বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৫ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

আমাদের অদূরদর্শী মন অদূরদর্শী জীবন

আপডেট : ০১ মার্চ ২০১৯, ১১:১০ পিএম

বসন্তকালে আষাঢ়ের বৃষ্টি। বৃষ্টি হয়ে গেল গত কয়েক দিন। সকালবেলায় একটুখানি ঠান্ডাও টের পাওয়া যায়। রাতে তো রীতিমতো লেপ গায়ে দিতে হয়। কোনোটাতেই আপত্তি নেই। কারণ এবারে তো তেমন শীত পড়লই না। গতবারও এই সময়ে বৃষ্টি হয়েছিল। এই অসময়ে বৃষ্টি কিসের লক্ষণ? একটা বিষয় খুব সহজ যে, জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তন হচ্ছে। পরিবর্তনটা কি শুধু আমাদের এখানে, নাকি সারা বিশ্বব্যাপী? বিশ্বব্যাপী পরিবর্তনের মুখে আমাদের একটু-আধটু পরিবর্তন হবে এটা মেনে নিয়ে আমরা খুব সুখেই আছি। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের বিশ্লেষণে ভবিষ্যতের যেসব শঙ্কার কথা বলা হচ্ছে, তাতে তো আমাদের রীতিমতো ঘাবড়ে যাওয়ার কথা। যেভাবে বরফ গলছে তাতে বাংলাদেশটা নাকি বঙ্গোপসাগরের নিচে তলিয়ে যাবে।

সেটা যে অসম্ভব নয়, তা টের পেয়েছি যখন সুনামি হলো। জলোচ্ছ্বাস এমন একটি পর্যায়ে চলে এলো যে সে প্রাণ নিয়েই ক্ষান্ত হলো না, বরং উপকূল ধসিয়ে দিয়ে গেল। আমাদের দেশেও গোর্কি দেখেছি, আইলা দেখেছি যার তাণ্ডব আমরা প্রত্যক্ষ করেছি এবং প্রকৃতির শক্তিকে অনুধাবন করতে পেরেছি। আমাদের এই পৃথিবী বহু কোটি বছরের বিবর্তনের ফলাফল। প্রকৃতি বিভিন্নভাবে আমাদের বাঁচবার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। উত্তরবঙ্গের বিশাল এলাকাজুড়ে ছিল চলনবিল, বলা যেতে পারে, এটি বাংলাদেশের একটি বিশাল ফুসফুস। দক্ষিণবঙ্গে আছে সুন্দরবন। দক্ষিণবঙ্গকে নানা প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা থেকে রক্ষা করেছে এবং করে যাচ্ছে সুন্দরবন। বড় ধরনের ঝড়-ঝাপটা-প্লাবন প্রথমে সুন্দরবনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সুন্দরবন ১০ হাজার খাল ও গাছপালা, লতাগুল্ম দিয়ে জলোচ্ছ্বাস এবং বাতাসের তীব্রতাকে দুর্বল করে দেয়। এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম তার পাহাড়, নদী এসব দিয়ে সমুদ্র থেকে আগত ঝড়-ঝঞ্জাকে প্রতিহত করে। এই তিনটি বড় ধরনের প্রাকৃতিক প্রতিরোধব্যবস্থা আমাদের বাংলাদেশকে নিরাপদ রেখেছে হাজার হাজার বছর ধরে।

দেশের মধ্য দিয়ে অসংখ্য নদী-নালা স্বাভাবিক নিয়মে পানির প্রবাহ ও নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এর মধ্যে কিছু পাহাড়, বনানী নানাভাবে প্রাণিজগৎকে রক্ষা করেছে। গারো পাহাড় থেকে মধুপুর, মধুপুর থেকে গাজীপুর, এমনকি ঢাকা পর্যন্ত একটা লাল মাটির ভূপ্রকৃতি বিশেষভাবে এই অঞ্চলকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছে। পঞ্চাশের দশক থেকে ষাটের দশক পর্যন্ত এইসব পাহাড়-বনানীর মধ্যে বাঘ, ভালুক, হরিণ, বানর, সাপ, বন্য শূকর, বনমোরগ দেখা যেত। হঠাৎ করেই বন ও পাহাড় নিধন শুরু হয়। এর মধ্যে এক ধরনের দুর্নীতিপরায়ণ বন রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যুক্ত হয়। কিছু ব্যবসায়ী, লুটেরাদের সীমাহীন লোভের স্বীকার হয় আমাদের প্রকৃতি। সুন্দরবনের মৎস্য সম্পদ লুট হতে থাকে, সেই সঙ্গে লুট হয়ে যায় সুন্দরবনের সোনার হরিণ, বাঘ এবং অন্যান্য দুর্লভ প্রাণী।

গত পঞ্চাশ বছরে নদীও আক্রান্ত হতে থাকে। নদীর পাশাপাশি নানা ধরনের স্থাপনা ও কলকারখানার বর্জ্য নদীর ধারাকে শুধু ব্যাহত করছে না, নদীর পানিকে দূষিত করে তুলছে মারাত্মকভাবে। আজকে নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদীর পানি যেমন দু®প্রাপ্য হয়ে উঠছে তেমনি বহু জায়গায় চর জাগছে। একদা আমাদের দেশের একমাত্র পরিবহনব্যবস্থা ও যাতায়াতের উপায় ছিল নদীপথ; তা এখন একেবারে পাল্টে গিয়েছে। তার স্থলে এসেছে মোটরগাড়ি। এ এক গভীর সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত। তেল-মবিলের দূষিত বাষ্পে মরে যাচ্ছে প্রাণিকুল, বিষাক্ত হয়ে উঠছে আমাদের বায়ুমণ্ডল। প্রাণিজগৎকে হত্যা করছে প্রতিনিয়ত। এ থেকে মুক্তির উপায় ছিল ইলেকট্রিক ট্রেন ব্যবস্থা। যা যেকোনো দেশের এখন প্রধান যানবাহন। সেই রেলপথ একটুও বাড়েনি। অবশ্য সম্প্রতি বর্তমান সরকার রেলের দিকে নজর দিয়েছে। কিন্তু ডিজেলচালিত রেল যদি থাকে, তাহলে কোনো লাভ হবে না। বৈদ্যুতিক ট্রেন চালাতে হবে এবং সর্বক্ষেত্রে আমদানীকৃত জ্বালানি তেলের ব্যবহারটা কমাতে হবে। গ্যাসের ব্যবহারটা হঠাৎ করে এমন সর্বব্যাপী হয়ে গেল যে অদূর ভবিষ্যতেই দেখা যাবে গ্যাস ফুরিয়ে যাচ্ছে। ঘরে ঘরে অঢেল গ্যাস, গাড়িতে গ্যাস, কলকারখানায় গ্যাস। গ্যাসের এমন অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে আমাদের সীমাবদ্ধ গ্যাসকে সাশ্রয়ীভাবে ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তোলা গেল না।

প্রকৃতি বাংলাদেশকে প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ দিয়েছিল। কিন্তু তার অপব্যবহার ক্রমে ক্রমে আমাদের নিঃস্ব করে দিচ্ছে। সেলফোনের টাওয়ার এখন সর্বত্র। কোথাও শূন্য দিগন্ত দেখা যায় না। প্রতিটি টেলিফোন কোম্পানি ও বেতারব্যবস্থায় আলাদা আলাদা টাওয়ার নির্মাণ করে পাখির জীবনকে অস্থির করে তুলছে। পাখপাখালি, ফল-ফলালির ওপর ইতিমধ্যেই বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করছে। ফলের আকার বিকৃত হয়ে যাচ্ছে, ফল বিস্বাদ হয়ে যাচ্ছে। অদৃশ্য এই শক্তিশালী নেটওয়ার্কের বিকিরণ মানুষ, প্রাণিজগৎ, উদ্ভিদ ও বৃক্ষকে নানাভাবে আক্রমণ করছে। প্রাণিজগতে এখন নতুন নতুন রোগের আগমন ঘটছে। আজ থেকে ৪০ বছর আগেও বুড়িগঙ্গায় সাঁতার কাটা যেত। কিন্তু এখন কলকারখানার বর্জ্যে নদীর পানি ঘন কালো হয়ে যাচ্ছে। তবে আশার কথা, বর্তমানে সেখানে সফল উচ্ছেদ চলছে। অবশ্য মানুষকে সচেতন করা না গেলে সরকার একাকী উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে এসব সমস্যার সমাধান করতে পারবে না।

বড় শহরগুলিতে যে পরিমাণ বিষাক্ত বাষ্পের উৎপাদন হচ্ছে তাতে বায়ুমণ্ডলে দূষণের মেঘ জমছে প্রতিনিয়ত। সিসার কারণে ঢাকা শহরে বুক ভরে নিশ্বাস নেওয়া কঠিন। বাস্তব অবস্থার একেবারেই খণ্ড খণ্ড চিত্র এসব। তাতেই জনজীবন এক দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে উপনীত। দিল্লি বা বেইজিং শহরে এখন মানুষকে অক্সিজেনের মুখোশ নিয়ে চলাফেরা করতে হচ্ছে। যদিও বড় বড় শহরে কয়েক মাস অন্তর গাড়ি থেকে কতটা দূষণ হচ্ছে তার সার্টিফিকেট নিতে হয়। দূষণের মাত্রা অতিক্রম করলে জরিমানার ব্যবস্থা আছে। আমাদের দেশে এখনো এই ব্যবস্থা চালু হয়নি। আরও আছে শব্দদূষণ। যত্রতত্র মাইকের ব্যবহার আমাদের শ্রবণযন্ত্রকে দুর্বল করে মস্তিষ্কে আঘাত হানছে। শব্দদূষণ বন্ধ করার কোনো আইনি ব্যবস্থা আছে বলে মনে হয় না। হাইড্রোলিক হর্নের ব্যবহার বন্ধ করা হলেও চালকদের নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। মনে হয় হর্ন ছাড়া গাড়ি থাকলেই বোধ হয় আমাদের কর্ণকুহুর কিছুটা শান্তি পেত। কোলাহলপ্রিয় বাঙালি উচ্চ শব্দ মনে হয় খুবই পছন্দ করে!

কৃষিজাত খাদ্যসামগ্রী ও ফলমূলও রাসায়নিক সার, কীটনাশক ইত্যাদির মধ্যে পড়েছে। উচ্চফলনশীলতার নামে আমাদের খাদ্য একধরনের বিষে পরিণত হচ্ছে। যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন প্রকার ভোজ্য তেল। আজকাল নানাবিধ নতুন-পুরনো অসুখের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে আমাদের খাদ্য ও ভোজ্য তেল। সবটা মিলিয়ে এক অনিশ্চিত যাত্রাপথে গিয়ে পড়েছে আমাদের জীবন। একটা বড় ধরনের সমস্যা হচ্ছে আমাদের অদূরদর্শী মন। আমরা মনে করি কলকারখানা স্থাপন, বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র বা বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি ব্যবহারের প্রতিক্রিয়ায় হলে হতেও পারে, কিন্তু সে তো অনেক পরের ব্যাপার। ততদিন আমি হয়তো বাঁচব না। পৃথিবীটা যে কেবল আমার বাঁচার জন্য নয়, আমার ভবিষ্যৎ বংশধরদেরও যে বাঁচা-মরার বিষয় নির্ভর করছে, তা আমরা চিন্তা করি না। আমরা শুধু ব্যস্ত থাকি আজ নিয়ে। আগামীকাল, পরশু তারপরের দিনগুলোকে নিয়ে ভাবতে চাই না। যদি ভাবতে পারতাম তাহলে নিমতলীর ঘটনার পুনরাবৃত্তি চকবাজারে হতো না। তাজরীনের মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি রানা প্লাজায় হতো না। অতিরিক্ত লোভ অদূরদর্শী জীবনভাবনা এবং সংস্কৃতি-বিচ্ছিন্নতার ফলাফলের জন্য সুদূরের পানে তাকিয়ে থাকার প্রয়োজন নেই। তা অদূরেই ঘটতে যাচ্ছে এবং তার সূচনা হয়ে গেছে। সহস্র বছরের ঋতু পরিক্রমায় অঘটন ঘটতে শুরু করেছে। আমাদের চমৎকার প্রকৃতি ছিল, পরিবেশ ছিল এবং ছিল অত্যন্ত আনন্দদায়ক সমাজ। এসবই আমরা কালক্রমে ভেঙে ফেলেছি। আমরা কি শুধু একবার অতীতের দিকে তাকাব? অতীতের সবটা যে ভালো ছিল তাও নয়। তবে আমরা তো অতীতের ভালোটার দিকেও তাকাতে পারি।

লেখক

নাট্যকার, অভিনেতা ও কলামনিস্ট

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত