বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৫ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে হবে

আপডেট : ০১ মার্চ ২০১৯, ১১:১৮ পিএম

সরকারি হিসাবেই সবচেয়ে কম ভোটারের অংশগ্রহণে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) উপনির্বাচন হয়ে গেল। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী মো. আতিকুল ইসলাম এক বছরের জন্য ঢাকা উত্তরের নতুন মেয়র নির্বাচিত হলেন। পাশাপাশি ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণের ১৮টি করে মোট ৩৬টি নতুন ওয়ার্ডে কাউন্সিলর নির্বাচিত হলেন এবং ঢাকা উত্তরের একটি ওয়ার্ডের উপনির্বাচনে নতুন কাউন্সিলরও নির্বাচিত হলেন। ভোটারের কম উপস্থিতি নিয়ে প্রার্থীসহ অনেকের হতাশা দেখা গেলেও কোনোরকম অঘটন ছাড়াই নির্বাচন শেষ হয়েছে। ক্ষমতাসীন রাজনীতিকদের বক্তব্য থেকেও এটা স্পষ্ট যে তারা নিজেরাও একে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা হিসেবেই দেখছেন।  এখন চিন্তা সামনে এগুনো নিয়ে আর প্রশ্ন রাজধানী ঢাকা মহানগরী এবং অন্যান্য সিটি করপোরেশন, পৌরসভাসহ অপরাপর স্থানীয় সরকারগুলোকে শক্তিশালী করার বিষয়ে কি কোনো অগ্রগতি হবে?

এবারের সিটি করপোরেশন নির্বাচন নতুন করে পুরনো যে প্রশ্নটি সামনে নিয়ে এসেছে সেটি হলোÑ স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় মনোনয়ন ও দলীয় প্রতীকে হওয়া না হওয়ার লাভ-ক্ষতির বিবেচনা। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অনেক নেতাদেরও বলতে শোনা গেছে, বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণ থাকলে নির্বাচন এতটা নিরুত্তাপ ও ভোটারশূন্য হতো না। আবার ক্ষমতার বাইরে থাকা দলগুলোর অনেকে বলছেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একচেটিয়া ভোটের অভিজ্ঞতার কারণেই ভোটাররা ঢাকার সিটি নির্বাচনের বিষয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। দুই পক্ষের বক্তব্য থেকেই এটা স্পষ্ট যে, জাতীয় রাজনীতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে এই সিটি নির্বাচনে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই এই নির্বাচন হওয়ায় সেটা হতেই পারে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আদর্শ বলে ধরে নেওয়া হলেও আমাদের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা বলছে, এতে করে স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচন প্রায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন হয়ে পড়ছে। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ভাবনার সুযোগ আছে। 

পৃথিবীর অনেক গণতান্ত্রিক দেশেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন রাজনৈতিক দলগুলোর সরাসরি অংশগ্রহণেই হয়ে থাকে এবং সেখানে শক্তিশালী স্থানীয় সরকারও রয়েছে। আমাদের দেশের ক্ষেত্রে এই সমস্যার মূল কারণ সম্ভবত কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক কার্যক্রমে গণতান্ত্রিক চর্চা না থাকা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মাঠের রাজনীতির দুর্বলতা।  রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার গুরুত্ব অনুধাবন করতে হবে, কেননা এটা জনগণের কাছে তাদের সরাসরি জবাবদিহিতার ক্ষেত্রকে প্রসারিত করবে। এ জন্য সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার জন্য আমাদের এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। নইলে প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ আর রাজনৈতিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ না থাকার সুযোগে রাজনীতি-আমলাতন্ত্রের চক্করে আটকা থেকে স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহিতা আদায়ের সুযোগ জনগণ কখনোই পাবে না।

রাজধানী ঢাকার মতো একটা মেগাসিটিতে এখনো নগর সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত না হওয়াকে আমাদের শাসনব্যবস্থার পশ্চাৎপদতার উদাহরণ হিসেবেই চিহ্নিত করা যেতে পারে। ঢাকা উত্তরের নবনির্বাচিত মেয়র এবং ঢাকা দক্ষিণের মেয়রসহ সব কাউন্সিলর নাগরিক সেবার মনোবৃত্তি নিয়ে কাজ করার বিষয়ে নিষ্ঠাবান হলেই জনগণ তাদের ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখতে পারবে।  অর্থাৎ বর্তমান কাঠামোর মধ্যে থেকে যতটুকু নাগরিক পরিষেবা নিশ্চিত করার সুযোগ তাদের আছে, তার সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত না করতে পারলে সিটি করপোরেশনের কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়েও কোনো অগ্রগতি হবে না।  এই সহজ সত্যটা অনুধাবন না করতে পারলে নগর সরকারের তো দূরের কথা, স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়নে পথে যাত্রাটা এগোবে না। সিটি করপোরেশন কিংবা পৌরসভাগুলোকে ঢাল-তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দার হয়েই থাকতে হবে। কিন্তু তা নাগরিক কিংবা স্থানীয় রাজনীতিক কারও জন্যই মঙ্গলজনক নয়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত