারের মধ্যে কোনো চকমকে রঙিন কাচের টুকরো কিংবা বোতাম উল্লেখযোগ্য। ধীরাজ এগুলো বুঝতে পারে।

জৈন মন্দির

হাসপাতাল পরিদর্শনের পরদিনই দিল্লি ছাড়েন এন্ডারসন। এবার তার লক্ষ্য একটি পাহাড়ের চূড়ায় থাকা জৈন মন্দির। যমুনা নদীর তীরঘেঁষে তাকে বহনকারী গাড়িটি সেদিকেই যাচ্ছিল। তীব্র দূষণের শিকার এখন যমুনা নদী। একসময় এর স্বচ্ছ জলধারায় বিচরণ করত সীমাহীন মাছ। এর সংখ্যা ধীরে ধীরে এখন কমে এসেছে। যদিও বিরূপ আবহাওয়ায় টিকে থাকার মতো ক্ষমতা আছে মাছের। তাদের শরীরে আছে বিশেষ ধরনের অভিযোজন ক্ষমতা। পানি দূষিত হলে কিংবা তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে এই ক্ষমতাকে কাজে লাগায় মাছ।

যমুনা নদীর তীরে শাওরিপুর নামক এক গ্রামে একদা জন্মেছিলেন নেমিনাথ। তিনি একজন জৈনগুরু। পশুপাখিদের প্রতি তিনি ছিলেন সহানুভূতিশীল। জৈনরা বলেন, নেমিনাথ জন্মেছিলেন ৮৪ হাজার বছর আগে। যদিও গবেষকদের দাবি, খ্রিস্টজন্মের ৩ হাজার ২০০ বছর আগে নেমিনাথের জন্ম হয়েছিল। যমুনা নদীর তীরে তিনি গরু-ছাগল চরাতেন এবং সেখান থেকেই তার মধ্যে প্রাণীদের প্রতি সহানুভূতিশীল মনোভব গড়ে ওঠে। এন্ডারসনের গাড়িটি দিল্লি থেকে টানা চার ঘণ্টা দৌড়ানোর পর নেমিনাথের জন্মস্থান শাওরিপুর গিয়ে থামে। নেমিনাথ জৈনদের ২৪ জন প্রধান গুরুর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। জৈন ধর্মানুসারে যুগে যুগে তাদের পুনর্জন্ম হয়। জানা যায়, বিয়ের দিন একটি হাতির পিঠে চড়ে বসেছিলেন তিনি। এই হাতির পিঠে চড়েই তিনি মন্দিরে যেতে চেয়েছিলেন, যেখানে তিনি বিয়ে করবেন। কিন্তু পথিমধ্যে তিনি কিছু আর্তনাদ শুনেছিলেন এবং হাতির মাহুতের কাছে জিজ্ঞেস করেছিলেন এর উৎস কোথায়। মাহুত তাকে জানান, এগুলো সেসব পশুর আর্তনাদ, যেগুলো তার বিয়ে উপলক্ষে বলি দেওয়া হচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে আশ্চর্য পরিবর্তন ঘটেছিল নেমিনাথের জীবনে। তিনি তখন পর্যন্ত বেঁচে থাকা সবগুলো প্রাণীকে ছেড়ে দিয়েছিলেন। এমনকি তার সঙ্গে থাকা একটি জীবিত মাছকেও যমুনায় অবমুক্ত করেছিলেন। বিয়ের পর তিনি গিরনা অভিমুখে যাত্রা করেন। এটি হলো আরব সাগর থেকে ৪০ মাইল দূরে অবস্থিত গুজরাটের একটি পর্বত। এই পর্বতের চূড়ায় একসময় আস্তানা গেড়ে ছিলেন নেমিনাথ। এখানে বসেই সমগ্র জীবসত্তাকে ধারণ করেছিলেন তিনি। জৈনরা বিশ^াস করেন সব প্রাণীর মধ্যে মানুষরা ‘বিশেষ’। কারণ সর্ব প্রাণীর মধ্যে কেবল মানুষই আলোকপ্রাপ্ত।

এন্ডারসন নেমিনাথের সেই আস্তানার উদ্দেশেই যাচ্ছিলেন। মন্দিরের কাছে যেতে হলে পাহাড়ি সিঁড়ির প্রায় সাত হাজারটি ধাপ পাড়ি দিতে হবে তাকে। তার পাশে হাঁটছিল নারী-পুরুষ থেকে শুরু করে কম বয়সী অনেক দর্শনার্থীও। এই জনস্রোতে ছিল জৈন সন্ন্যাসীরাও।

জৈন সন্ন্যাসীরা যখন পার্থিব জীবন পরিত্যাগ করে, তখন তারা সব ধরনের পারিবারিক বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে যায়। তারা শেষবারের মতো তাদের সন্তানদের একবার বুকে জড়িয়ে নেন এবং বিদায় নেন চিরজীবনের জন্য।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত