শুক্রবার, ১৪ জুন ২০২৪, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বর্গফুট মেপে চাঁদা

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০১৯, ০২:৫৫ এএম

রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও যাত্রাবাড়ী আড়ত এবং আশপাশের এলাকায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। চাঁদাবাজরা এসব সংগঠনের নেতাদের নাম ব্যবহার করে এবং নিজেদের নেতাকর্মী পরিচয় দিয়ে আড়ত ও ফুটপাত থেকে চাঁদা তুলছে। আড়ত বা ফুটপাতের বর্গফুট মেপে যেমন চাঁদা আদায় করা হচ্ছে, তেমনি ব্যবসা চালানোর অনুমতি হিসেবে নেওয়া হচ্ছে অগ্রিম টাকাও। চাঁদা না দিলে দলীয় কার্যালয়ে ডেকে হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে। ভয়ে ব্যবসায়ীরা মুখ খুলছে না।  ক্ষমতাসীন দলের নেতারা অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, একশ্রেণির দুবর্ত্ত তাদের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি করছে। আর পুলিশ বলছে তারা এ ব্যাপারে কিছুই জানে না। গতকাল সরেজমিনে ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে চাঁদাবাজির এমন অভিযোগ মিলেছে।

কারওয়ান বাজারের আড়তদার আবদুল হালিম (ছদ্মনাম) দেশ রূপান্তরকে জানান, সেখানে বর্গফুট হিসাব করে নির্ধারণ করা হয় চাঁদার হার। ওয়াসা ভবনের পাশে ফুটপাতে তার ৮ ফুট বাই ৬ ফুটের সবজির আড়ত। সড়কের ওপর ও ফুটপাতে তারা শুধু রাতেই ব্যবসা করেন। তিনি নিজেও শ্রমিক লীগের ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এই এলাকার ব্যবসায়ীরা ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের ‘দলীয় খরচের জন্য’ অগ্রিম ১৫ হাজার টাকা ও মাসে ৫ হাজার টাকা দিতেন। নির্বাচনের পর ২৬ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হাজি লোকমান হোসেন নিজ কার্যালয়ে ডেকে নেন হালিমকে। আড়ত চালাতে হলে এখন থেকে অগ্রিম ২ লাখ টাকা ও মাসে ২০ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হবে বলে সাফ জানিয়ে দেন। শেষ পর্যন্ত অগ্রিম ১ লাখ টাকা ও ভাড়া ১৫ হাজার টাকায় দফারফা হয়।

এই ব্যবসায়ী আরও জানান, তার মতো সব ব্যবসায়ীর কাছ থেকেই ১ থেকে ৩ লাখ টাকা অগ্রিম এবং মাসে ১০-২০ হাজার টাকা করে ভাড়া আদায় করছেন হাজি লোকমান হোসেন ও তার দলবল। এ বিষয়ে জানতে চাইলে চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করে হাজি লোকমান হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি কোনো ধরনের চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত  নই। আমরা ভালো আছি। তাই প্রতিপক্ষ আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করছে। কারওয়ান বাজার কিচেন মার্কেটে আমার একটি কার্যালয় আছে। আমি সেখানে নিয়মিত বসি। ব্যবসায়ীদের সমস্যা, সুবিধা-অসুবিধা দেখি।’

অথচ কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীরা দেশ রূপান্তরকে জানান, সবজির আড়তে যুবলীগ নেতা লোকমানের সহযোগী হিসেবে চাঁদা আদায় করছে নাজমুল আলম রনি, জসিম পাটোয়ারি, কাশেম মিয়া এবং ওয়ার্ড নেতা ইরাব ও ছাত্রলীগ নেতা মিজান। তারা সবাই নিজেদের বিভিন্ন ইউনিটের নেতা ও সদস্য পরিচয় দেন। মাছের আড়তে শ্রমিক লীগের নেতা পরিচয় দিয়ে চাঁদা আদায় করেন মোশারফ হোসেন, রাজ্জাক ওরফে কাইল্যা রাজ্জাক, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাগরসহ কয়েকজন। কিচেন মার্কেটের আশপাশে বিল্লাল ওরফে রুটি বিল্লাল, ২৬ নম্বর ওয়ার্ড শ্রমিক লীগের সেক্রেটারি পরিচয় দেওয়া মনির, ছাত্রলীগের ফকরুল, রাজু, দেলোয়ার, আনার, টিটু ও আবদুর রশীদ কুট্টিসহ বড় একটি গ্রুপ চাঁদাবাজি করছে।

হোসেন নামে এক ব্যবসায়ী জানান, কারওয়ান বাজারে একটি ধনেপাতার টুকরি বসালেও দৈনিক ২০০ টাকা করে চাঁদা দিতে হয়। চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে ব্যবসায়ীদের ওপর নেমে আসে নির্মম নির্যাতন। এর আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সাংবাদিকদের কাছে চাঁদাবাজির তথ্য দেওয়ায় বেশ কয়েকজন সাধারণ ব্যবসায়ীকে মারধর করে চাঁদাবাজরা। এমনকি বিএনপি-জামায়াতের কর্মী বানিয়ে মারধর করে বাজার থেকে তাড়িয়ে দেয়।

এদিকে যাত্রাবাড়ী আড়ত ও আশপাশের এলাকায় ঢাকা দক্ষিণের ৫০ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের নেতা জনৈক সায়েম খন্দকারের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি করছে একটি দল। কিছু দিন আগে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তার ফুটপাত ও আড়তে চাঁদাবাজির অভিযোগে এই গ্রুপের সদস্য সোনা মিয়া, জাহাঙ্গীর, নূর ইসলাম ওরফে কাবিলাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানান, গ্রুপে সেলিম মিয়া, ফয়সাল, লিটন, রাসেল, শামীম, জসিমসহ আরও অনেকে রয়েছেন। তারা সবাই স্থানীয় যুবলীগ ও শ্রমিক লীগের বিভিন্ন ইউনিটের নেতা পরিচয় দিয়ে থাকেন। প্রকৃতপক্ষে তারা স্বীকৃত কোনো কমিটিতে আছেন কি না, সেটা জানা যায়নি।

কারওয়ান বাজার এলাকায় হাজি লোকমানসহ ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজির বিষয়ে জানতে চাইলে তেজগাঁও থানার ওসি মাজহারুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চাঁদাবাজির বিষয়ে কেউ আমাদের কাছে অভিযোগ নিয়ে আসেনি। চাঁদাবাজির শিকার কেউ থানায় এলে আমরা মামলা নিয়ে চাঁদাবাজিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেব।’

এ ব্যাপারে যাত্রাবাড়ী থানার ওসি আনিছুর রহমান বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার কাছে নতুন করে কেউ অভিযোগ করেনি।’ কারও কাছে চাঁদা চাইলে তাৎক্ষণিক পুলিশকে জানানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের অভিযোগ পেলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে আইনগত ব্যবস্থা নেব।’

ব্যবসায়ীরা নিজের নিরাপত্তাজনিত কারণে মামলা বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস পান না। এই অবস্থায় প্রতিকার কীÑ জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, তারা নিজের নাম-ঠিকানা গোপন রেখে চাঁদাবাজির সময় ৯৯৯ নম্বরে জানাতে পারেন। পুলিশ তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত