মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪, ১০ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

অসুস্থের পাশে সবসময়

আপডেট : ০২ মার্চ ২০১৯, ০৪:১৯ এএম

ফারাহ আন্দালিব একজন চিকিৎসক। বঞ্চিত শিশুদের বিনা খরচে চিকিৎসা দিচ্ছেন। তাদের পড়ার ব্যবস্থা করছেন। বন্যা, শীত ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। তার জবানিতে লিখেছেন শাওন আবদুল্লাহ

আমি ডা. ফারাহ আন্দালিব। ১৪ বছর ধরে ঢাকার মহাখালীর আয়েশা মেমোরিয়াল স্পেশালাইজড হসপিটালের ইনসেনটিভ কেয়ার ইউনিট বা নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত। খুব বিপন্ন রোগীদের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করি। মানুষগুলোর সঙ্গে রাত-দিন থাকতে থাকতে জীবনটিই অন্যরকম হয়ে গেছে। তাদের জন্য কিছু করার চেষ্টা করা থেকে বুঝতে পেরেছি, এরা আসলে খুব অসহায়। কর্মঅভিজ্ঞতা ও ঢাকা মেডিকেল কলেজে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন প্রশিক্ষণের সময় দেখেছি, যেসব অসহায় গরিব রোগী ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে ভর্তি হতে পারেন না, তারা বেসরকারি হাসপাতালগুলোর আইসিইউতে ভর্তি হওয়ার জন্য আসেন। তবে টাকার অভাবে তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা সম্ভব হয় না। ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালানোও তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে পরে তাদের করুণ মৃত্যু আমার মতো মানুষের বুক ভেঙে দেয়। চিকিৎসক হিসেবে একজন রোগীকে বাঁচাতে পারলাম নাÑ এ আর্তি নিজের মধ্যে গুমরে মরছে। এই যে জীবন ও মৃত্যুর সঙ্গে মানুষের নিয়মিত সংগ্রাম, তাতে সবচেয়ে বেশি গরিবের শিশুরা বলি হয়। দেখেছি, মা-বাবার অসচেতনতায় অনেক গরিব মা-বাবা, বস্তিবাসীর সন্তানের ডায়রিয়া রোগে কিডনি বিকল হয়ে যায়। তারা মারা যায়। এসব মৃত, সুন্দর মুখগুলো চোখে ভাসে। ঘুমাতে পারি না। নিজেকে দোষী মনে হয়। এই শিশুদের যেভাবেই হোক বাঁচাতে হবে; তাদের জন্য বিরাট আকারে, বড় পরিসরে চিকিৎসাসেবা দেওয়া শুরু করতে না পারলেও অন্তত জীবনগুলো বাঁচানোর জন্য মা-বাবাকে সচেতন করার উদ্যোগ তো নিতে পারি। এই ভাবনা থেকেই আজ থেকে বছর চারেক আগে কাজ শুরু করলাম। সবার আগে মেডিকেলে আমরা যারা চিকিৎসক হিসেবে কাজ করি, তাদের সঙ্গে আলাপ হলো। তারাও সাহায্য এবং সহযোগিতা করতে রাজি। ফলে সাহস বেড়ে গেল। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গড়ে তোলার দিকে এগিয়ে গেলাম। নিজেকে বললাম, আস্তে আস্তে নিজেদের মতো করে এগিয়ে যাব। আমাদের একটিই উদ্দেশ্যÑ অসহায়ের পাশে দাঁড়াব। চিকিৎসক বলে রোগীদের সেবা দেব যতটা পারি। তাই নাম দিলাম, ‘জাস্টিস ফর হিউম্যানিটি’।

সবার আগে বিনামূল্যে মেডিকেল ক্যাম্প করার মাধ্যমে কাজ শুরু করলাম। এখনো সেই দিনটির কথা মনে আছে, ২০১৫ সালের পড়ন্ত বিকেল। ঢাকার কোনো জায়গায় মেডিকেল ক্যাম্প করা যায়, নিজের চোখে দেখতে বেরুলাম। অনেক জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে হাজির হলাম গোড়ানের বস্তিতে। সেখানে কাজ করব এই সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হলো না। এরপর বস্তির পাশের এক চায়ের দোকানে আমরা চিকিৎসাসেবা দেওয়ার কাজ শুরু করলাম। আসলে বস্তির মধ্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার মতো কোনো ভালো জায়গা আমরা খুঁজে পাইনি। চায়ের দোকানে বসে আশপাশে যেসব শিশু পথে পথে খেলছিল, তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চেষ্টা করলাম। নির্মল হাসিতে আমাদের ডাক শুনে ওরা এগিয়ে এলো। পুরোটা শরীর ধুলো, ময়লায় ভর্তি; হাত-পাও একেবারে দুর্বল, তবে মুখগুলোর হাসিগুলো আমাদের সবার মন ভরিয়ে দিল। ভাব জমাতে সময় লাগল না। তাদের সমস্যাগুলো জানতে চাইলাম। তারা খেলতে খেলতেই বলল। তবে রোগের কথা ভালোভাবে বলতে পারল না। ফলে তাদের মা-বাবার সঙ্গে আলাপ করতে গেলাম। তাদের সঙ্গে পরিচিত হলাম। এরপর চিকিৎসা দেওয়া শুরু হলো।

এসব শিশুর বেশিরভাগই কৃমি রোগে আক্রান্ত। কারও কারও পেট খারাপ। ফলে তাদের সেসব রোগের ওষুধ ও স্যালাইন দিতে হলো। আরও খেয়াল করে দেখলাম, পুরো বস্তির দুই-তৃতীয়াংশ শিশুই অপুষ্টিজনিত নানা রোগে আক্রান্ত। পাতলা পায়খানা তাদের নিত্যসঙ্গী, খোস-পাচড়া লেগেই আছে নোংরা জীবনের জন্য। এই শিশুদের, আমাদের দেশের এই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনগুলো বাঁচানোর জন্য ওষুধের প্রয়োজন। ফলে ব্যক্তিগত উদ্যোগ থেকে সামষ্টিক উদ্যোগের দিকে গেলাম। আমি আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেছি। সেই হাসপাতালের ও আয়েশা মেমোরিয়ালের চিকিৎসক, বন্ধু এবং ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। তারা যথেষ্ট করেছে। নিজেদের কাছে থাকা ওষুধগুলো তো আমাদের দিয়েছেই, পাশাপাশি অন্যদের কাছ থেকেও ওষুধ সংগ্রহ করে দিয়েছে। উদ্যোগের কথা শুনে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, হেলথ কেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস এবং ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের ওষুধ বিক্রয় প্রতিনিধিদের কাছ থেকে যথেষ্ট সহযোগিতা পেয়েছি। ফলে গোড়ান বস্তির একেবারেই গরিব শিশুদের মধ্যে অন্তত ২শ শিশুকে আমরা তাদের রোগগুলোর চিকিৎসা দিতে পারলাম। তাদের রোগ নির্মূলের জন্য ওষুধও হাতে তুলে দিলাম। তবে আমাদের সবাই যেহেতু লেখাপড়া জানি, ফলে শিক্ষার মূল্য আমরা জানি। অবাক হয়ে খেয়াল করে দেখেছি, এই শিশু-কিশোরদের প্রায় সবারই অক্ষরজ্ঞানও নেই। ফলে তাদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করতে হলো। বস্তির মধ্যে একটি টিনশেড বাড়িতে ‘জাস্টিস ফর হিউম্যানিটি’ লেখাপড়ার ব্যবস্থা করতে এগিয়ে এলো। এই সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবী ইকবাল, ইকরাম, রাসেল, অ্যানি তাদের পড়ানোর জন্য এক বাক্যে রাজি হয়ে গেল। তারাই ওদের শিক্ষক হলো। টানা একটি বছর স্কুলটি চলেছে। এরপর তাদের মধ্যে লেখাপড়ায় উৎসাহী কয়েকজন ছাত্রছাত্রীকে আমরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দিলাম।

শুরু থেকে আমাদের এই উদ্যোগগুলোর কথা আশপাশের মানুষ, বন্ধুবান্ধব ও সমাজের অন্যদের জানানোর জন্য ফেইসবুকে শেয়ার করতাম। ফলে আমাদের কার্যক্রমের পর আরও কয়েকজন মানুষ আরও কটি শিশুর লেখাপড়ার দায়িত্ব নিলেন। শুনলে খুশি হবেন, সেই শিশুগুলো এখনো জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হচ্ছে। আগের ডোনার তাকে লেখাপড়া না করালে নতুন কোনো ডোনার এগিয়ে এসে তাদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করছেন। লেখাপড়া কারও থেমে থাকছে না। তবে এই প্রসঙ্গে আমার সহকর্মী চিকিৎসক রাহাত সারোয়ার ও সিটি ব্যাংক লিমিটেডের কর্মকর্তা ফারহানা হাসনীনের কথা আলাদা করে বলতেই হয়। তারা নিয়মিতভাবে সহযোগিতা করছেন বলে শিশুগুলো পড়তে পারছে। আমাদের এই ছেলেমেয়েরা কোন কোন রোগে ভুগছে সেগুলোর চিকিৎসা প্রদানের জন্য আছে ‘ফিডব্যাক টিম’। এটি আমাদেরই আরেকটি উদ্যোগ। এই টিম শিশুদের লেখাপড়া করানোর জন্য দেওয়া টাকা-পয়সা ঠিক খাতে ব্যয় হচ্ছে কি না সেই খোঁজও রাখছেন, সে কাজ তদারকি করছেন। পাশাপাশি তাদের মা-বাবা ও আশপাশের মানুষকে এই দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করে তুলছেন। গোড়ানের বাইরে ঢাকার মিরপুরের দুয়ারীপাড়া বস্তিতে আমরা তিনটি দলে শিশু-কিশোরদের জন্য ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প করেছি। তাছাড়াও এই কাজ আমরা করেছি মিরপুরের ১২ নম্বর বস্তিতে। সে সব জায়গাতেও শিশুদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। আমাদের উদ্দেশ্য সব জায়গাতেই এক ছিলÑ গরিব শিশুদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ব্যবস্থা করা।

কাজগুলো আমরা নিজেদের উদ্যোগে করলেও বিভিন্ন পেশার মানুষ, ফেইসবুকে অ্যাকটিভ সমাজের নানা শ্রেণির মানুষের সাহায্য পেয়েছি। তারা শিশুদের লেখাপড়ার দায়িত্ব নিয়েছেন, অনেকে পোশাকের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। একজন অচেনা লোক একবার আধা ট্রাক কাপড় পাঠিয়েছেন। তবে তিনি নিজের নামটি কোনোদিন বলেননি। আমরা চিকিৎসকদের কাছ থেকে জরুরি ওষুধ ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সামগ্রীও পেয়েছি। এই কাজগুলো করতে করতে আমরা অনেকের ভালোবাসা পেয়েছি। আরও অনেকে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। এই প্রসঙ্গে হাফিজুর রহমানের ‘সালামুন’ নামের সংগঠনটির কথা বলব। তাদের সঙ্গে মিলে ঢাকার গাজীপুর, খুলনা ও দিনাজপুরে আমরা সেসব এলাকার অসহায় রোগী ও শিশুদের বিনামূল্যে ও বিনা খরচে চিকিৎসাসেবা দিয়েছি। অনেকের কাছ থেকে বিকাশে আর্থিক সাহায্য পেয়েছি। তারা আমাদের কাছে টাকা পাঠিয়ে বলেছেন, এই টাকাগুলো কোনো দুস্থ রোগীর চিকিৎসা খরচে ব্যয় করবেন। কেউ কেউ লিখেছেন, কোনো গরিব শিশুর লেখাপড়ার খরচ হিসেবে টাকাগুলো দিলাম। আমরা সেই কাজে এই অর্থ ব্যয় করে দাতাকে তার উদ্দেশ্য পূরণ হয়েছে বলে জানিয়েছি। অনেক মেডিকেল ক্যাম্প যে আমরা করতে পেরেছি, তার জন্য অবশ্যই ঢাকা, স্যার সলিমুল্লাহ, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, সিলেট, দিনাজপুর, আর্মড ফোর্সেস এবং ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের ধন্যবাদ জানাব। কারণ তারা সেসব ক্যাম্পে লেখাপড়ার অবসরে গিয়েছে।

চিকিৎসা ও লেখাপড়ার সেবা দেওয়ার বাইরে আরও কাজ করেছি আমরা। ২০১৭ সালে দিনাজপুরে যে ভয়াবহ বন্যা হয়েছে, যেখানে লাখখানেক মানুষ পানিবন্দি ছিলেন, তাদের জন্য রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে আমরা আর্থিক সাহায্য সংগ্রহ করেছি। এরপর দিনাজপুর সরকারি সিটি কলেজের প্রিন্সিপাল অধ্যাপক মোজাম্মেল বিশ্বাস ও দিনাজপুর আদর্শ কলেজের অধ্যাপক তপন চক্রবর্তীর সাহায্যে এই জেলার বিরল উপজেলার গ্রামে গ্রামে ঘুরে বন্যার মধ্যেই ১০ দিন ধরে চারশর বেশি মানুষকে চিকিৎসাসেবা দিয়েছি। ৬০টি পরিবারের মধ্যে খাবার সংগ্রহের জন্য নগদ টাকা দিয়েছি। আমাদের সঙ্গে এই কার্যক্রমে ছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ, আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজ এবং ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের শিবিরগুলোতেও কাজ করেছি। তম্বরু সীমান্ত ফাঁড়ি, কুতুপালং, থাইংখালী, পালংখালী ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বিজিবির সাহায্যে মাসজুড়ে অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা করেছি। রোহিঙ্গা নারীদের মধ্যেই বেশি কাজ করেছি। প্রসূতির সেবা, স্বাভাবিক সন্তান জন্মদান, তাদের শরীরে কাটাছেঁড়াগুলোর চিকিৎসা দিয়েছি। ছোটখাটো সার্জারিও করতে হয়েছে। ওষুধ বিলিয়েছি। এই কার্যক্রমের আগে মোবাইল সেবাদাতা কোম্পানি রবি’র কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়া তার সহকর্মীদের নিয়ে ফেইসবুকে প্রচার চালিয়ে আমাদের সাহায্য করেছেন। এই শীতেও আমরা ছিন্নমূলদের মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে পুরনো পোশাক বিলিয়েছি।

আমাদের ভবিষ্যত লক্ষ্য হলো, আমরা নারী মৃতদেহের ময়নাতদন্তের জন্য ফিমেল মর্গ অ্যাটেনডেন্ট গড়ে তুলতে চাই। সে জন্য বাছাই করা মেয়েদের প্রশিক্ষণ দেব। তাছাড়াও গ্রামগঞ্জের শিশু ও কিশোরী মেয়েদের নিরাপত্তার প্রশিক্ষণ দেব। অনাথ ও এতিম শিশুদের ভালোভাবে বেঁচে থাকার সুবিধার জন্য দত্তক নেওয়ার সহজ পদ্ধতি তৈরিতে কাজ করব। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের নিয়েও কাজ করতে চাই। যাতে তারা সমাজে স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকতে পারেন। এসব কাজের বাইরে আমি লেখালেখি করি। আমার ‘কল্পপ্রকাশ’ নামে প্রকাশনা সংস্থা আছে।  ছয়টি বই লিখেছি। সর্বশেষ বইমেলায় এসেছে আধুনিক যুদ্ধ থ্রিলার ‘স্বপ্নপ্রহর’।

   
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত