সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

আত্মসমর্পণে আমন্ত্রণ পাননি বদি

আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০২:৩৯ এএম

এক দিন পর শনিবার কক্সবাজারের টেকনাফে প্রথমবারের মতো ১৫৭ জন ইয়াবা কারবারি আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছে। এর মধ্যে কক্সবাজারের কোনো একটি স্থানে এসব ইয়াবা কারবারি  পুলিশ হেফাজতে অবস্থান করছে। গতকাল বিকেলে কক্সবাজার পুলিশ প্রশাসন থেকে ৫১ জনের একটি তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এদের প্রত্যেকের প্রোফাইল তৈরি করা হয়েছে। বাকিগুলো আগামীকালের মধ্যে শেষ করা হবে।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান আয়োজনে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি অনুষ্ঠানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির প্রথম স্ত্রী কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ)-এর সংসদ সদস্য স্ত্রী শাহীন আকতার চৌধুরী আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেয়েছেন বলে জানান মাসুদ। বদি আমন্ত্রণ পেয়েছেন কি না এই প্রশ্ন তিনি এড়িয়ে যান।

বদির স্ত্রী শাহীন আকতার বলেন, তিনি আমন্ত্রণ পেয়েছেন এবং এই আত্মসমর্পণে সাবেক সংসদ সদস্য বদি ও তার নিজের ভূমিকা রয়েছে। অনুষ্ঠানে বদির আমন্ত্রণ পাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা আয়োজকরা বলতে পারবেন। তিনি বলেন, গত কয়েক দিন ধরে গণমাধ্যমে বদির আত্মসমর্পণসহ অনেক বিষয়ে সমালোচনা হচ্ছে এটা ঠিক নয়। তিনি বলেন, তালিকায় বদির নাম থাকলে তিনি অবশ্যই আত্মসমর্পণ করবেন। শাহীন চৌধুরী বলেন, টেকনাফ কক্সবাজারকে ইয়াবামুক্ত করতে যা দরকার আমি তাই করব।

এদিকে বদির ঘনিষ্ঠ কয়েকজন বলেছেন, গতকাল পর্যন্ত বদি অনুষ্ঠানে থাকার আমন্ত্রণ পাননি। তবে আত্মসমর্পণের যেসব তালিকা করা হচ্ছে তা বদির সহযোগিতা নিয়েই করা হচ্ছে। অনুষ্ঠানে দাওয়াত না পাওয়ায় বদির খুব মন খারাপ। তাছাড়া ইদানীং শাহীন চৌধুরীর সঙ্গে সম্পর্কে কিছুটা টানাপড়েন চলছে।

এদিকে আত্মসমর্পণ নিয়ে টেকনাফসহ দেশব্যাপী আলোচনা সমালোচনা চলছে। টেকনাফের স্থানীয়রা বলছেন, গত এক বছরে বন্দুকযুদ্ধে ৬০ জন ইয়াবা কারবারি  নিহত হয়। সম্প্রতি ইয়াবার বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযানে নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আর এই অভিযানে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে ইয়াবা পাচারকারীদের মৃত্যুর হার বেড়ে যায়। এরপর অনেক ইয়াবা কারবারিই আত্মসমর্পণের ইচ্ছা প্রকাশ করে। অনেকেই ইতোমধ্যে আত্মসমর্পণের উদ্দেশ্যে বিদেশ থেকেও ফিরে এসেছে।

আত্মসমর্পণকারীদের বিরুদ্ধে নতুন করে কোনো মামলা রুজু হবে না। পুরনো মামলাগুলো তাদের আইনিভাবে মোকাবিলা করতে হবে। এক্ষেত্রে তাদের সুপথে ফিরতে সরকার সহায়তা করবে। তারা মনে করছে, পালিয়ে থাকার চেয়ে আত্মসমর্পণ অনেকটাই নিরাপদ।

আবার আত্মসমর্পণকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এটা সরকারের একটি আইওয়াশ গেম। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী ইয়াবা কারবারিরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাবে।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, এটা একটা সাজানো নাটকই হবে। মানুষকে তারা বোঝাবে মাদক নির্মূলে বিশাল কাজ করেছে সরকার। ইয়াবা গডফাদার আবদুর রহমান বদি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং তার স্ত্রীকে সংসদ সদস্য বানানো হচ্ছে। ঘরের ভেতরের মাদকের কারবারি রেখে সরকার মাদকমুক্ত সমাজ গড়বে, এটা কেউ বিশ্বাস করবে না।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, শনিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে এসব ইয়াবা পাচারকারী আত্মসমর্পণ করবে বলে জানা গেছে। ওইদিন সকাল ১০টায় টেকনাফ কলেজ মাঠে এই অনুষ্ঠান হবে। অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হাতে প্রতীকীভাবে ইয়াবা ট্যাবলেট জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করবে দেড় শতাধিক ইয়াবা কারবারি। তাদের মধ্যে অন্তত ৩৫ জন গডফাদার। আত্মসমর্পণের জন্য এরই মধ্যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে এসেছে তারা। তাদের মধ্যে রয়েছে টেকনাফের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির তিন ভাই আবদুল আমিন, মো. সফিক ও মো. ফয়সাল, ভাগিনা সাহেদুর রহমান নিপু এবং বেয়াই শাহেদ কামাল।

আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়াও স্বরাষ্ট্র সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দিন, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও এ সময় উপস্থিত থাকবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, তালিকাভুক্ত শীর্ষ ইয়াবা কারবারিদের অনেকে আত্মসমর্পণের জন্য যোগাযোগ করেছে। হেফাজতে থাকা কারবারিদের কাছ থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।

কক্সবাজার জেলা পুলিশের তথ্যমতে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় কক্সবাজার জেলায় ১ হাজার ১৫১ জন ইয়াবা কারবারি রয়েছে। এদের বেশিরভাগ সীমান্ত উপজেলা টেকনাফের। মাদক ও ইয়াবার বিরুদ্ধে গত বছরের ৪ মে থেকে শুরু হয়েছে বিশেষ অভিযান। এরমধ্যে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে ৪২ জন, যার ৩৭ জনই টেকনাফের। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ৭৩ গডফাদারের মধ্যে মাত্র চারজন বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, মাদকে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছি। এখানে কোনো দলমত দেখা হচ্ছে না। একজন ইয়াবা কারবারিও থাকবে না। আত্মসমর্পণ করে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, তার মানে এই নয় তাদের ক্ষমা করে দেওয়া হচ্ছে। এই অভিযান থাকবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্য মতে জানা গেছে, গতকাল বিকেলে কক্সবাজারের হেফাজত ক্যাম্প থেকে ৫১ জনের একটি তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ২১ জন বড় কারবারি। এরা হলোÑ নুরুল হুদা ওরফে নুরুল হুদা মেম্বার, এনামুল হক, আব্দুর রহমান, জিয়াউর রহমান, নুরুল কবির, সৈয়দ আহম্মদ ছৌওতু, সৈয়দ হোসেন, সৈয়দ ইউনুস, শাহ আলম, মো. শাহেদ রহমান নিপু, আমিনুর রহমান ওরফে আব্দুল আমিন, মারুফ বিন খলিল, শাহেদ কামাল ওরফে সাহেদ, নুরুল বসর ওরফে নুরশাদ কাউন্সিলর, ফয়সাল রহমান, জুবায়ের হোসেন, দিদার মিয়া, মোজাম্মেল হক, একরাম হোসেন, আব্দুল আমিন ও মো. জামাল মেম্বার।

বাকিদের মধ্যে রয়েছে মোয়াজ্জেম হোসেন দানু মেম্বার, জাফর আহম্মেদ ওরফে জাফর আলম, নুরুল আলম, রশিদ আহম্মদ ওরফে রশিদ খুলু, রুস্তম আলী, শফিউল্লাহ, সৈয়দ আলম, আব্দুল করিম ওরফে করিম মাঝি, আব্দুল কুদ্দুস, মো. সিরাজ, আব্দুল হামিদ, মো. রফিক, মো. সেলিম, মো. রহিম উল্লাহ, মো. হেলাল, মো. আলম, আব্দুর রহমান, শফিকুল ইসলাম শফিক, নজরুল ইসলাম, নুরুল বসর ওরফে কালা ভাই, দিল মোহাম্মদ, মো. হাছন, কামরুল হাসান রাসেল, নুর মোহাম্মদ, বদিউর রহমান, মংসং থেইং, জাহাঙ্গীর আলম, শাহ আজম, আলমগীর ফয়সাল।

তথ্য মতে, ক্যাম্পে এখন পর্যন্ত আত্মসমর্পণের জন্য ১৫৭ জন ইয়াবা কারবারি রয়েছেন। গতকাল পর্যন্ত ৬৩ জনের প্রোফাইল তৈরি করা হয়েছে। বাকিদের গুলো আজ-কালের মধ্যে শেষ করা হবে।

 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত