বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৫ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ফাঁকা মাঠের ফাঁদ ছাত্রলীগের

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০১৯, ০২:৪৬ এএম

দীর্ঘ ২৮ বছর পর আগামী ১১ মার্চ হতে যাচ্ছে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন। অভিযোগ উঠেছে, হল সংসদের ভিপি, জিএস, এজিএসসহ বিভিন্ন পদের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করার জন্য চাপ দিচ্ছে ছাত্রলীগ। একই ধরনের চাপ দেওয়া হচ্ছে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের প্রার্থীদেরও। চাপে পড়ে বিএনপির ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের নেতারা কোনো কোনো হল সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্রও জমা দিতে পারেননি। যেখানে শক্ত প্রার্থী ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরাই। এখন হলে হলে যে প্রচার চলছে, তা শুধু ছাত্রলীগ নেতারাই করছেন। এই কৌশলের মাধ্যমে ডাকসু ও হল সংসদের ভোটের মাঠ একপ্রকার ফাঁকাই করতে চাইছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠনটি।

এরই মধ্যে এই কৌশলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি হল সংসদের বিভিন্ন পদে ৩৫ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন, যারা সবাই ছাত্রলীগ নেতা। সামনে এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অন্য ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতারা। তবে ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন চাপ দিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বসিয়ে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, এসব স্বতন্ত্র প্রার্থী আসলে ছাত্রলীগেরই প্রার্থী। ছাত্রলীগের যেহেতু একটি প্যানেল আছে, সেখানে স্বতন্ত্র হিসেবে কেউ থাকবে না এ রকম নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ আখতারুজ্জামানকে একাধিকবার ফোন করা হলে তিনি রিসিভ করেননি।

ডাকসুর ২৫টি ও প্রত্যেকটি হল সংসদের ১৩ পদে ওই ভোট হবে। স্বতন্ত্র প্যানেলে ডাকসুর জিএস প্রার্থী আসিফুর রহমান গতকাল শনিবার মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামানের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন। এতে তিনি বিভিন্ন হলের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগ করে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান। তবে কারা চাপ দিচ্ছে তা উল্লেখ করেননি তিনি।

এর আগে গতকালই বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী নুরুল হক নূর মধুর ক্যান্টিনে সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিভিন্ন হলে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জোর করে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করানো হয়েছে। সেখানে আমাদের প্রার্থীও রয়েছে। প্রশাসন দেখেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।’ একই দিন ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি রাজীব আহসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ছাত্রদলের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের জন্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে চাপ দেওয়া হচ্ছে। চাপে পড়ে কয়েকটি হলে প্রার্থী দেওয়া যায়নি। হলগুলোয় এখন যেসব প্রার্থী আছে তাদের হলে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছেনা। মারধর করে বের করে দেওয়া হচ্ছে।

সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হল সংসদের সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন মাহবুবুর রহমান সাজিদ। তিনি যে পদে প্রার্থী সেই পদে ছাত্রলীগের প্রার্থী মোস্তফা সরকার মিসাদ। মাহবুব অভিযোগ করেন, তার প্রার্থিতা প্রত্যাহার করাতে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা তাকে মারধরসহ রাতভর নির্যাতন করেছে। প্রায় ১৩ ঘণ্টা আটকে রেখে গতকাল সকাল ১০টার দিকে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা তাকে নিয়ে যায় হল অফিসে। তখন হল প্রশাসনকে মৌখিকভাবে ঘটনা তুলে ধরেন তিনি। সে সময় মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আবেদন ছিঁড়ে ফেলেন হল প্রাধ্যক্ষ। এ সময় তিনি সাজিদকে আজ রবিবার সকালে লিখিত অভিযোগ দিতে বলেন। একই হলের জিএস পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী ফরিদ হাসানকেও হল শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হয়রানি করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাত্রলীগের কয়েকজন কর্মী জানান, মাহবুব যখন হল সংসদ থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন তখন থেকেই ছাত্রলীগের একটি পক্ষ তাকে সরানোর জন্য চাপ দিচ্ছিল। মাহবুব প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করায় শুক্রবার রাত ৯টার দিকে তাকে বইমেলা থেকে ধরে নিয়ে যান ছাত্রলীগের তিন নেতা। সকাল ১০টা পর্যন্ত তাকে আটকে রেখে বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন করেন। এতে নেতৃত্ব দেন মোস্তফা সরকার মিসাদ, মুজাহিদ, আরিফ, অনিকসহ সাতজন। পরে সকাল বেলা প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে একটি আবেদনপত্র লিখতেও বাধ্য করেন তাকে।

ডাকসু নির্বাচন সামনে রেখে এবারই প্রথমবারের মতো আচরণবিধি প্রণয়ন করেছে বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এতে বলা হয়েছে, কোনো প্রার্থীকে ভয় দেখানো আচরণ বিধির লঙ্ঘন। এ ক্ষেত্রে শাস্তি হলো সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা, প্রার্থিতা বাতিল ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার।

ছাত্রদলের হয়ে সূর্য সেন হল সংসদের জিএস প্রার্থী হয়েছেন আবদুল খালেক। তারা এখনো হলে যেতে পারেননি অভিযোগ করে গতকাল দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘হলে নির্বাচনী কার্যক্রম চালাতে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে হল প্রভোস্টের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা হাইকোর্ট দেখাচ্ছে। হল প্রভোস্ট আমাদের লিখিত আবেদন করতে বলেছেন। হলের এজিএস ও একজন সম্পাদক প্রার্থীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিতে দেননি ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা।’ ছাত্রদল নেতা খালেক আরও অভিযোগ করেন, ফজলুল হক মুসলিম হলের ছাত্রদল মনোনীত ভিপি, জিএস ও এজিএস প্রার্থী সাধারণ ছাত্রদের কাছে ভোট চাইতে হলে ঢুকতে চাইলে তাদের গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দেন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি রাজীব আহসান বলেন, শুধু ফজলুল হক মুসলিম হল নয়, অন্যান্য হলেও প্রার্থীদের প্রবেশে বাধা দিচ্ছেন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা।

নির্বাচনের পরিবেশ সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দলের শিক্ষক নেতা অধ্যাপক ওবায়দুল ইসলাম বলেন, হল সংসদের ভিপি, জিএস, এজিএস পদে ছাত্রদলের প্রার্থীদের হলে প্রবেশে বাধা দিয়েছেন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। গত শুক্রবার একুশে হলের ভিপি, জিএস ও এজিএস প্রার্থী হলের সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের কাছে ভোট চাইতে গেলে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা তাদের বাধা দেন, মারধর করেন। অন্য হলগুলোতে একই অবস্থা বলেও অভিযোগ করেন বিএনপিপন্থি এই শিক্ষক।

রুমে ডেকে ডাকসু ও হল সংসদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে চাপ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রলীগ সভাপতি শোভনের বিরুদ্ধে। হল সংসদ নির্বাচনের একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী দেশ রূপান্তরকে জানান, তাদের কয়েকজনকে গতকাল প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে বলেন ছাত্রলীগ সভাপতি। এর আগে শুক্রবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে শোভন মুহসীন হলে তার কক্ষে (নম্বর ৩৩২) ডাকেন সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের এক প্রার্থী ও কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থীকে। তিনি ওই প্রার্থীদের ‘ভেবেচিন্তে’ শনিবার দুপুর ১২টার মধ্যে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে বলেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হল সংসদ নির্বাচনের এক সম্পাদক প্রার্থী বলেন, নির্বাচন মানে অনেক প্রার্থী থাকবে। যে ভোট বেশি পাবে, সে নির্বাচিত হবে। শুধু একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর লোক বাদে আর কেউ দাঁড়াতে না পারলে নির্বাচন হওয়ার দরকার কি?

অভিযোগ উঠেছে, গত বৃহস্পতিবার রাতে মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল সংসদের একটি সম্পাদক পদের একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীকে হলের অতিথি কক্ষে ডেকে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেন হল শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ওই প্রার্থী দেশ রূপান্তরকে জানান, একপর্যায়ে তার কলার চেপে ধরা হয়। একই দিন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল সংসদের এক স্বতন্ত্র প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল সংসদে বামপন্থি দুই জোটের জিএস প্রার্থী শাহাবউদ্দিন অভিযোগ করেছেন, জোরপূর্বক তার মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করিয়েছেন হল শাখা ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত