সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ৩ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

একটি সর্বব্যাপী ব্যাধির নাম মোসাহেবি

আপডেট : ০২ মার্চ ২০১৯, ১০:৫১ পিএম

কথায় বলে, যেখানে আছেন সাহেব, সেখানে রয়েছেন মোসাহেব। সাহেব কেন আছেন? সাহেব আছেন দেশ চালাতে, সাহেব আছেন এস্টেট চালাতে। সাহেব আছেন কারখানায়, সাহেব আছেন অর্চনায়। সাহেব আছেন ক্ষেত-খামারে, সাহেব আছেন তালপুকুরে। জুতা সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ, সব জায়গায়ই যেন সাহেবের হাট। বেড়ে গেলে কারবার, সাহেবের হয় জয়জয়কার। কারণ, বড় কারবারে সাহেব ছাড়া না আসে কোনো গতি তাইতো সেখানে মোসাহেবও রয়েছেন অতি।

মোসাহেব ছাড়া সাহেব কাজ করতে আনন্দ পান না, স্বস্তিবোধ করেন না, অনুপ্রেরণা পান না, এমনকি জীবনীশক্তি পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেন। ক্ষমতার সঙ্গে যেমন সাহেবের, তেমনি অনুগ্রহ প্রাপ্তির আকাক্সক্ষার সঙ্গে রয়েছে মোসাহেবের গভীর সম্পর্ক। যে যত বেশি ক্ষমতাবান, তার তত বেশি মোসাহেবের সমাহার। তাদের পদবিরও রয়েছে বিপুল ভাণ্ডার। চাটুকার, স্তাবক, খয়ের খাঁ, তোষামোদকারী, পদলেহনকারী, পা-চাটা লোক, চামচা, ধামাধরা ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে এসবের কোনো অভিধাতে তারা আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকÑ কোনোভাবেই  অভিষিক্ত হতে পছন্দ করেন না। এদের না আছে আত্মমর্যাদা বোধ, না আছে বিবেক, না আছে মেরুদণ্ড, না আছে জ্ঞানকাণ্ড। আড়ালে যাই ভাবুক, সামনে প্রভুই ধ্যান, প্রভুই জ্ঞান, আর যাবতীয় দণ্ডমুণ্ডের কর্তা; তার চেয়ে জ্ঞানী, ক্ষমতাধর, হৃদয়বান মানুষ পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। তবে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে এদের প্রভুবদলের দক্ষতা অসাধারণ। গুণগ্রাহী ও সমঝদাররা যেমন নিমজ্জিত হন স্বার্থহীন প্রশংসাবাণী বর্ষণ আর প্রকৃত রস আস্বাদনে, তেমনি এরা উদগ্রীব থাকেন ব্যক্তিত্বহীন তোষণ-ভজন আর অসমাঙ্গ প্রাপ্তিযোগে। কি জনসমক্ষে, কি একান্ত নিভৃতে, মাত্রাতিরিক্ত কৃত্রিম ভক্তি প্রদর্শন ও প্রশ্নহীন প্রশংসার অতিশয়োক্তিই তাদের একমাত্র হাতিয়ার। যেখানে সরাসরি চাটুকারিতা অচল, সেখানে পরোক্ষ স্তাবকতা কার্যকর। ‘হুজুরের ছেলের চেহারার কী রোশনাই’, ‘বসের বাবা ছিলেন আদর্শের পূজারী’, ‘নেতার শ্বশুর ছিলেন ব্রিটিশ আমলের মেট্রিক পাম’Ñ এ জাতীয় সুমিষ্ট বাক্যমালা পরোক্ষ মোসাহেবির নমুনা।

মোসাহেবির পারঙ্গমতা ও অসমাঙ্গ প্রাপ্তিযোগ সম্পর্কে ছাত্রাবস্থায় ক্যাপ্টেন সাত্তারের একটি গল্প পড়েছিলাম যেখানে আইয়ুব খান ও তার  খয়ের খাঁ মোনায়েম খান ছিলেন প্রধান কুশীলব। মোনায়েম খান  নাকি তার পাঠান প্রভুর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার সময় শুরুতেই জানিয়ে দিতেন : ‘স্যার আমি কিন্তু দাঁড়িয়ে কথা বলছি।’ আইয়ুবের ‘উন্নয়নের দশক’ উদযাপনের সময় থেকে পাকিস্তানে গণঅসন্তোষ শুরু হয়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানেও সে উত্তাপের প্রসারণ ঘটে। আগুন নেভাতে মোনায়েম খানের পরিবর্তে একজন যোগ্য গভর্নরের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন আইয়ুব। কিন্তু সদ্য পতœীবিয়োগে ভারাক্রান্ত মোনায়েম খানের কষ্টের বোঝা না বাড়িয়ে তিনি অপেক্ষার নীতি অবলম্বন করেন। কিছুদিন পর আন্দোলনের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় যেই নতুন গভর্নর নিয়োগ দিতে যাবেন, এমন সময় সংবাদপত্রে খবর বেরোয় যে, মোনায়েম দ্বিতীয় ভার্যা গ্রহণ করেছেন। বুড়ো বয়সের এই আনন্দময় মুহূর্তে চাকরিচ্যুতি ঘটলে ভক্তের মনের অবস্থা কী হবে, তা ভেবে এবারও তিনি পরিবর্তন থেকে হাত গুটিয়ে নেন। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের সময় অস্তিত্ব রক্ষায় মন শক্ত করে প্রদেশের জন্য নতুন প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেন। খবরটা মোনায়েমের কান অবধি পৌঁছে যায়। তিনি প্রথমে বিষয়টা নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলার চেষ্টা করেন। কিন্তু অপর প্রান্ত থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে তিনি দ্রুতলয়ে সশরীরে ইসলামাবাদ পৌঁছে যান। অকর্মণ্য ভক্তকে দেখা দিলে অপ্রীতিকর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন বিঘিœত হতে পারে চিন্তা করে প্রভু দর্শনদানে অপারগতা প্রকাশ করেন। কিন্তু মোনায়েম খান নাছোড়বান্দা। সন্ধ্যায় অফিস ছেড়ে সবাই চলে গেছেন, কিন্তু মোনায়েম খান তখনো রয়ে গেছেন, এ কথা জানতে পেরে প্রভুর মনে দয়ার সঞ্চার হয়। তিনি ভাবেন, শেষ বারের মতো একটু দেখা দিলে কোনো ক্ষতি নেই; বরং পারস্পরিক ক্ষমা প্রার্থনা আর কল্যাণ কামনার সুযোগ পাওয়া যাবে। তিনি অস্তগামী সূর্যকে শেষ বারের মতো তার নির্জন কামরায় ডেকে পাঠান। কোলাকুলির পর্ব চলার সময় আইয়ুব মোনায়েমের কোটের ডান পকেটে একটি শক্ত বস্তুর উপস্থিতি অনুভব করেন। তার মনে দুশ্চিন্তার দোলাচল শুরু হয়; নিশ্চয়ই মোনায়েম রাগের বশবর্তী হয়ে পিস্তল নিয়ে এসেছেন তাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে, শেষবেলা কামরা জনশূন্য হওয়ার প্রতীক্ষায় তিনি ঘাপটি পেতে বসেছিলেন এতক্ষণ। ‘আপনি আমাকে চাকরিচ্যুতই করেন বা মেরেই ফেলেন, আপনি সব সময় আমার নমস্য’ মোনায়েমের এ জাতীয় স্তুতিবাক্য বর্ষণের সঙ্গে সঙ্গে আইয়ুব তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন। ঘড় ঘড় করে বলে চলেন তিনি একজন জাঁদরেল আর্মি অফিসার। তাকে মারা মোনায়েমের মতো বাঙ্গালের কর্ম নয়। মোনায়েমের চালাকি অগ্রভাগে ধরে ফেলতে পারায় হুংকার ছেড়ে তিনি নির্দেশ দেন অস্ত্রটা বুক পকেট থেকে বের করে সামনের টেবিলে সমর্পণ করতে। কম্পমান মোনায়েম বুক পকেট থেকে যেটা বের করলেন, সেটা দেখে আইয়ুবের চক্ষু ছানাবড়া। সেটা কোনো অস্ত্র নয়, সেটা হলো তার সারা জীবনের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিবৃত্তিক ফসল, তার লেখা অমূল্য গ্রন্থ : ঋৎরবহফং ঘড়ঃ গধংঃবৎং। এরপর আইয়ুবের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে আর সময় লাগেনি। তার মনে এরূপ তত্ত্বের উদয় হয় যে, চাকরি গেলে তারই যাবে, কিন্তু এরূপ একনিষ্ঠ ভক্তের চাকরি যেতে পারে না।

কাজী নজরুল ইসলাম সাহেব আর মোসাহেবদের নিয়ে তো আস্ত একটি কবিতাই লিখে ফেলেন। তিনি কবিতার শুরুটা করেছিলেন তাদের কর্মকাণ্ড দিয়ে : “সাহেব কহেন, চমৎকার। সে চমৎকার।” মোসাহেব বলে, “চমৎকার। সে হতেই হবে যে। হুজুরের মতে অমত কার?” আর শেষ করেছেন এদের চরিত্র চিত্রণের মাধ্যমে : “সাহেব কহেন, জাগিয়া দেখিনু, জুটিয়াছে যত হনুমান আর অপদেব।” “হুজুরের চোখ, যাবে কোথা বাবা? প্রণমিয়া কয় মোসাহেব।”

তবে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর অবদান এক্ষেত্রে অসাধারণ। তিনি  শুধু বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শন ‘চর্যাপদ’ আবিষ্কার করে যতটা না সম্মানিত হয়েছেন, তার চেয়ে ঢের বেশি পরিচিতি পেয়েছেন মোসাহেবির প্রধান কলা তৈল বস্তুটাকে সামনে নিয়ে আসার জন্য। তিনি যা লিখেছেন তার সারসংক্ষেপ হলো তৈল যে কী পদার্থ তা সংস্কৃত পণ্ডিতরা কতক বুঝেছিলেন। তাদের মতে তৈলের অপর নাম স্নেহÑ বাস্তবিকও স্নেহ ও তৈল একই পদার্থ, আমি তোমায় স্নেহ করি, তুমি আমায় স্নেহ করো, অর্থাৎ আমরা পরস্পরকে তৈল দিয়ে থাকি। যা স্নিগ্ধ বা ঠাণ্ডা করে তার নাম স্নেহ। তৈলের মতো ঠাণ্ডা করতে আর কিসে পারে। তৈলের কার্যকারিতা সম্পর্কে তিনি বলেছেন যে, তৈলের মহিমা অতি অপরূপ, তৈল নাহলে জগতের কোনো কার্য সিদ্ধ হয় না। তৈল না হলে কল চলে না, প্রদীপ জ্বলে না, ব্যঞ্জন সুস্বাদু হয় না, চেহারা খোলে না, হাজার গুণ থাকুক তার পরিচয় পাওয়া যায় না। যে তৈল দিতে পারবে তার বিদ্যা না থাকলেও সে প্রফেসর হতে পারে, আহাম্মক হলেও ম্যাজিস্ট্রেট হতে পারে, সাহস না থাকলেও সেনাপতি হতে পারে এবং দুর্লভরাম হয়েও উড়িষ্যার গভর্নর হতে পারে। বঙ্গবাসীদের জন্য তৈলের গুরুত্ব সম্পর্কে তিনি যে ছবক দিয়েছেন তা হলোÑ বাঙ্গালীর বল নেই, বিক্রম নেই, বিদ্যাও নেই, বুদ্ধিও নেই। সুতরাং বাঙ্গালীর একমাত্র ভরসা তৈলÑ। কারণ, এক তৈলে চাকা ঘোরে আরেক তৈলে মন ফেরে।

বাঙ্গালী মনে হয় তার উপদেশের মর্মার্থ ভালোভাবে বুঝতে পেরেছে। তাইতো সব জায়গায় সে তৈলচর্চা করে কর্ম হাসিল করতে প্রয়াসী হয়। কিন্তু এতে বানরের গলায় মুক্তার মালা শোভা পাওয়ার ক্ষেত্র বেড়ে যায়, অপ্রিয় সত্য সামনে আনার পরিবেশ তিরোহিত হয় এবং উপযুক্ত লোক যথাস্থানে অভিষিক্ত করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে শুধু মোসাহেব ছাড়া দেশ, সমাজ, সম্প্রদায়, প্রতিষ্ঠান এমনকি সাহেব নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত হন।

এ অচলায়তন থেকে বের হওয়া সহজ কথা নয়। কারণ, বিষয়টি শুধু শুদ্ধির হলে কোনো কথা ছিল না, বিষয়টি আসলে আত্মশুদ্ধির। কবিতায় ‘নিন্দুকেরে বাসি আমি সবার চেয়ে ভালো’ বলা হলেও বাস্তবে মৃদু সমালোচনা হজম করাও বেশ কঠিন। জনসমক্ষে বস হিসেবে সমালোচনা মেনে নেওয়া তো চপেটাঘাত হজম করার শামিল। এক সওদাগরি প্রতিষ্ঠানে বছর বছর লোকসান হচ্ছিল। কিন্তু কারণ সম্পর্কে কেউ কিছু বলতে পারছিল না। প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী জ্যেষ্ঠ-কনিষ্ঠ সব কর্মকর্তাকে নিয়ে একাধিক বার  উঠান বৈঠক করেছেন, কনফারেন্স করেছেন। কিন্তু কিছুতেই রোগ নির্ণয় করা যাচ্ছিল না। এ অবস্থায় একদিন প্রধান নির্বাহী তার কামরায় কতিপয় জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে তাদের মূর্খতার জন্য যাচ্ছেতাই গালিগালাজ করছিলেন আর ইংরেজিতে বারবার প্রশ্ন করছিলেন ‘Why can’t you say where the bottleneck is ? চাকরিতে নতুন নিয়োগ পাওয়া এক সোজা-সরল তরুণ কর্মকর্তা সিনিয়রদের এই মামুলি অজ্ঞতায় বিস্মিত হয়ে একটা পানির বোতল হাতে নিয়ে তাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসেন। তিনি হাত বাড়িয়ে পানির বোতলটার প্রতি বড় কর্তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে উত্তর দেন ‘Sir, please see, the neck of any bottle is always at the top.’ কথাটি ছিল বাস্তব ও রূপকÑ উভয় অর্থে সঠিক। কিন্তু আহাম্মকি আর বেফাঁস কথা বলার দায়ে পরদিন থেকে আর ঐ তরুণকে অফিসে আসতে হয়নি।

ষোড়শ শতাব্দীর গোড়ার দিকে লিখিত ম্যাকিয়াভ্যালি তার বিখ্যাত ঞযব চৎরহপব গ্রন্থে এ বিষয়ের ওপর কিছু আলোকপাত করেছেন। তার এ গ্রন্থটি রাজকুমার অর্থাৎ শাসনকর্তা কেন্দ্রিক হওয়ায় এসব ক্ষেত্রে রাজকুমারের করণীয় বর্জনীয় সম্পর্কে উপদেশ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তারা নিজেদের রাজকুমারের কাছাকাছি কল্পনা করে তার পরামর্শ কাজে লাগানো যায় কি না, তা বিবেচনা করে দেখতে পারেন।

অভিষেক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজকুমারের দরবারে মানুষ পঙ্গপালের মতো হুমড়ি খেয়ে পড়ে তার নৈকট্য লাভ ও  প্রাপ্তিযোগের আশায়। রাজপুত্রের মন ভোলানোর জন্য স্তাবকেরা সত্য-মিথ্যায় পরিপূর্ণ স্তুতিবাক্য আর উপহারের ডালা নিয়ে হাজির হন। ম্যাকিয়াভ্যালি নিজেও শাসনকর্তার সান্নিধ্য লাভের জন্য অনুরূপ কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিলেন। এদের চেনা এবং তাদের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র রক্ষাকবচ হলো প্রথম রাতেই বিড়াল মেরে মানুষকে জানান দেওয়া যে, তিনি যে কোনো অপ্রিয় সত্যের মুখোমুখি হতে এবং প্রয়োজনীয় সংশোধন আনতে পিছপা হবেন না। কিন্তু সবাই যদি রাজকুমারকে প্রিয়- অপ্রিয় সব সত্য কথা বলা শুরু করে, তবে তিনি সম্মান ও নিয়ন্ত্রণ হারাবেন। এজন্য একজন কুশলী রাজকুমারের উচিত মধ্যপন্থা অবলম্বন করা; জ্ঞানী, বিচক্ষণ ও বিশ্বস্ত লোকদের তার রাজসভার জন্য নির্বাচন করা এবং শুধু তাদেরই সত্য বলার স্বাধীনতা দেওয়া, এবং সেটাও শুধুমাত্র সেই সব বিষয়ে, যেগুলোর ওপর তিনি জানতে চাইবেন, অন্য কোনো বিষয়ে নয়। এখানেই শেষ না; বিষয়গুলো সম্পর্কে নানাভাবে প্রশ্ন করে ও ধৈর্য ধরে তাদের উত্তর শ্রবণ করে পরিষ্কার ধারণা নিতে হবে এবং তার ভিত্তিতে মনস্থির করে নিজেকেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। সভাসদের সঙ্গে তার সম্পর্ক এমন হওয়া প্রয়োজন যাতে তারা বুঝতে পারেন যে, যত মন খুলে তারা কথা বলতে পারবেন, তত বেশি গ্রহণযোগ্য হবেন। কোনো তথ্য-উপাত্ত গোপন করবেন না। এরূপ হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশ প্রকৃত অবস্থার চিত্র ফুটিয়ে তোলার জন্য সহায়ক। জিজ্ঞাসিত কোনো বিষয়ে প্রকৃত তথ্য আড়ালকারীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করাও অপরিহার্য। এর বাইরে অন্য কোনো বিষয়ে আর কারও পরামর্শ তার কর্ণপাত করা উচিত নয়; কেউ যাতে অযাচিতভাবে তাকে পরামর্শ দিতে না আসেন, তাও নিশ্চিত করা দরকার। আলোচনা-পর্যালোচনার পর একবার কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেলে তা বাস্তবায়নে অনড় থাকতে হবে। এটা না করে বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহল ও ব্যক্তির স্বার্থ-প্রভাবিত সাংঘর্ষিক পরামর্শে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়লে তার সম্মানহানি ঘটবে এবং পরিণতি ধ্বংসাত্মক হবে। এক্ষেত্রে অভ্রান্ত সূত্র হলো এই যে, যে রাজকুমার নিজে বিচক্ষণ না, তাকে কখনো শুদ্ধমন্ত্রে দীক্ষা দেওয়া সম্ভব না। তিনি কোনো বিচক্ষণ ব্যক্তির ছায়াতল থেকে শাসনকার্য পরিচালনা করলে কিছুদিন ভালো চলবে ঠিকই। কিন্তু এ ব্যবস্থা বেশি দিন টেকসই হবে না; কারণ, দণ্ডমুণ্ডের কর্তা ঐ বিচক্ষণ ব্যক্তিই অল্প দিনের মধ্যে রাজকুমারকে হটিয়ে রাজদণ্ড নিজের হাতে তুলে নেবেন।

এ জন্য রাজসভার সভাসদ নির্বাচন রাজকুমারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। রাজকুমারের বিচক্ষণতার ওপর এ কাজের ভালো-মন্দ নির্ভর করে। তার চারপাশে কী ধরনের লোকের বিচরণ, তা দেখে মানুষ রাজকুমারের বুদ্ধিমত্তা ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা গড়ে তোলে। সভাসদরা দক্ষ, যোগ্য, বিচক্ষণ আর বিশ্বস্ত হলে রাজকুমারকেও তারা প্রাজ্ঞ বিবেচনা করে। সাধারত তিন ধরনের বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায়: প্রথম শ্রেণির বুদ্ধিমত্তা নিজ থেকেই সবকিছু ভালো বুঝতে পারে। দ্বিতীয় শ্রেণিরটা নিজে না পারলেও, অন্যের ভালো বোঝার বিষয়টা ধরতে পারে। তৃতীয়টা এমন যে, সে নিজেও ভালো বোঝে না, অন্যের বোঝার বিষয়টাও ধরতে পারে না। প্রথমটা চমৎকার, দ্বিতীয়টাও চলনসই, কিন্তু তৃতীয়টা একবারেই বেহুদা।

কোনো রাজপুত্রের প্রথম কিংবা দ্বিতীয় শ্রেণির বুদ্ধিমত্তাই তার সভাসদদের মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট। এখানে শুধু একটি বিষয়ের দিকে নজর দিলেই চলে। আর তা হলোÑ সভাসদ নিজের জন্য বেশি, না রাজকার্যের জন্য বেশি চিন্তা করেন। যে সভাসদ সব কাজে নিজের লাভক্ষতির চিন্তা করেন, তাকে কখনো বিশ্বাস করা যায় না। তাকে দিয়ে রাজ্য বা রাজকুমারÑ কারোরই কোনো মঙ্গল হতে পারে না। যে সব সময় নিজের পরিবর্তে রাজা আর রাজকার্যের চিন্তায় মগ্ন থাকবেন, রাজকুমারকে হালনাগাদ অবস্থা অবহিত রাখবেন, তার সেবায় আত্মোৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকবেন, বিনিময়ে রাজকুমার তাকে উপযুক্ত সম্মান ও সচ্ছলতা দেবেন, পারস্পরিক আত্মিক বন্ধনে আবদ্ধ করবেন, দায়িত্ব ও সম্মান ভাগাভাগি করে নেবেন। এভাবে পারস্পরিক নির্ভরতা ও আস্থার সম্পর্ক স্থাপিত হবে যেখানে তোষামোদি ও ভাঁড়ামির কোনো উপযোগিতা ও প্রয়োজনীয়তা থাকবে না। অন্যথায় উভয়ের জন্য পরিস্থিতি হবে ক্ষতিকর।

পাঠক, অনুগ্রহ করে বিচার করে দেখুন ম্যাকিয়াভ্যালির দেওয়া তত্ত্ব আর ওপরে বর্ণিত সওদাগরি প্রতিষ্ঠানের আনাড়ি তরুণ কর্মীটির সাহসী উত্তরের মর্মার্থে কী অদ্ভুত মিল। কিন্তু তার যে চাকরি চলে গিয়েছিল, তাতে তার দোষ কী ছিল? তার দোষ ছিল সে রবীন্দ্রনাথ পড়েনি। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন ‘সহজ কথা বলতে আমায় কহ যে, সহজ কথা যায় না বলা সহজে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত