সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪, ৩০ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

মানুষের পাশে ইভ

আপডেট : ০২ মার্চ ২০১৯, ০১:৫৮ এএম

বিদেশে না থেকে দেশে ফিরে গরিব অসহায়ের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ‘আমাল ফাউন্ডেশন’ গড়ে স্কুল, সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, কমিউনিটি ক্লিনিক করেছেন, ৪০০ স্বেচ্ছাসেবকের দলের নেতা ইশরাত করিম ইভ। লিখেছেন আসিফ আল আজাদ। ছবি তুলেছেন নূর  

ছোটবেলায় খুব লাজুক ছিলেন, মফস্বলের মেয়েরা যেমন হয়। ইশরাত করিম ইভ বড় হয়েছেন বগুড়া শহরে। বাবা ইসকান্দার করিম ও মা হাবিবা জেসমিন তাদের আদরের মেয়েটিকে চোখে চোখে রেখে বড় করেছেন। ছোটবেলা থেকে মানুষকে সাহায্য করার অন্যরকম বৈশিষ্ট্য তার মধ্যে জন্ম নিয়েছে। যে কারও পাশে দাঁড়াতেন। বগুড়া ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী থাকার সময় একদিনের স্মৃতি ভাসে। এক লোক তাদের বাসায় ভিক্ষা নিতে এলে ভিক্ষা দেওয়ার পর কথা বলে এত খারাপ লাগল, ডাইনিং রুমে এসে খেতে বসালেন। মা মেয়ের কা- দেখে হতবাক। এইচএসসি পাস করে ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হলেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে। ফিনান্সের ছাত্রী ছিলেন। মেধাবী মেয়েটি এসেছেন বিজ্ঞান বিভাগ থেকে, ‘ডি’ ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধা তালিকায় ৪০তম হয়েছেন। আবাসিক ছাত্রী হিসেবে বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলে সিট পেলেন। সেই থেকে তার একা, নিজে নিজে সব করার জীবন শুরু হলো। বিশ^বিদ্যালয়ের বিশাল পরিবেশে নিজেকে আরও ছড়িয়ে দিলেন। অনেকের সঙ্গে পরিচয় হলো, দ্বিতীয় বর্ষ থেকে স্বেছাসেবী সংগঠনে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করা শুরু করলেন। জাতিসংঘ ও ইউনিসেফের প্রকল্পে কাজ করলেন। মাঠপর্যায়ে গবেষণা করতে দেশের প্রত্যন্ত জেলাতেও গিয়েছেন। দেখেছেন, এদেশের মানুষ হতদরিদ্র, জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলোই পূরণ করতে হিমশিম খান। সেই থেকে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছেটি জেগে উঠল ভেতরে। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণির সিজিপিএ নিয়ে বিবিএ ও এমবিএ পাস করলেন। অসাধারণ মেধাবী এই ছাত্রীটি ২০১৪ সালে বৃত্তি নিয়ে চলে গেলেন যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে। সেখানে ‘সোশ্যাল বিজনেস’ বা ‘সামাজিক ব্যবসা’ নিয়ে মাস্টার্স করেছেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি অবসরে এক বছর পার্টটাইম চাকরি করেছেন বিশ^খ্যাত দাতব্য সংস্থা ‘বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন’-এ। এরপর থেকে এমন সংগঠন প্রতিষ্ঠার ইচ্ছে ভেতরে জেগে উঠল। বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক জর্জও প্রিয় ছাত্রীটিকে উৎসাহ দিয়ে বলেছেন, ‘তোমার মতো মেধাবী নিজের সমাজের জন্য কাজ করলে ভালো হয়।’ ফলে ২০১৫ সালে এক বছরের মাস্টার্স করে বাংলাদেশে চলে এলেন ইভ। উন্নত জীবন ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন ছেড়ে দেশে ফেরত আসাটি ভালো লাগেনি মা-বাবার। তারপরও দেশের প্রতি ভালোবাসা অস্বীকার করতে পারেননি তিনি। কেন ফিরে এলে? কেন ব্যাংক বা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ না করে সমাজ বদলের জন্য নামলে? এই প্রশ্নটি আজও তাকে অনেকে করেন। তখন ইভ জীবনের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার কথা বলেন, ‘২০১০ সাল, তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী; বন্ধুদের সঙ্গে অলস বিকেলে বসে আছি টিএসসিতে। এক ছোট্ট ফুল শিশু ফুল কেনার জন্য জোরাজুরি করছে দেখে এক লোক লাথি মারলেন। তারা যে মানুষই নয়, সমাজ সেই সত্যটি তাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। এই মানুষগুলোর ভাগ্য বদলাতে দেশে এসেছি, কাজ করছি।’

দেশে ফিরলেন তিনি ‘আমাল’ নামের একটি স্বপ্ন ও প্রতিষ্ঠান তৈরি করার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে। ‘আমাল’ আরবি শব্দ, মানে ‘আশা’। ২০১৫ সালের ১৭ জুন জন্ম নিল ‘আমাল ফাউন্ডেশন’। শুরু থেকে আজও সংগঠনটি প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জ ও শহরের গরিব, অসহায়কে শারীরিক-মানসিক স্বাস্থ্য, শিক্ষাগত উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, দুর্যোগে-দুর্ভোগে পাশে থাকেন। ২০১৫ সালে ঢাকার বস্তির শিশুদের তারা বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দিলেন। কিশোরী-তরুণীদের শেখালেন, মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার গুরুত্ব, তাদের যৌন নিপীড়ন থেকে বাঁচার জন্য যৌন হয়রানি প্রতিরোধে সামাজিক-মানসিক কাউন্সিলিং করানো হলো। ২০১৭ সালের বন্যায় বগুড়ার যমুনার তীরে সারিয়াকান্দি উপজেলার প্রত্যন্ত শনপচা চরে ত্রাণ বিতরণ করতে গেলেন। তখন ১২ কি ১৩ বছরের একটি মেয়েকে পেলেন। এই বয়সেই বিয়ে হয়েছে, যৌতুকের টাকা দিতে না পারায় বাপের বাড়িতে ফিরেছে। চরে বাল্যবিবাহের হার খুব বেশি। স্বামীর ঘর করতে না পারা মেয়েরা বাড়িতে কটু কথা, গালমন্দ শোনে। সেই মেয়ের মা করুণ জীবন বলতে বলতে আঁচলে চোখ মুছলেন। জানালেন, তার মেয়ের পড়ালেখার খুব স্বপ্ন ছিল। পরের বছরের শনপচা চরে শুরু হলো ‘আমাল ফাউন্ডেশন রওশন আরা স্কিল সেন্টার।’ এই উদ্যোগে কলোরাডো প্রবাসী বাঙালি নোমান খুব সাহায্য করেছেন। তার মায়ের নামেই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি। প্রথম দফায় ২০ জন গরিব নারীকে বিনা খরচে দুই মাসের হাতের কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো। প্রশিক্ষণ শেষে ১৫ জন সেলাই মেশিন পেলেন। আগে যারা স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে জীবন চালাতেন, তারা এখন মাসে দুই থেকে তিন হাজার টাকা রোজগার করেন। তাদের পারিবারিক ও সামাজিক সম্মান বাড়ছে। আলো না আসা এই চরের মেয়েদের স্বাবলম্বী করে তোলার মাধ্যমে বাল্যবিবাহ রোধ ও যৌতুকের অভিশাপকে চিরতরে মুছে দিতে চায় আমাল। আস্তে আস্তে সারা দেশে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রকে ছড়িয়ে দেবেন ইভ। কেন্দ্র থেকে আরও উদ্যোগ নেবেন। আমাল ফাউন্ডেশন জাতীয় সংকটে দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ায়। ২০১৭ সালের নভেম্বরে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে তারা ত্রাণ বিলিয়েছেন। তাদের আরেক উদ্যোগ, ‘আদর্শ গ্রাম’। টেকনাফের হাকিমপাড়াতে ১৯০টি বাড়ি তারা তৈরি করে দিয়েছেন। ঢাকা, সিরাজগঞ্জসহ সাত-আট জেলার গ্রামের মানুষকে দিয়েছেন শস্যবীজ, সোলার বাতি। ফ্রি স্বাস্থ্য সেবা ও ওষুধ দিয়েছেন অনেক জায়গায়। এ বছর যশোর সদরের পুলেরহাট ইউনিয়নের বেনাপোল রোডে আভা লিমিটেডের সঙ্গে যৌথভাবে তারা ‘ডাক্তারবাড়ি’ স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্প চালু করেছেন। তাতে স্বল্প খরচে মানুষের চিকিৎসা দেওয়া হয়। বিভিন্ন দুর্যোগে তারা জরুরি সেবা দেন।

শনপচা চরে তাদের স্কুল আছে। যার জন্ম ২০১৮ সালের ১৬ মার্চ। নাম ‘উচ্ছ্বাস স্কুল’। এটিই শনপচার একমাত্র স্কুল। আইপিডিসি ফিন্যান্স লিমিটেড ও আমাল ফাউন্ডেশন স্কুলটি বানিয়েছে। স্কুলে ছাত্রছাত্রীরা বিনা পয়সায় বই, খাতা, কলম পায়। বাল্যবিবাহ রোধ কেন করতে হবে, যৌতুক কেন খারাপ, কীভাবে স্বাস্থ্য ভালো রাখতে হবে শেখে। এখন নার্সারি ক্লাস চলছে। ওরাই স্কুলকে ফাইভ পর্যন্ত টেনে নেবে। ‘থ্রাইভ গ্লোবাল’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা প্রতিদিন তাদের পুষ্টিকর খাবার দেয়, সময় মতো স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে। ছাত্রছাত্রী এখন ৫০। যে শিশুরা জমিতে কাজ করলে বা মাছ ধরলে রোজগার করতে পারত, তারা বন্ধুদের লোভে, নতুন কিছু শেখার জন্য প্রতিদিন সকাল ৭টায় আসছে। অথচ তাদের ক্লাস ৯টায়। স্কুলের শিক্ষক দুজন। এই একুশে ফেব্রুয়ারি তারা মাটির শহীদ মিনার বানিয়েছে, নিজেরাই ফুল কুড়িয়ে দিয়েছে। ফলে মা-বাবারা তাদের মানুষ করতে চাইছেন। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে তারা চরের একমাত্র কমিউনিটি স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্র চালু করেছেন। সপ্তাহে দুবার বাইরে থেকে ডাক্তার এসে বসেন। রোগীদের ফ্রি ওষুধ দেন। নারীদের নিজের ও পরিবারের স্বাস্থ্য বিষয়ে জানাতে একজন নারী প্রশিক্ষক আছেন।

বগুড়া, চাঁদপুর, সিরাজগঞ্জ, ময়মনসিংহ, সিলেট, টেকনাফের প্রত্যন্ত গ্রাম ও চরে আমাল ফাউন্ডেশন ২০১৮ সাল থেকে বিশুদ্ধ পানীয়ের জন্য গভীর নলকূপ বসিয়ে দিচ্ছে। প্রথম পর্যায়ে ৪০টি গভীর নলকূপ বসানো হয়েছে। তবে এত এত কাজ করতে গিয়ে নানা অভিজ্ঞতাও ইভের হচ্ছে। অনেকে এনজিও মনে করে ঋণ নিতে চান। সমাজের খারাপ লোকেরা কাজ করতে গেলে টাকা চেয়ে বসেন। নারী হিসেবে তাকে বাঁকা চোখে দেখেন, কথা শোনাতে ভুল করেন না। সরকারি কোনো সাহায্য চাইলে সেটি পাস হয়ে আসতে অনেক সময় লাগে। তারপরও নারীর ক্ষমতায়নের জন্য লড়ে যাচ্ছেন তিনি।

২০১৮ সালে এই ফাউন্ডেশন থেকে তারা ‘আজরা’ নামের একটি নারী ব্র্যান্ড চালু করেছেন। তাতে শনপচার নারীদের তৈরি মুখে মাখার সাবান, গ্রামের শাড়ি, গহনা সারা বিশ্ব অনলাইনে বিক্রি করা হয়। নিজের ও প্রতিষ্ঠানের এই কাজগুলোর সুবাদে ইভ ‘ইয়ুথ আইকন ২০১৮’, ‘ওয়াইএসএসই সোশ্যাল ইমপ্যাক্ট অ্যাওয়ার্ড ২০১৮’, ‘জিটিএ গ্লোবাল অ্যাওয়ার্ড ২০১৬’, ‘জেকোনো ক্যাটালিস্ট ফেলোশিপ’ পেয়েছেন।

আমালের ঢাকা অফিসে আছেন ৭ জন। সারা দেশে মোট ২০ জন। সারা দেশে তালিকাভুক্ত স্বেচ্ছাসেবক আছেন মোট ৪শ। সরকারি-বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর, সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা আমাদের শুভাকাক্সক্ষী, সহযোগী।

এত কাজ কীভাবে করেন এই প্রশ্নের জবাবে ইভ আরেকটি গল্প করলেন, ‘আমাদের উচ্ছ্বাস স্কুলে রেহানা নামের একটি পাঁচ কি ছয় বছরের ছাত্রী আছে। ভর্তি হওয়ার পর কিছুদিন সে অনুপস্থিত ছিল। পরে জানলাম, তখন সে তাদের বাড়িতে কাজ করত। তখন ওর মা মানুষের বাড়িতে কাজ করতেন। পরে মাকে সেলাই প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো। তিনি সেলাই মেশিন পেয়েছেন। রেহানা এখন স্কুলে পড়ছে। এসব মানুষের জীবনের গল্পই আমার প্রেরণা।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত