সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে দুর্নীতি অনুসন্ধানে দুদক

ডা. রশীদের বিপুল অর্থ পাচারের আশঙ্কা

আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৩:৪০ এএম

আবজাল ‘সিন্ডিকেটের’ অন্যতম সদস্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. আবদুর রশীদ বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন বলে ধারণা করছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান দল। গতকাল বুধবার দ্বিতীয় দফায় জিজ্ঞাসাবাদে তিনি দ্বিতীয় স্ত্রীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কোটি টাকা, ময়মনসিংহে ছয়তলা বাড়ি, রাজধানীর বসুন্ধরায় প্লট ও নাখালপাড়ায় ফ্ল্যাটসহ বিভিন্ন সম্পদের তথ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছে তারা।

ডা. রশীদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মেডিকেল এডুকেশন শাখার পরিচালক ছিলেন। একই শাখার হিসাবরক্ষক আবজাল হোসেন ও তার স্ত্রী রুবিনা খানমের হাজার কোটি টাকার সম্পদের সন্ধান পেয়েছে দুদক। একই সঙ্গে ওই দম্পতির ১৫ স্বজনের নামে-বেনামে বিপুল অর্থ সম্পদেরও সন্ধান মিলেছে। তাদের সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছে দুদক।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে দুর্নীতি ও হাজার কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ অনুসন্ধান দলের প্রধান ও দুদক উপপরিচালক শামসুল আলম জানান, ডা. রশীদকে গত ৩০ জানুয়ারি প্রথম দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ওই দিন তিনি কিছু তথ্য দেন। গতকাল তিনি আয়কর নথিসহ অন্যান্য দলিলপত্র নিয়ে আসেন। তার আয়কর নথিতে স্ত্রীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কোটি টাকা, ময়মনসিংহে ছয়তলা বাড়ি, বসুন্ধরায় প্লট ও নাখালপাড়ায় ফ্ল্যাটসহ বিভিন্ন তথ্য রয়েছে। এর বাইরেও তার নামে-বেনামে কোনো সম্পদ আছে কি না, জানতে বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, ভূমি অফিস, সাবরেজিস্ট্রি অফিস, রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষসহ (রাজউক) বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দেওয়া হবে।

এদিকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গণমাধ্যমকে এড়িয়ে যান ডা. রশীদ। দুদক কর্মকর্তারা জানান, তিনি জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, বিভিন্ন অপারেশন প্ল্যানের (ওপি) আওতায় সব সরকারি মেডিকেল কলেজে বিভিন্ন খাতের উন্নয়নে প্রতি বছর ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল অনেকটা ‘পোস্ট অফিসের’ মতো। রশীদের দাবি, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে টাকা আসে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে সেই টাকা তার কোডে আসে। পোস্ট অফিসে চিঠি এলে যেমন পোস্টমাস্টার সংশ্লিষ্ট প্রাপকের ঠিকানায় পৌঁছে দেন, সেভাবে তিনিও তার কোডে আসা টাকা বিভিন্ন কলেজের অধ্যক্ষের চাহিদার ভিত্তিতে বরাদ্দ দিয়ে থাকেন। ডা. রশীদ আরও বলেন, যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র ক্রয়, প্রশিক্ষণ ও বিদ্যুৎসহ ২০-২৫টি খাতে সংশ্লিষ্ট মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষরা পিপিআর অনুসরণ করে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। সেখানে কী হয় না হয়, তা দেখা তার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না।

আবজালের বিষয়ে ডাক্তার রশীদ বলেন, আবজাল দীর্ঘদিন অধিদপ্তরে কর্মরত। গত দুই বছর ধরে তিনি তার শাখায় নেই। তিনি কীভাবে কেনাকাটার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, সেটা তার জানা নেই।

অনুসন্ধান দলের একজন কর্মকর্তা জানান, ধারণা করা হচ্ছে, ডা. রশীদ অবৈধ আয়ের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দেশে রাখেননি। তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ মানি লন্ডারিং করে থাকতে পারেন। এ বিষয়ে দুদক গোয়েন্দা অনুসন্ধান অব্যাহত রেখেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের মহাব্যবস্থাপককেও চিঠি দেওয়া হবে।

দুদক অনুসন্ধান দলের আরেক কর্মকর্তা জানান, আবজাল সিন্ডিকেটের অন্যতম ‘হোতা’ ছিলেন ডা. রশীদ। আবজাল দুদকে বিশাল সম্পদ বিবরণী দিয়েছেন। এর বাইরেও আবজাল দম্পতির ১৫ স্বজনের নামে অনেক সম্পদ রয়েছে। ওই সব সম্পদের তথ্য চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, তফসিলি ব্যাংক ও বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চিঠি দেওয়া হয়েছে। গত সোমবার দুদক তাদের সম্পদের তথ্য চেয়ে রাজউক; ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, গাজীপুর ও ঢাকার জেলা প্রশাসক এবং জেলাগুলোর সাব-রেজিস্ট্রারকে চিঠি পাঠিয়েছে। পাশাপাশি অনুসন্ধান কর্মকর্তা রাজউক চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে গিয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন।

অনুসন্ধান দলের এক কর্মকর্তা জানান, আবজালের শাশুড়ি রেহানা বেগম তার নামে থাকা একাধিক স্থাবর সম্পত্তি বিক্রির চেষ্টা করছেনÑ এ তথ্য পেয়ে ওইসব সম্পদের কাগজপত্র আইন অনুযায়ী জব্দ করার জন্য সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করা হয়েছে।

সম্পদের তথ্য চাওয়া আবজালের স্বজনেরা হলেন : ছেলে রুলমান আহমেদ রাকিব; দুই মেয়ে আনিকা সুলতানা রূপা ও আদিবা সুলতানা রথি; শ্বশুর জয়নাল তালুকদার ও শাশুড়ি রেহেনা বেগম; তিন শ্যালক রফিকুল ইসলাম, রেজাউল ইসলাম ও শরিফুল ইসলাম; তিন শ্যালকের স্ত্রী রুমানা, রুমা খান ও লিমা আক্তার; দুই ভাই বেলায়েত হোসেন ও লিয়াকত হোসেন; দুই ভাইয়ের স্ত্রী ঝর্না আক্তার ও নাসরিন আক্তার লাকি। তাদের মধ্যে আবজালের দুই ভাই ও তিন শ্যালক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে কর্মরত। ইতিমধ্যে তাদের জিজ্ঞাসাবাদও করেছে দুদক।

দুদক কর্মকর্তারা বলছেন, দুই দফা জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গত ২২ জানুয়ারি দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আবজাল-রুবিনার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ জব্দ করার নির্দেশ দেয় আদালত। এরপরই তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। এ ছাড়া আদালতের নির্দেশ অনুসারে একটি ইংরেজি ও বাংলা দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত