শুক্রবার, ১৪ জুন ২০২৪, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

সামিহার স্বপ্ন শিক্ষা উদ্যোগ

আপডেট : ০২ মার্চ ২০১৯, ০২:০১ এএম

অনেক গুণের মেয়েটি। কার্টুন এঁকে পুরস্কার জিতেছেন, স্কাউটিং করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। শিক্ষা উদ্যোক্তার ধারণার জন্ম দিয়েছেন। সামিহা আকবরের গল্প বলেছেন রানা মিত্র। ছবি তুলেছেন নূর

তিনি সামিহা আকবর। খুব ছেলেবেলা থেকে কার্টুন আঁকেন। এই প্রসঙ্গে একটি গল্প, ২০০৭ সালে আইসিসির ক্রিকেট বিশ^কাপে আমাদের দেশ দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে সুপার এইটে উঠে গেল। সামিহাও খুশিতে একটি কার্টুন এঁকে ফেললেন। সেটি ফেইসবুকে সাড়া ফেললো। কীভাবে কার্টুন করা শিখলেন? সামিহা বললেন, “নিয়মিতভাবে একটি পত্রিকা ‘বেসিক আলী’ কার্টুন সিরিজের জন্যই পড়ি। এই কার্টুনের প্রতি ভালোবাসা ও আঁকতে আঁকতে কার্টুন শেখা শুরু হলো। কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে কার্টুন করেছি, নিরাপদ সড়কের দাবিতেও কার্টুন করেছি। সবগুলো কার্টুনই ফেইসবুকে আপলোড করেছি। সাড়াও পেয়েছি অনেক। তারও আগে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ স্কুল অ্যান্ড কলেজের ক্লাস সেভেনের ছাত্রী থাকার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে ফিভার ক্যাসেলের ‘যেমনটি চাই আমার স্বপ্নের বাংলাদেশ’ প্রতিযোগিতায় কার্টুন প্রদর্শনী করে বিশেষ পুরস্কার পেয়েছি। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর যোগাযোগ করলাম ‘উন্মাদ’ সম্পাদক ও বিখ্যাত কার্টুনিস্ট আহসান হাবীবের সঙ্গে। তারিখটি এখনো আমার মেইলে আছে, ১১ মার্চ, ২০১৭। সে বছর খাদ্যে ভেজালবিরোধী যে কার্টুন প্রদর্শনীর আয়োজন করছিলেন তারা, সেখানে আমি ছিলাম। ঢাকার দৃক গ্যালারিতে হওয়া এই আয়োজনে আমার কার্টুন প্রশংসিত হয়েছে। পরের বছর আমাদের কলেজ ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞানমেলায় বিজ্ঞান বিষয়ের কার্টুন এঁকে পুরস্কার পেয়েছি।”

লেখাপড়ার পাশাপাশি আরও নানা কাজে নিজেকে ছড়িয়ে দিতে তাকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন তাদের স্কুলের নাজমুল হোসাইন স্যার। বলেছিলেন, লেখাপড়া ও পাঠ্যবইয়ের কার্যক্রম একসঙ্গে চালিয়ে যেতে হবে। তাহলে আরও অভিজ্ঞতা তৈরি হবে। সময় ভাগ করে কাজ করার কৌশলও শিখিয়ে দিলেন। ফলে জীবনটাকে আরও রাঙাতে লাগলেন সামিহা। 

 সামিহা বাংলাদেশ স্কাউটসের সদস্য। শুরু দ্বিতীয় শ্রেণিতে। ২০০৩ সালের ঘটনা। সেই থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত গার্লস গাইডের সদস্য ছিলেন তিনি। গার্লস গাইডের একটি আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে একবার কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন তিনি। মন ছোঁয়া সেই কবিতা বিদেশি অংশগ্রহণকারীদের এতই ভালো লেগেছিল যে আফ্রিকা মহাদেশ থেকে আসা এক নারী স্কাউটস অনুষ্ঠান শেষে তাকে হাতির দাঁতের একটি শো-পিস উপহার দিয়েছিলেন। তবে সেটি সঙ্গে সঙ্গে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। বলেছিলেন, ‘পশুদের বিনা কারণে হত্যা করা মহাপাপ। আমার ভালো লাগে না।’ তবে তিনি তাকে জানালেন, এটি মৃত হাতির দাঁত। ফলে তিনি হাতির সেই শো-পিসটি নিলেন এবং অনুষ্ঠানে উপস্থিত বাকিদের কাছ থেকে এই মনোভাবের জন্য প্রশংসা লাভ করলেন।

অন্যান্য কাজের পাশাপাশি লেখাপড়াতেও ভালো করেছেন সামিহা। বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে তিনি ২০০৬ সালে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা দিয়েছিলেন। সেবার ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছিলেন। অষ্টম শ্রেণিতে সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি পেয়ে আবার তিনি মেধার স্বাক্ষর রাখলেন। ২০১২ সালে এসএসসি পরীক্ষায় ‘গোল্ডেন জিপিএ’ নিয়ে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পাস করলেন। দুই বছর পর ঢাকার হলিক্রস স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় তিনি একই বিভাগ থেকে আবারও গোল্ডেন জিপিএ পেয়ে পাস করলেন। কীভাবে সময়কে ভাগ করে নিয়েছিলেন এই প্রশ্নের জবাবে সামিহা আকবর বললেন, ‘একেবারে ছোটবেলা থেকে এখনো আমি ভোরে ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়ি। এরপর দিনের কাজ শুরু করি। প্রথমেই টানা লেখাপড়া করি, তারপর দিনের ক্লাস করতে যাই।’

তবে লেখাপড়া বা সহশিক্ষা কার্যক্রমে মেতে থাকেননি তিনি। নিজেকে বৈষম্যের বিরুদ্ধেও ছড়িয়ে দিয়েছেন। স্কুলে পড়ার সময় খেয়াল করলেন, বড়লোকের সন্তানরা গরিবের সন্তানদের নিয়ে উপহাস করে। তাদের ভালো চোখে দেখে না। এই কাজগুলো ভালো লাগেনি সামিহার। ফলে নাইনের এই ছাত্রীটি ১৫০ জন ছাত্রছাত্রীর এই মনোভাব ও কাজের বিরুদ্ধে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করলেন। স্কুলে প্রতিবাদ উঠল, এমন মনোভাবও কমতে লাগল।

লেখালেখিতেও নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির স্কুল ম্যাগাজিনে লিখেছেন। কলেজ ম্যাগাজিনেও লেখা নিয়মিতভাবে ছাপা হয়েছে। তাছাড়াও ‘জ্যোতি’ নামের একটি ম্যাগাজিনে তার সায়েন্স ফিকশন ও রম্য রচনা ছাপা হয়েছে। এত এত কাজের সুবাদে স্কুলবেলা থেকেই তিনি নানাভাবে নিজেকে ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন।

২০১০ সালে নেপালে ‘ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন অব স্টুডেন্টস টোটাল কোয়ালিটি সার্কেল’ নামে একটি কনভেনশনের আয়োজন করা হয়েছিল। তাতে তাদের স্কুলের মোট ৩০ জন ছাত্রছাত্রী আমন্ত্রিত হিসেবে অংশ নিয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনিও ছিলেন। মানুষে মানুষে ভেদাভেদের কাজটি নিয়ে বিদেশে গেলেন তিনি। নিজেদের কর্ম উদ্যোগের কথাগুলো বলার পর পুরো হল ভর্তি সবার ভালোবাসা কুড়ালেন তারা। এইচএসসির পরে আহসান উল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের একটি স্টুডেন্টস সার্কেলে জড়িয়ে গেলেন তিনি। সেখানে আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় রানারআপ হয়েছিলেন। এই শিল্পে তার শুরু স্কুলে। ২০০৭ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত স্কুলের যে কোনো অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করেছেন। হাজারীবাগ থানার স্কুল পর্যায়ের আবৃত্তিতে টানা চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। ঢাকা জেলা পর্যায়ে একবার দ্বিতীয় হয়েছেন।

এত এত কাজ করলেন কীভাবে? সামিহা বললেন, ‘স্কুলে আমরা সহশিক্ষা কাজের জন্য কোনো সময় পাইনি। একটি ক্লাসের পর আরেকটি ক্লাসের অবসরে যে কয়েক মিনিট মাত্র সময় পেতাম বা টিফিনের ফাঁকে সময় পেলে আমরা বন্ধুদের নিয়ে নিজেদের নানা স্বপ্নগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি। পরে স্কুল শেষে বা শুরুতে কাজগুলো করে নিজেদের সমৃদ্ধ করেছি।’ তবে স্কুলে তিনি কিছু করতে না পারার বেদনা ভুলে গেলেন কলেজে উঠে।

হলিক্রস তাকে পাল্টে দিলো। ব্যবহারিক ক্লাসের গুরুত্ব শেখাল, সময়কে ব্যবহার করতে শেখাল। তিনি এই কলেজের আবৃত্তি ক্লাবের নিয়মিত সদস্য ছিলেন। কলেজের ডেকোরেশন ক্লাবেরও সদস্য ছিলেন। এই ক্লাব প্রতিটি প্রোগ্রামের মঞ্চ সাজিয়েছে। অঁাঁকতেন বলে এসব কাজে দারুণ ভালো করেছেন তিনি। তার আইডিয়াতেই মঞ্চগুলো সাজানো হতো।

এখনো মনে আছে, সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার নামে তাদের একটি ক্লাবের প্রোগ্রামে এই কলেজের একজন ছাত্রী একটি প্রদীপ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বলে আইডিয়া দিয়েছিলেন। তার পায়ের নিচের মেঝের ওপর লেখা ছিল ‘দ্বাদশ শ্রেণি’। একটি পা তার ভেতরে আরেকটি পা বাইরে। বাইরে থেকে আলো আসছে। লেখা আছে কবিগুরুর বাক্য ‘আকাশ আমার ভরল আলোয়, আকাশ আমি ভরব গানে।’ কেন এই কথা? সামিহা বললেন, ‘এইচএসসি পাস করে তারা দেশের ও নিজের জীবনে আলো আনবে বলে এই কথাগুলো বলেছিলাম আমি।’ জীবনের স্মরণীয় স্মৃতি? “২০১৪ সালে হলিক্রসে একটি বিজ্ঞানমেলা হয়। সেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় সংসদের মাননীয় স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। তার জন্য একটি মানপত্র তৈরি করতে হবে। আমি তার দায়িত্ব নিলাম। পরে মানপত্র লিখে চারদিকে ডেকোরেশন করে জমা দিলাম। আমার মানপত্রটি খুব ভালো লেগে গেল সবার। পরে আমার লেখা মানপত্রটি দেওয়া হয় স্পিকারকে। সেখানে উল্লেখযোগ্য অংশ ছিলÑ ‘শিরীন শারমিন এক সময় হলিক্রসের ছাত্রী ছিলেন, ছাত্রী হয়ে আসতেন, এখন আসবেন প্রধান অতিথি হয়ে, দেশের স্পিকার হয়ে। তাঁর পথচলা হয়তো আরও ১০ জন হলিক্রসের শিক্ষার্থীকে বিজ্ঞানী, বৈমানিক, স্পিকার হতে অনুপ্রাণিত করবে।’ তিনি ‘তেরেজা হোম’ নামের মিশনারিদের একটি সংগঠনে স্বেচ্ছাসেবা দিয়েছেন। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন আইইআরে (শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট)। তবে তার আগে চারুকলা অনুষদে ভর্তি পরীক্ষা দিলেন এবং ৮৩তম হলেন। তারপরও মায়ের ইচ্ছেতে ভর্তি হলেন আইইআরে। বিশ^বিদ্যালয় জীবনে ছায়া জাতিসংঘের কাজ করেছেন মডেল ইউনাইটেড নেশনসে। টুরিস্ট ক্লাবের সদস্য ছিলেন। বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রামে বেড়িয়েছেন। ২০১৬ সালে নয়জন মেয়ে মিলে গিয়েছেন বান্দরবানের নাফাখুম। সেখানে পুলিশের অনুমতিপত্র নিয়ে যেতে হয়। পুলিশ সদস্যরাও তাদের দেখে অবাক হয়ে গেলেন। তবে জেদের কাছে হার মানলো সব। তারা বেড়িয়ে এলেন।

আইইআরে পড়তে পড়তে শিক্ষা বিষয়ে কাজ শুরু করলেন তিনি। ২০১৭ সালের জুলাইতে তৈরি করলেন ‘এডুকেশন এন্টারপ্রিনিউয়ার সোসাইটি’ নামে একটি শিক্ষা উদ্যোক্তা সংগঠন। তিনি সহ-সভাপতি। আর বন্ধু গোলাম রাফসান জানী সভাপতি। এডুকেশন এন্টারপ্রিনিউয়ার আইডিয়া কোয়েস্টের মাধ্যমে তারা একটি আইডিয়া প্রতিযোগিতা করলেন। তাতে অরবিট গ্রুপ ও একটি পত্রিকা স্পন্সর করল। ৫১টি আইডিয়া প্রাথমিক বাছাইয়ে মনোনীত হলো। এরপর চট্টগ্রাম, রাজশাহী, শাহজালাল, আহসানউল্লাহ, ঢাকা ও ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে রোড শো করলেন। তাতে প্রতিযোগিতার বিস্তারিত ছাত্র-ছাত্রীরা জানলেন। এরপর ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে হলো চূড়ান্ত প্রতিযোগিতা। তাতে আইইআরের অধ্যাপকরা ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তখনকার উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক প্রধান অতিথি ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, উদ্যোক্তার এই নব ধারণা আমাদের গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাকেই বদলে দেবে। আইডিয়া প্রতিযোগিতায় ‘বৃহন্নলা’ চ্যাম্পিয়ন হলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআরের ছাত্রছাত্রীদের একটি দলের তৈরি এই ধারণায়, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের লেখাপড়া শেখানোর উপায়গুলো বলা হয়েছে। তাদের শিক্ষিত করে তোলার মাধ্যমেই তাদের সামাজিক স্বীকৃতি আদায় সম্ভব হবে বলেছেন দলের সদস্যরা।ভবিষ্যতে শিক্ষা বিষয়ে ক্যারিয়ার গড়তে চান সামিহা। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় অবদান রাখবেন তিনি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত