মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

ক্যানসার ওয়ার্ড যেন নিজেই আক্রান্ত

আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৩:৩৮ এএম

চট্টগ্রামে প্রতি বছর ক্যানসার রোগীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়লেও সেই অনুপাতে সুচিকিৎসার সুযোগ বাড়ছে না। চিকিৎসায় একমাত্র ভরসা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ক্যানসার ওয়ার্ডে রয়েছে নানা সমস্যা। এখানে জনবল, যন্ত্রপাতি ও শয্যা সংকট তীব্র। ফলে অভিজ্ঞ চিকিৎসক থাকার পরও রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। গত ২০ জানুয়ারি থেকে নষ্ট নারীদের স্তন ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগ নির্ণয়ের মেমোগ্রাফি মেশিন। প্রায়ই ব্র্যাকিথেরাপি মেশিন নষ্ট হয়ে ভোগান্তিতে পড়েন রোগীরা।

হাসপাতালের রেডিওথেরাপি ওয়ার্ডের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর নতুন করে সাড়ে ৪ হাজার ক্যানসার রোগী চিকিৎসা নিতে আসে। এর মধ্যে ৪৮ শতাংশ নারী। তারা স্তন ও জরায়ু ক্যানসারে আক্রান্ত। সংখ্যায় এটি আড়াই হাজারের মতো। এই নারীদের ২৫ শতাংশ স্তন ক্যানসারে ও ২০ শতাংশ জরায়ু ক্যানসারে ভুগছে। যাদের বয়স ১৮ থেকে ২২ বছর। এখানে বহির্বিভাগে দৈনিক গড়ে চিকিৎসা নেয় আড়াইশ রোগী।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, রোগীদের থেরাপি দেওয়ার জন্য আছে মাত্র একটি কোবাল্ট মেশিন। ওয়ার্ডে ২৪টি শয্যা থাকলেও রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। এখানে

রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপি দিতে রোগী ভর্তি করা হয়। ১০ জন নার্সের মধ্যে ক্যানসার রোগে প্রশিক্ষিত কেবল দুজন। রোগীদের ডে কেয়ার সেন্টারে শয্যাসংখ্যা মাত্র ছয়। ক্যানসার ওয়ার্ডের এক চিকিৎসক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোবাল্ট মেশিন সংকটের কারণে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া কষ্টকর হয়ে পড়েছে। হাসপাতালে রোগীর অনুপাতে শয্যা ও একটিমাত্র কোবাল্ট মেশিন খুবই অপ্রতুল। এখানে অন্তত ১০টি কোবাল্ট মেশিন প্রয়োজন। শয্যাসংখ্যা ২৪ থেকে বাড়িয়ে ১০০ করা দরকার।’ তিনি জানান, একমাত্র কোবাল্ট মেশিনটি দিয়ে গড়ে ৭০ জন রোগীর থেরাপি দেওয়া হচ্ছে। মেশিনটি চালানোর জন্য চারজন টেকনিশিয়ান প্রয়োজন হলেও আছেন দুজন।

ক্যানসার বিভাগের প্রধান ডা. আলী আসগর চৌধুরী বলেন, ‘চট্টগ্রামে বেসরকারি উদ্যোগে ক্যানসার চিকিৎসায় কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে না ওঠায় চমেক হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়ছে। এখানে কেমোথেরাপি দেওয়ার জন্য আলাদা টেকনোলজিস্ট ও রোগীদের সেবায় প্রশিক্ষিত নার্সের প্রয়োজন।’

এদিকে নারীদের জরায়ু ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্র্যাকিথেরাপি মেশিনটি বেশিরভাগ সময় নষ্ট থাকায় রোগীরা সেবা পান না। বাঁশখালীর বানিগ্রাম থেকে ব্র্যাকিথেরাপি নিতে আসা আয়েশা খাতুন এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘গত সপ্তাহে থেরাপি দিয়েছি, আজ এসে শুনলাম মেশিন নষ্ট হয়ে গেছে।’

এ বিষয়ে রেডিওলজি বিভাগের প্রধান সুভাষ মজুমদার বলেন, ‘মাঝে মাঝে এই মেশিন নষ্ট হয়ে যায়। এটি জাপানের তৈরি, তাদের বাংলাদেশি এজেন্সির লোক এসে এটা ঠিক করে।’ মেমোগ্রাফি মেশিনের ব্যাপারে বলেন, ‘ফিল্ম ক্যাসেট নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। জাপানি হিটাচি ব্র্যান্ডের মেশিনটি মেরামতেও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হয়।’

জরায়ু ক্যানসারে রোগীদের ব্র্যাকিথেরাপি অপরিহার্য বলে জানান ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ডা. আলী আসগর চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘তেজস্ক্রিয়তার জন্য অনেক সময় শরীরের কোষ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে অনেক টেকনোলজিস্ট এই মেশিনে কাজ করতে চায় না।’

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক আখতারুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের অভিজ্ঞ চিকিৎসক আছে। বর্তমানে চিকিৎসায় যেহেতু যন্ত্রপাতির ব্যবহার বেশি, তাই জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন একজন বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারের। কারণ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বারবার মেশিনগুলো অকেজো হয়ে যায়।’ তিনি জানান, টেকনোলজিস্ট নিয়োগে স্বাস্থ্য দপ্তরকে জানানো হয়েছে। চতুর্থ শ্রেণির জনবলের সংকট স্বীকার করে তিনি বলেন, দুজন ওয়ার্ড বয় দিয়ে হয় না। প্রশিক্ষিত নার্সেরও সংকট আছে।

হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ক্যানসার ওয়ার্ডে বর্তমানে মাত্র ১০ টাকায় কেমোথেরাপি দেওয়া হয়, যা বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালে ২ হাজার টাকা নেওয়া হয়। দুস্থ রোগী, মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পৌষ্যরা বিনা খরচেই চিকিৎসা পান। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আছে আলাদা দুটি শয্যা।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত