মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪, ১১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

চোখ খুলতে পথ খুলে দেন সাকিয়া

আপডেট : ০২ মার্চ ২০১৯, ০৪:১৭ এএম

বাংলাদেশের মেয়েদের প্রথম ও সবচেয়ে বড় ফেসবুক ভ্রমণ পেইজের নায়ক সাকিয়া হক। তার সঙ্গে কথা বলেছেন ইয়াসিন হাসান। ছবি তুলেছেন সিজান আহমেদ জিম

 

ছোটবেলা থেকে বেড়াতে ভালো লাগে তার। সুযোগ পেলেই বেড়াতে যেতেন সাকিয়া হক। তবে ঘুরতে গিয়ে কোনোদিনও লেখাপড়াকে অবহেলা করেননি। বরাবরের ভালো ছাত্রীটি মেডিক্যালের পরীক্ষায় দারুণ ভালো ফলাফল করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। এটিও তার স্বপ্ন ছিল। বেড়ানো এতই ভালো লাগতো যে, কোনোদিন ভালো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে বেড়ানোর শখটি পূরণ করবেন বলে মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলেন তিনি। ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি হবার পর তার সেই স্বপ্নটি পূরণ হলো। আরো বেড়ানোর শখ পূরণ করতে লাগলেন। বিভিন্ন ভ্রমণ সংগঠনের সঙ্গে বেড়াতে লাগলেন। তবে খেয়াল করে দেখলেন, এই সংগঠনগুলোর সবগুলোই পুরুষের। তাদের সঙ্গে নারীরাও বেড়াতে যান। মেয়েদের জন্য আলাদা কোনো বেড়ানোর সংগঠন গড়ে তোলার ইচ্ছে হলো তার। কথাটি রুমমেট ও বন্ধু মানসী সাহার সঙ্গে আলাপ করলেন। তিনিও এক কথায় রাজি। ফেসবুককে কেন্দ্র করে এই সংগঠন করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হলো না তাদের। ফলে ২০১৬ সালের ১৭ নভেম্বর ইভেন্ট পেইজ হিসেবে যাত্রা শুরু করলো ‘ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশ’। এটিই বাংলাদেশের মেয়েদের প্রথম নারীদের ভ্রমণ পেইজ। শুরু থেকেই মেয়েদের ভালো সাড়া পেতে লাগলেন। নিজেরা মেয়ে বলে আরো জানলেন, প্রতিটি মেয়েরই বেড়াতে ভালো লাগে। আর সব মানুষের মতো কোথাও গিয়ে দুদন্ড শান্তি পেতে ইচ্ছে করে। নতুন কোনো জায়গা সম্পর্কে জানতে মন চায়।

আস্তে আস্তে তাদের সদস্য সংখ্যা বাড়তে লাগলো। ১৯ জন মেয়েকে নিয়ে জীবনের প্রথম কোথাও বেড়াতে গেল ‘ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশ’। সেই দিনটি আজো মনে আছে সাকিয়ার-২০১৭ সালের ২৯ জানুয়ারি। তাদের গন্তব্য ছিল নরসিংদীর সরিষা ক্ষেত। সেখান থেকে বেড়িয়ে মেঘনা নদী হয়ে ফিরবেন তারা। আগে থেকেই বিকাশের মাধ্যমে আগাম খরচ নিয়ে নিলেন। এরপর সব ঠিক করা হলো। সকাল সাতটায় ঢাকার গুলিস্তান থেকে রিজার্ভ বাসে চড়ে বসলেন সবাই। দুই ঘন্টায় পৌঁছালেন নরসিংদীতে। সেখানে সরিষা ক্ষেতে গিয়ে হাজির হলো নারীর দল। সবাই মিলে ক্ষেতে বেড়ালেন, অনেক ছবি তুললেন, সেলফিও হলো অনেক। এরপর জুতার কারখানা, বাবুরহাটের বিখ্যাত ও ঐতিহ্যবাহী কাপড়ের পাইকারি মার্কেটে বেড়ালেন। দুপুরে খাওয়া-দাওয়া সেরে বেড়াতে গেলেন মেঘনা নদীতে। বিশাল এই নদীতে মেয়েরা সবাই নৌকায় বেড়ালেন। ট্রলার চালিত বিশাল নৌকায় একে অন্যের সঙ্গে আলাপ সারলেন, গান-কবিতা ও কৌতুকের মাধ্যমে সময়টিও দারুণ কাটলো। সন্ধ্যায় রওনা দিয়ে রাত আটটায় ফিরে এলেন ঢাকার গুলিস্তানে।

এরপর থেকে প্রতি মাসে কোথাও না কোথাও বেড়াতে গিয়েছে ‘ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশ’। বাংলাদেশের অনেকগুলো দর্শনীয়, বিখ্যাত, পরিচিত-অপিরিচিত জায়গাতে পা পড়েছে তাদের। সেগুলোর মধ্যে কয়েকটির নাম এক পলকে বলে ফেললেন সাকিয়া, ‘আমরা নাটোর, বগুড়া, রাজশাহী, দিনাজপুর, সিলেট, সাজেক, হামহাম ঝর্ণা, কক্সবাজার, সুন্দরবন, কুয়াকাটা, পানাম সিটি ইত্যাদি জায়গায় মোট ৪৮টি ইভেন্ট করেছি। সর্বশেষ ইভেন্টে গিয়েছি কেওক্রাডংয়ে। সেখানে ছিলাম এই বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে।’ সেদিন এই দলে ২২ জন নারী ছিলেন। সেদিন রাতে রিজার্ভ বাসে চড়ে বসেছিলেন তারা সবাই। রওনা দিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে। সারা রাত বাসে গল্প হলো, অনেকে ঘুমালেন। কেউ মত্ত ছিলেন অন্যের সঙ্গে আলাপে। পরদিন ভোরে বান্দরবান শহরে পৌঁছালেন। আগে থেকে পরিচিত এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে হোটেলে সকালের নাস্তা সেরে বগা লেক দেখতে চান্দের গাড়িতে চড়ে বসলেন। গাড়িতে গান, গল্প অনেক হলো। বিশাল এই লেকের পাড়ে বেড়ালেন। মুগ্ধ হয়ে লেক ও আশপাশের সৌন্দর্য্য দেখলেন। পরদিন চলে গেলেন কেওক্রাডং পাহাড়ের চূড়া দেখতে। রাতে আবার কটেজ রিজার্ভ করে থাকলেন। তার পরদিন সকালে কেওক্রাডং থেকে আবার বগা লেক পাড়ি দিলেন। বাংলাদেশের অনুপম এই সুন্দর স্থানটি বেড়িয়ে রাতের আবার বাসে চড়ে পরদিন ঢাকায় পা রাখলেন। এই মাসের ১৫ মার্চ তারা যাবেন নিঝুম দ্বীপে।

এখন মোট ২৬ হাজার সদস্য আছেন এই ফেইসবুক গ্রুপে। দলের নিয়মিত ভ্রমণে ষষ্ঠ শ্রেণির বালিকা থেকে শুরু করে ৬৫ বছরের বৃদ্ধাও থাকেন। ভ্রমণ সংগঠনটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সাকিয়া জানালেন, ‘আমাদের ভ্রমণের সময় কোনো অসুবিধা কোনোদিন হয়নি। আমাদের দুইজন নারী সদস্য পুরো দলের দেখভালের জন্য থাকেন। তারা আগে থেকেই আমরা যে এলাকায় যাবো, সেখানে পূর্ব পরিচিত কোনো মানুষের মাধ্যমে সবকিছু ঠিক করে রাখেন। আমাদের সবাই শিক্ষিত ও বেড়াতে ভালোবাসি বলে সেসব জায়গার কোনো ক্ষতি করি না। বরং আরো ভালোভাবে জায়গাটিকে চিনে আসি। অন্যদের কাছে বলি।’ অনেক ভ্রমণ শেষে সাকিয়ার মনে হয়েছে, ভ্রমণে নারীর ক্ষমতায়ন ক্ষমতা তৈরি হয়। একটি মেয়ে গৃহের কাজে, সংসারে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্র এবং আশপাশ থেকে আলাদা থাকে। পরিবারের প্রতি অসীম মমতা থেকে তার নিজেকে বাইরের কেউ মনে না হলেও আস্তে আস্তে সে নিজের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে, তার জানার ও দেখার পরিধিটি ছোট হতে থাকে। কিন্তু বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে তার পরিচিতি বাড়তে থাকলে সে নিজের জীবন সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে, বিপদাপদ ও অন্যের মনোভাব আরো ভালোভাবে জানতে পারে। ফলে ধীরে ধীরে তার আত্মবিশ^াস আরো বাড়ে। নিজেকে ভালোভাবে রক্ষা করতে সে শেখে।’ এ ভাবনা থেকেই তারা দুজনে ভ্রমণের পাশাপাশি নারীর আত্মরক্ষা, আত্মসুরক্ষা ও লিঙ্গ বৈষম্য দূর করতে বিশেষ উদ্যোগ নিলেন। ২০১৭ সালে চালু হলো ‘নারীর চোখে বাংলাদেশ’। তারা দেশের ৬৪টি জেলায় গিয়ে মেয়েদের আত্মরক্ষা, আত্মসুরক্ষা, বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে জানানো শুরু করলেন। প্রথম কর্মসূচিটি ছিল ২০১৭ সালের ৬ এপ্রিল, চারটি মেয়ে দুটি স্কুটি চালিয়ে চলে এলেন নারায়ণগঞ্জে। সেদিন সকালে প্রথমেই গেলেন শহীদ মিনারে। এরপর আড়াই হাজারের ইউনাইটেড স্কুল অ্যান্ড কলেজে গেলেন। আগে থেকেই একজন স্বেচ্ছাসেবী তাদের পরের অন্য স্কুলগুলোর মতো এই স্কুলেও যোগাযোগ করে সবকিছু ঠিক করে রেখেছিলেন। তবে স্কুলটিতে তারা স্কুটিতে চেপে আসতেই পুরো স্কুলের সব ছাত্রীরা অবাক হয়ে গেল। স্কুলের একটি রুমে শিক্ষক-শিক্ষিকা ও সমাজসেবকদের নিয়ে তারা আলাপে বসলেন। সবার সামনে বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ, নারীর স্বাস্থ্য, বয়ঃসন্ধিকালীন সমস্যা, মেয়েদের আত্মরক্ষার প্রাথমিক কৌশল, আত্মসুরক্ষার কৌশলগুলো শেখালেন তারা। এরপর তাদের কয়েকজনকে স্কুটির পেছনে নিয়ে বেড়িয়ে আসলেন। এরপর তারা কুমিল্লা, ব্রাক্ষণবাড়িয়ায়ও গিয়েছেন। প্রত্যন্ত ও অপরিচিত এলাকাগুলোর মেয়েদের মধ্যে নিজেদের সম্পর্কে অজ্ঞতা অনেক বেশি বলে সেসব এলাকাতেই পা পড়ে তাদের। এ পর্যন্ত ৫৪টি জেলায় কর্মসূচিটি পরিচালনা করেছেন তারা। প্রত্যেক জেলার মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়গুলোতে গিয়ে ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণির মেয়েদের তারা এসব বিষয়ে সচেতন করেন। তারা তাদের বয়ঃসন্ধিকালের সমস্যাগুলোর বিষয়ে সচেতন করে তোলেন। সাকিয়া বললেন, ‘আমরা গ্রামের এমন সব স্কুল বেছে নিয়েছি যেখানে একসঙ্গে ৫ থেকে ৬শ স্কুল ছাত্রীকে পাওয়া যায়।’ সেখানে পৌঁছানোর আগেই স্থানীয় প্রেসক্লাবের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাদের অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের উপস্থিতি কামনা করেন। স্বেচ্ছাসেবীর মাধ্যমে সেই স্কুলগুলোতে আগে থেকেই সময় ও স্থান ঠিক করে নেন। সাকিয়ার অভিজ্ঞতা হলো, গ্রামের লাজুক মেয়েরা তাদের জীবনের নানা সমস্যাগুলো লুকিয়ে রাখে। তাদের প্রশ্ন করে করে ও নিজেদের জীবনের গল্প বলে উৎসাহী করতে হয়। তাদের সহজ ও স্বাভাবিক করতে এবং তাদের সামনে বিষয়গুলো আরো ভালোভাবে তুলে ধরতে বন্ধুদের আঁকা শিক্ষামূলক কার্টুন, ইউটিউব থেকে সংগ্রহ করা ভিডিও দেখানো হয়। এরপর তারা বলতে শুরু করে, সেগুলো দেখেও অনেককিছু শিখতে পারে। এই ক্লাসগুলোর মাধ্যমে স্কুল পড়–য়া অল্প বয়সের মেয়েরা তাদের জীবনের নানা সমস্যার কথাও বলে। তাদের সেসব বিষয়ে পরামর্শ দেয় ‘নারীর চোখে বাংলাদেশ’। নিরাপদ স্যানিটেশন ও নারীর জন্য প্রয়োজনীয় অন্য প্রতিকারগুলোর কথাও জানে। সেসব নিয়ে করণীয় শেখে। আরো অনেক জায়গার মতো রাজশাহীর চর খিদিরপুরেও গিয়েছে ‘নারীর চোখে বাংলাদেশ’। এই চরটিতে পৌঁছাতে হলে প্রমত্তা মেঘনা নদী নৌকায় দুই ঘন্টায় পাড়ি দিতে হয়। সেখানে মেয়েদের মধ্যে নানা বিষয়ে তারা অসচেতনতা দেখেছেন। তাদের জীবন বাঁচানোর উপায় শিখিয়েছেন। এই কর্মসূচির মাধ্যমে নারীদের কী কী উপকার হয়েছে? জবাবে সাকিয়া জানালেন, ‘আমরা গ্রামের মেয়েদের মধ্যে আত্মসচেতনতা তৈরি করেছি। তাদের মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ বিষয়ে জানিয়েছি, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেছি।’ এই কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা বাল্য বিবাহের বিরুদ্ধে তাদের সচেতন করেছেন, সড়কে নিরাপদে চলাচলের জন্য তাদের আরো সাবধান করেছেন।

কেন স্কুটিতে গিয়েছেন এসব জায়গায়? সাকিয়া বললেন, ‘ছেলেদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মেয়েরাও যেন পথ চলতে পারে, সেটি জানানোর জন্যই আমাদের এই উদ্যোগ। আমাদের এই কার্যক্রমের মাধ্যমে আমরা নারী ও পুরুষের মধ্যে সমতা আনতে চাই।’ এই মার্চে তারা ১০ দিনের কর্মসূচিতে সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের জেলাগুলোতে কাজ করবেন। ফলে শেষ হবে নারীর চোখে বাংলাদেশের ৬৪ জেলায় কর্মসূচি। তাদের লক্ষ্য, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে মেয়েরাও যেন অবদান রাখতে পারে। পুরোটাই পকেটের টাকা দিয়ে এই কার্যক্রম চালাচ্ছে সাকিয়ার দল। এসব কাজের পাশাপাশি ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশকেও ছড়িয়ে দিচ্ছেন সাকিয়া ও তার বন্ধুরা।

২০১৭ সালের ২ ডিসেম্বর এই ভ্রমণ প্ল্যাটফর্মের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে ঢাকার শিশু একাডেমিতে একটি জমকালো অনুষ্ঠান হয়েছে। তাতে ‘ভ্রমণকণ্যা’ নামে তাদের ভ্রমণ ম্যাগাজিনটির প্রকাশনা উৎসব হয়েছে। সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন প্রধান অতিথি ছিলেন। এছাড়াও ২০১৭ সালের ৩০ মার্চ থেকে পহেলা এপ্রিল ঢাকার শিল্পকলা একাডেমিতে তারা আলোকচিত্র প্রদর্শনী করেছেন। বিষয় ছিল ‘বাংলাদেশ ও পর্যটন’। তিন হাজার ছবি থেকে সেরা ১শ ছবি নিয়ে এই প্রদর্শনী হয়েছে। পরের বছর একই প্রদর্শনীতে ছবি ছিল মোট ছয় হাজার। সেখান থেকে সেরা ছবিগুলো নিয়ে তারা ২০১৮ সালের ২০ থেকে ২৪ নভেম্বর শিল্পকলা একাডেমিতে আলোকচিত্র প্রদর্শনী করেছেন।

   
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত