শনিবার, ২২ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

প্রজাপতির পিছু পিছু

আপডেট : ০২ মার্চ ২০১৯, ০২:০৫ এএম

হঠাৎ করে প্রজাপতির মায়ায় পড়ে গেলেন। তারপর থেকে শাহ্্নাজ রহমান সুমনা প্রজাপতির পেছনে ঘুরছেন। ৩৮ জাতের প্রজাপতির আচরণ ও জীবন জেনেছেন তিনি। তার কথা লিখেছেন আবদুর রাজ্জাক। ছবি তুলেছেন নূর


প্রজাপতি নিয়ে গবেষণার শুরু হঠাৎ। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণিবিদ্যা বিভাগে মাস্টার্স প্রায় শেষ হয়েছে। একদিন বিভাগের বড় ভাই আবু রিমাদ তাপসের সঙ্গে পরিচয় হলো। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. আবুল বাসারের অধীনে প্রজাপতি গবেষণা করছেন। তার গবেষণাই আমাকে প্রজাপতি গবেষণার দিকে ঠেলে দিল। উদ্ভিদবিদ্যার ছাত্রী হিসেবে জানি, পরিবেশ সংরক্ষণে প্রজাপতির অনেক ভূমিকা আছে। নানা জাতের গাছের একসঙ্গে থাকা ও নতুন জাতের গাছের জন্মদান ও পরিবেশের উন্নতিতে ওরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তা ছাড়াও চেনা এই পতঙ্গের জীবনচক্র ও আচরণ জনতে ইচ্ছে করত। ছোটবেলা থেকে গবেষণার আগ্রহ আছে। ফলে অধ্যাপক ড. আবুল বাসারের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। তিনি ফলাফল, আগ্রহ দেখে আমাকে নিতে রাজি। ২০০৮ সালে ‘এনভায়রনমেন্টাল বায়োলজি অ্যান্ড বায়োডাইভারসিটি ল্যাবরেটরি (ইবিবিএল)’-তে কাজ শুরু করলাম। এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগে, স্যার আমার তত্ত্বাবধায়ক। প্রথম থেকেই প্রজাপতি দেখতে, তাদের জীবন জানতে বনে-বাদাড়ে ঘুরছি। নানা পরিবেশে তাদের নানা প্রজাতির বৈচিত্র্য, সংখ্যা, ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে আচরণ, বসবাস নিয়ে গবেষণা করছি। ২০০৮ সালে কাজ শুরু করে বান্দরবান ছাড়া এ দেশের সব বন, জঙ্গলে প্রজাপতির পেছনে ঘুরেছি। ফলে এ পর্যন্ত স্যাটারাইডি (লাতিন বৈজ্ঞানিক নাম) পরিবারের ৩৮ প্রজাতির প্রজাপতি নিয়ে গবেষণা করেছি। ৩৮ প্রজাতির প্রজাপতির স্বাভাবিক পরিবেশে আচরণ ও গবেষণাগারে সেই পরিবেশ সৃষ্টি করেছি। এরপর আচরণ ও জীবনচক্রের ওপর কাজ করেছি। ইবিবিএল গবেষণাগারে বন থেকে নিয়ে আসা তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে ও ৩৮ জাতের প্রজাপতির জীবনচক্রের আলোকে গবেষণা করেছি। প্রজাপতিগুলোর সফল জীবনচক্রের জন্য কী পরিবেশ, তাপ, আর্দ্রতা, আলোর তীব্রতা, অন্যান্য সুযোগসুবিধা প্রয়োজন সেসব তথ্য নিয়ে গবেষণাগারে গবেষণা করেছি। আমার গবেষণা করা সব
প্রজাপতিই বৈজ্ঞানিক নাম আছে। তবে সাধারণ পাঠক ও প্রজাপতিপ্রেমীদের জন্য বাংলা নামগুলোই বলতে চাই। প্রজাপতিগুলো হলো, কুঞ্জকুবের, কর্ণ কুঞ্জকুবের, তেহাই কুঞ্জকুবের, বেগুনি কুঞ্জকুবের, কুলাল কুঞ্জকুবের, কৃষ্ণ কুঞ্জকুবের, মাইজ কুঞ্জকুবের, বার্মিজ কুঞ্জকুবের, দিঘল কুঞ্জকুবের, বিহ্বল কুঞ্জকুবের, লাহরি কুঞ্জকুবের, রজন কুঞ্জকুবের, থাই কুঞ্জকুবের, বংশী বনপাল, পটি বনপাল, তমস বনপাল, রক্তিম বনপাল, রাজ বনপাল, লোহিত বনপাল, বর্ণিল অঙ্গুরি, পুবাল অঙ্গুরি, তৃণাঙ্গুরি, গুরু অঙ্গুরি, পুবাল অঙ্গুরি, পৃথাঙ্গুরি, জহর অঙ্গুরি, মালয় অঙ্গুরি, সিঙ্গর অঙ্গুরী,  নিরংশু অঙ্গুরি, প্রাকৃত অঙ্গুরি, চুনট অঙ্গুরি, উলু বিহারি, উষসি কপিল, কৃষ্ণ কপিল, খেড়ো কপিল, গুণন করবনপাল, চিত্রা করবনপাল ও দূরপরবাসী বনপাল। এই জাতের প্রজাপতিগুলোর স্বাভাবিক পরিবেশ মানে বনের পরিবেশে আচরণও জেনেছি। দিনের কোন সময় কীভাবে তারা ফুল থেকে খাবার খোঁজে, কখন কীভাবে বিশ্রাম নেয় তাও জেনেছি। প্রজাপতি শীতল রক্তের প্রাণী। সূর্যের আলো থেকে তাপ নেয়। সেই তাপে চলাফেরা করতে পারে। মাটির পরিত্যক্ত পানি থেকে মিনারেল সংগ্রহ করে। মিনারেল পরে ওদের প্রজননে সাহায্য করে। যে ৩৮ জাতের প্রজাপতি নিয়ে গবেষণা করেছি, সেগুলো কীভাবে এই কাজগুলো করে সেসব তথ্য পেছনে ঘুরে জোগাড় করেছি। জেনেছি, প্রতিটি প্রজাতির প্রজাপতি নির্দিষ্ট পরিবেশে, নির্দিষ্ট অঞ্চলে থাকে। সেখানে অন্য কোনো জাতের প্রজাপতি থাকে না। প্রজাপতিগুলো নির্দিষ্ট কয়েক জাতের গাছগাছালির ওপর নির্ভর করে বাঁচে। সেই আলাদা আলাদা অঞ্চল, সেসব গাছগাছালির ওপরও তথ্য জোগাড় করতে হয়েছে। বনগুলোর সেই এলাকার আবহাওয়ার পরিবর্তন যেমন-তাপ, আর্দ্রতা, সূর্যালোকের তীব্রতা ইত্যাদির পরিবর্তন জেনেছি। পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে সঙ্গে প্রজাপতিগুলোর জীবন কীভাবে বদলে যায় কী আচরণ করে তাও তথ্য আকারে লিপিবদ্ধ করেছি। সাধারণত ২৫ থেকে ৩১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপে প্রজাপতি স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা
করতে পারে। তবে বাংলাদেশের তাপমাত্রা ২০ থেকে ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে এলে ওরা বাইরে বেরোতে পারে না। তখন বিশ্রামে যায়। প্রজাপতির মাথার যে শূঁড় আছে, সেটি দিয়ে আগে থেকে ওরা আবহাওয়া ও পরিবেশের তথ্য টের পায়। তথ্যগুলো ওরা এতই সংবেদনশীলভাবে পায় যে বিজ্ঞানীরা আবহাওয়া ও পরিবেশের সামান্য পরিবর্তনের প্রধান নির্দেশক হিসেবে প্রজাপতিকেই গণ্য করেন। ফলে কোনো নির্দিষ্ট পরিবেশে বসবাস করা প্রজাপতির আচরণ নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে সহজেই সেখানকার পরিবেশের হাল অবস্থা জানা সম্ভব। প্রজাপতির জীবনচক্রের বিভিন্ন স্তর আছে। প্রতিটি জাতের প্রজাপতির জীবন নির্দিষ্ট জাতের গাছের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সবার আগে পোষক গাছগুলো গবেষণাগারে রোপণ করতে হয়েছে। গবেষণাগারে এই কৃত্রিম অথচ সত্যিকারের পরিবেশ তৈরি করে গবেষণায় নেমেছি। আমাদের সুবিধা ছিল, গবেষণাগারে নানা ধরনের বৈজ্ঞানিক যন্ত্রাংশ, বই, কম্পিউটার আছে। ফলে বৈজ্ঞানিক উপায়ে প্রজাতিগুলো কীভাবে শনাক্ত করতে হয় সেসব তথ্য নিতে পেরেছি। সেগুলো মাঠের প্রজাপতির জীবনচক্রের সঙ্গে মিলিয়েছি। তবে গবেষণাগারে নয়, আমার পিএইচডির কাজের বেশির ভাগ সময় মাঠেই গবেষণা করে কাটাতে হয়েছে। প্রথমে কঠিন মনে হলেও পরিবার ও সহকর্মীদের সাহায্যে মেয়ে হিসেবে আর সমস্যা হয়নি। প্রজাপতি সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ তেমন কঠিন নয়। পেছনে লেগে থাকলেই হলো। তারা নির্দিষ্ট জীবন ধারণ করে। তবে আস্তে আস্তে এই দেশ থেকে প্রজাপতি হারিয়ে যাচ্ছে। এর কারণ মানুষের অসচেতনতা। প্রজাপতির মতো ছোট্ট পতঙ্গ নিয়ে এ দেশের মানুষ এতটুকু ভাবে না। তাদের সচেতন করা খুব কঠিন। গবেষণাগারের সহকর্মীদের সঙ্গে অনেক জনসচেতনতা অনুষ্ঠান করতে হয়েছে। স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের কাছেই বেশি গিয়েছি। স্থানীয় জনসাধারণকেও পরিবেশ বাঁচাতে প্রজাপতির সংরক্ষণ করা কেন প্রয়োজন সে সম্পর্কে জানিয়েছি। তাদের সঙ্গে তাদের এলাকার প্রজাপতির জীবনচক্র
নিয়ে আলোচনা করেছি। তাতে আমরা যেমন অনেক তথ্য পেয়েছি, তেমনই তারা প্রজাপতি সম্পর্কে জেনেছেন। অবাক হয়েছেন। এই ক্ষুদ্র অথচ দারুণ পতঙ্গকে ভালোবেসেছেন। তবে মুগ্ধ হলেও, ভালোবাসলেও তারা প্রজাপতিকে বাঁচাতে তেমন উদ্যোগী নন। ২০০৮ সালে যে পরিমাণ প্রজাপতির প্রাচুর্য ও বৈচিত্র্য দেশে দেখেছি, এখন বনে, বাদাড়ে আর তেমনটি চোখে পড়ে না। প্রজাপতির বিলুপ্তির প্রধান কারণ মানুষ গাছ, বন কেটে প্রজাপতি মেরে ফেলছে। তবে এখনো বাংলাদেশ প্রজাপতির বৈচিত্র্যে ভরা। এই ছোট্ট দেশে এ পর্যন্ত ৩২০ জাতের প্রজাপতি পাওয়া গেছে। ওদের বেঁচে থাকতে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা, তাপ, বৃষ্টির তাপ সবই আমাদের এখানে আছে। জীবনের জন্য আবাস মানে পোষক, রসদ, আশ্রয়ী, বিশ্রাম উদ্ভিদ আমাদের দেশে অনেক বেশি। তাই এত প্রজাতির প্রজাপতিতে এ দেশ ভরপুর। প্রজাপতি পরিবেশের অনন্য নির্দেশক। বিভিন্ন জাতের প্রজাপতি যখন কোনো প্রাকৃতিক পরিবেশ বা কোনো বনে পাওয়া যায়, বিজ্ঞানীরা অবলীলায় সেই বনের অবস্থা ভালো বলে ফেলেন। তারা জানান, বনটি সুস্থ আছে। প্রজাপতির আচরণে আবহাওয়ার পরিবর্তন টের পাওয়া যায়, প্রজাপতিহীনতায় আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটে। রোদের সকালে নানা জাতের প্রজাপতি ডানা মেলে ওড়ে। মেঘলা দুপুরে তাদের খুঁজে পাওয়া ভার। তখন তারা তাদের গাছগুলোতে বিশ্রামে গিয়ে জীবন বাঁচায়। প্রজাপতির আচরণের পরিবর্তনে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পরিবেশে কোন পদার্থের যেমন মানুষের ঘামে ভরা দেহ, কোনো পচে যাওয়া বস্তু, ময়লা আবর্জনা ইত্যাদি দূষিত জিনিসের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। এই প্রসঙ্গে বলি, স্যাটেরিট পরিবারের প্রজাপতি ২০০৭ থেকে ০৮ সালের মধ্যে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে ২৬ থেকে ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পাওয়া যেত। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে এখন আগের মাসগুলোতে তারা থাকে না। নভেম্বরে তাদের দেখা যায়। এ তথ্য থেকেই আমরা এই দেশের জীববৈচিত্র্য, প্রাণী ও পতঙ্গকুলের ওপর জয়বায়ু পরিবর্তনের খারাপ প্রভাব পড়ছে,
বলে দিতে পারি। প্রজাপতি মাটির সঙ্গে মিশে থাকা গাছসহ নানা স্তরের গাছের ওপর নির্ভরশীল। তারা সে গাছগুলোর পরাগায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রজাপতি তাদের প্রয়োজনীয় গাছের সংখ্যা বাড়ানোসহ নতুন জাতের গাছের বিকাশে অসাধারণ ভূমিকা রাখে। গবেষণা বলে, বনে বাস করা প্রজাপতি তাদের প্রয়োজনীয় উদ্ভিদ ৪৭ ভাগও বাড়াতে পারে। তবে এই দেশে প্রজাপতি নিয়ে গবেষণার সংখ্যা খুব কম। ফলে তারা অনাবিষ্কৃত থেকেই বিলুপ্ত হচ্ছে। পতঙ্গটি বনের জন্য নয়, মানুষের জন্যও প্রয়োজনীয়। জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম শিকার বাংলাদেশের মানুষের জন্য তো এ কথা শতভাগ সত্য। টাকা-পয়সা আয়ের দিক থেকেও প্রজাপতি বাঁচানোর বিকল্প নেই। নতুন ইকো-ট্যুরিজম ধারণায়  প্রজাপতি খুব গুরুত্বপূর্ণ। ড. আবুল বাসারের নেতৃত্বে ‘ইবিবিএল’ গবেষণাগারের মাধ্যমে বন বিভাগের সঙ্গে মিলে অমরা ২০১২ সালে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে প্রথম খোলা প্রজাপতি পার্ক তৈরি করে দিয়েছি। তাদের জীবনচক্রের জন্য যেসব গাছগাছালি থাকতে হবে, সেগুলোর নাম, গাছগুলোর তথ্য জোগাড় করে দিয়েছি। উদ্যান কর্তৃপক্ষ গাছগুলো জোগাড় করেছেন। পার্ক ব্যবস্থাপনা, পার্কের প্রজাপতিগুলোর সংরক্ষণে করণীয় যেমন গাছ বাঁচানো, পার্কের সব জায়গায় তাপ ও আলো চলাচলের ব্যবস্থা করতে আমি সাহায্য করেছি। প্রজাপতি নিয়ে আমার গবেষণা এখনো চলছে। আমি স্যাটেরিড গোত্রের প্রজাপতির ডানায় আই স্পটের (চোখের মতো দাগ বা চিহ্ন) আকারের এক ধরনের পরিবর্তন হয় সে নিয়ে কাজ করছি। গরমে বৃষ্টি কম হলে এই দাগ ছোট হয়ে যায়, বর্ষায় বেশি বৃষ্টি হলে দাগ বড় হয়। কেন এমন হয়? এ পরিবর্তনের ফলে পরিবেশে কী ঘটে, তা আমার গবেষণা। আমরা একে প্রজাপতির ডানার ‘বহুরূপতা’ বলি। পরিবেশের নানা পরিবর্তনে নির্দিষ্ট প্রজাতির প্রজাপতির নির্দিষ্ট পরিবর্তন হলে এমনটি ঘটে। আমার মাঠের গবেষণা ভবিষ্যতে প্রজাপতির ডিএনএ বা জিনগত বিবর্তনসহ আরও নানা বিষয়ে ছড়িয়ে দিতে চাই ।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত