মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪, ১১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ডাকসু নির্বাচনে সবার সমান সুযোগ চাই

আপডেট : ০২ মার্চ ২০১৯, ১০:৫৩ পিএম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অবদানকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। যে কোনো সংকটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের ভিত্তি ছিল ডাকসু। সরল অথচ একান্ত সত্য কথা হলো, ডাকসু ছিল শিক্ষার্থীদের প্রাণের সংগঠন।  রাজনীতিতে এ সংগঠনের অবদান ’৫২, ’৬২, ’৬৬, ’৬৯, ’৭১, ’৯০- সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ।

এক সময় দেশের দ্বিতীয় পার্লামেন্ট হিসেবে অভিহিত করা হতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদকে। কিন্তু শাসক দলের সদিচ্ছার অভাবে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়নি দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে।  সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯০ সালে। তার আগে সামরিক শাসকদের আমলেও ডাকসুসহ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের নজির রয়েছে। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি নাজুক একটি অধ্যায়।

তবে আশার কথা হলো, আদালতের নির্দেশনায় অবশেষে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগামী ১১ মার্চ। এরই মধ্যে তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ, বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল, বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোর জোট প্রগতিশীল ছাত্রজোট, কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতাদের সংগঠন সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদসহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও জোটের পক্ষ থেকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। প্রশাসনের সঙ্গে মতপার্থক্য সত্ত্বেও সব ছাত্রসংগঠনই যে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে তা ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক। এখন সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন করার দায়িত্ব যেমন বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষের রয়েছে, তেমনি নির্বাচনী পরিবেশ শান্তিপূর্ণ ও অবাধ করার দায়িত্ব ছাত্র সংগঠনগুলোর ওপর, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের ওপর বর্তায়। দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ডাকসুর নির্বাচনে সহসভাপতি (ভিপি) প্রার্থী ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন দেয়ালে শোভনের জন্য ভোট চেয়ে রঙিন পোস্টার সাঁটানো হয়েছে। যা নির্বাচনের আচরণবিধিবহির্ভূত। এছাড়া ছাত্রলীগের প্যানেলের বাইরে যারা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করছেন, তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহারে চাপ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সংগঠনটির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে।  এই ঘটনাগুলো মোটেই কাম্য নয়।

ক্যাম্পাসে বর্তমানে যে পরিবেশে সব ছাত্রসংগঠন প্রচার চালাচ্ছে, এই ধরনের সহাবস্থানের পরিবেশ সবসময় প্রত্যাশিত। কিন্তু ছাত্রদলের অভিযোগ, ছাত্রলীগ তাদের করুণাবশত ক্যাম্পাসে আসতে বাধা না দেওয়ায় তারা ক্যাম্পাসে আসতে পারছে। অন্যরাও সহাবস্থানের এই পরিবেশের স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাদের এই ধরনের আশঙ্কা সত্যি হলে তা দুর্ভাগ্যজনক। সংশ্লিষ্ট সকলকে মনে রাখতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান সৃষ্টি ও চর্চার জায়গা, পেশিশক্তি প্রদর্শনের জায়গা নয়। আর সে জন্য শিক্ষাঙ্গনে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

পাশাপাশি, ক্যাম্পাস বা হলে কোনো ছাত্রসংগঠনের দখলদারি বজায় রেখে সুষ্ঠুভাবে ডাকসু বা হল সংসদের নির্বাচন সম্ভব নয়। নির্বাচনের আগেই সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী সব ছাত্রসংগঠনের সমঅধিকার ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। দলমত-নির্বিশেষে সবাই যাতে অবাধে নির্বাচনী প্রচার চালাতে পারে, সেই নিশ্চয়তা কর্র্তৃপক্ষকে দিতে হবে। হলগুলোতে ছাত্রলীগ গণরুম ও গেস্টরুম সংস্কৃতির নামে যে জবরদস্তি চালাচ্ছে, সে-সবও বন্ধ করা জরুরি।  নির্বাচনের আগে ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ ও ভয়ভীতিমুক্ত পরিবেশ অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে এবং নির্বাচনের পরেও তা অব্যাহত রাখতে হবে।

অধিকাংশ হলের প্রাধ্যক্ষ ও আবাসিক শিক্ষক সরকার-সমর্থক নীল দলের সদস্য। এ অবস্থায় সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে বিরোধী ছাত্রসংগঠনগুলোর সংশয় অমূলক নয়। অনেক দলনিরেপক্ষ শিক্ষক বলেছেন, শিক্ষকরা সাদা ও নীল দলে বিভক্ত থাকলেও হলগুলোর প্রশাসনিক দায়িত্বে শুধু নীল দলের শিক্ষকরা আছেন। প্রশাসন শুধু একটি ছাত্রসংগঠনের কথা শুনছে। এমনটি কেন হবে? শিক্ষকদের কাছে সব ছাত্রসংগঠনেরই সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত, সবাই তাদের শিক্ষার্থী। নীতিগতভাবে কারও প্রতি তারা পক্ষপাত বা বৈষম্য দেখাতে পারেন না।

দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার অনুকূলে থাকায় ডাকসু নির্বাচনে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন অবৈধ প্রভাব খাটাতে পারে বলেই আশঙ্কা করছেন ক্যাম্পাসের অপরাপর ছাত্র সংগঠনের নেতারা। তাই একটি সুন্দর নির্বাচনের পূর্বশর্ত হিসেবে কর্র্তৃপক্ষকে অবশ্যই তাদের উদ্বেগ-শংকা দূরীকরণে কাজ করতে হবে। সব অনিশ্চয়তা কাটিয়ে একটি সুন্দর নির্বাচন হোক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসুক গণতান্ত্রিক পরিবেশ। ডাকসু নির্বাচনের পর অন্য ক্যাম্পাসগুলোর ছাত্র সংসদেও ফিরে আসুক নির্বাচিত নেতৃত্বÑ সেটাই আমরা প্রত্যাশা করি।

   
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত