শুক্রবার, ১৪ জুন ২০২৪, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

সেই ভবনের সব তলায় ছিল রাসায়নিকের গুদাম

আপডেট : ০২ মার্চ ২০১৯, ০৩:৩৩ এএম

পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ডের তদন্তে নেমে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন, মার্কেট ও দোকানের তালিকা করেছে পুলিশ। তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে কোনো তথ্য সংগ্রহ করতে পারেনি তারা। তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন,  সেই ভবনের সব তলায় ছিল রাসায়নিকের গুদাম। আগুনের কারণ অনুসন্ধানে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) পরীক্ষাগারে দু’দফায় আলামত পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনার নয় দিন পর গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত মামলার কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

এদিকে গতকাল চুড়িহাট্টায় দর্শনার্থীদের ভিড় দেখা গেছে। দুর্ঘটনার স্থানটি একনজর দেখতে রাজধানী ও এর আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসেছিলেন তারা। সাপ্তাহিক ছুটির দিন থাকায় সেখানকার সব দোকানপাট বন্ধ ছিল।

গত ২০ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ১০টার দিকে চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। গতকাল চিকিৎসাধীন রেজাউলের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এ ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭০ জনে দাঁড়িয়েছে। আগুনের সূত্রপাত নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেলেও এর ভয়াবহতার জন্য দাহ্য রাসায়নিকের ভূমিকার কথাই বলছেন সবাই। এ ঘটনায় চকবাজার থানায় অবহেলাজনিত দুর্ঘটনা ও অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে।

অবহেলাজনিত দুর্ঘটনার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক মোরাদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওয়াহেদ ম্যানশনের মালিক মৃত ওয়াহেদ মিয়ার দুই ছেলে মো. হাসান (৫০) ও সোহেল ওরফে শহীদ (৪৫), সিলিন্ডার বিস্ফোরিত প্রাইভেটকারের মালিকসহ অজ্ঞাত ১০-১২ জনকে মামলায় আসামি করা হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত আসামিদের কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তবে অগ্নিকাণ্ডের কারণ, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও ক্ষতিগ্রস্ত ভবন, মার্কেট ও দোকানের যাবতীয় তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে।’ বিভিন্ন প্রত্যক্ষদর্শীসহ ঘটনার সময় ওয়াহেদ ম্যানশনে থাকা একজনের বক্তব্য গ্রহণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

পুলিশের সংগৃহীত তথ্যমতে, চুড়িহাট্টার উত্তরে আজগর লেনে বাচ্চু ও জাকিরের মালিকানাধীন বিভিন্ন ভবন, দক্ষিণে নন্দকুমার দত্ত রোডে ওয়াহেদ ম্যানশন, কাটারা কমিউনিটি সেন্টার, হানিফ-ডাবলু এবং হাবিবুরের মালিকানাধীন ভবন, পূর্বে নন্দকুমার দত্ত রোডে হাজী ওয়াহেদ ম্যানশনের অংশবিশেষ এবং পশ্চিমে চুড়িহাট্টা শাহী জামে মসজিদ ও হায়দার বক্স লেন।

ঊর্ধ্বতন এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, আগুনে হাজি ওয়াহেদ মিয়ার মালিকানাধীন পাঁচতলা ‘ওয়াহেদ ম্যানশনের’ আন্ডারগ্রাউন্ড ছাড়া প্রথম থেকে চারতলার সব ফ্লোরেই রাসায়নিক দ্রব্যের গুদাম ছিল, যার সবই পুড়ে গেছে। নিচতলায় বিভিন্ন মালিকানাধীন দোকানপাট, দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ তলা পর্যন্ত প্রতিটি ফ্লোরে সাতটি করে ইউনিট এবং প্রতি ইউনিটে পাঁচটা করে রুম, দ্বিতীয় তলার সবকটি ইউনিটে গুদাম, তৃতীয় তলায় তিনটি আবাসিক ইউনিট ও একটি গুদাম, চতুর্থ তলার তিনটি আবাসিক ইউনিট ও একটি গুদাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া নাহিদ এন্টারপ্রাইজ নামে নাহিদের প্লাস্টিক দানার দোকান আগুনে পুড়ে গেছে এবং নাহিদও পুড়ে মারা গেছেন। রিমনের প্রাইম ট্রেড নামে প্লাস্টিক দানার দোকান, সোহাগের টিআর এন্টারপ্রাইজ, পারভেজের পিএম এন্টারপ্রাইজ, রানার রানা টেলিকমও পুড়ে গেছে। অগ্নিকাণ্ডের সময় দোকানের শাটার নামিয়ে ভেতরে অবস্থানকারী রানা ও তার ভাই রাজুর মৃত্যু হয়েছে।

তিনি আরও জানান, মহিউদ্দীনের মহিউদ্দীন এন্টারপ্রাইজ, মাওলানা হিবজুরের মালিকানাধীন আল-আরাফা ট্রেডিং, জসিমের প্লাস্টিক দানার দোকান, রিপনের রিপন এন্টারপ্রাইজ, কাদেরের কুচাদানার দোকান, শাওনের এসআর ট্রেডার্স, মফিজের মালিকানাধীন এসএম প্লাস্টিক ও কুচাদানার দোকান, আজিজুর রহমানের রঙের দোকান, সাগরের পুরাতন রেফ্রিজারেটর দোকান, শামসুদ্দিনের মদিনা ডেকোরেটর আগুনে পুড়ে গেছে এবং শামসুদ্দিন ও তার বন্ধু জুম্মন পুড়ে মারা গেছেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ৩১ নম্বর আজগর লেনের বাচ্চুর মালিকানাধীন তিনতলা ভবনের নিচতলার বিভিন্ন দোকান পুড়ে গেছে। এর মধ্যে বাবুর মালিকানাধীন নাদিমের রঙের দোকান, রিপনের রঙের দোকান, হাবিবের হাবিব টেইলার্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুড়ে যাওয়া হায়দার ফার্মেসি থেকে নয়টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া শোহেবের মালিকানাধীন গুদামঘরও পুড়ে গেছে।

তিনি জানান, ৬৩ নন্দকুমার দত্ত রোডে হানিফ-ডাবলুর মালিকানাধীন দোতলা ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে লিটনের কনফেকশনারি, ডি এন্টারপ্রাইজ, জনি ও রনির মালিকানাধীন পাঁচতলা আবাসিক ভবনের নিচতলার কোনায় মান্নানের মুদি দোকান পুড়ে গেছে। এছাড়া মদিনা ফার্মেসি অ্যান্ড ডেন্টাল পুড়ে মালিক ফারুক ছাড়াও একজন করে চিকিৎসক, নার্স, স্টাফ ও রোগী মারা গেছেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট ওই কর্মকর্তা আরও জানান, ১৭ নম্বর মসজিদ মার্কেটের পাঁচতলা ভবনের নিচতলার দোকান ক্ষতিগ্রস্ত এবং নিশাদ স্টোর, শফিকের দোকান, হযরত আনাস (রা.) হোটেল, কাটারা কমিউনিটি সেন্টারের অফিস, ৬৫ ও ৬৬ নন্দকুমার দত্ত রোডের বাবুল হোসেনের মালিকানাধীন ছয়তলা ভবনের নিচতলা আগুনে পুড়ে গেছে। এখানে আলমগীরের মালিকানাধীন হোটেল পুড়েছে ও বিল্লালের হানিফ ফুড স্টোর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পুলিশের জব্দ তালিকায় যা আছে : গত ২২ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৪টা থেকে ২৪ ফেব্রুয়ারি বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত চকবাজার থানা পুলিশের তদন্তকারী দল শাহী মসজিদের সামনে নন্দকুমার দত্ত রোড, হায়দার বক্স লেন, আজগর লেনের সংযোগস্থলে ওয়াহেদ ম্যানশনসহ অন্যান্য ভবনের সামনে থেকে পোড়া দুটি প্রাইভেটকার, একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, চারটি মোটরসাইকেল, দুটি একটনি পিকআপ, একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং একটি রিকশা জব্দ করেছে। আগুনের কারণ অনুসন্ধানের জন্য এসব আলামতের বেশিরভাগই সিআইডির পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত