মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪, ১০ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ভোটার তুষ্টি প্রকল্পে নামমাত্র বরাদ্দ

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০১৯, ০৩:১৪ এএম

গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সারা দেশের ভোটারদের খুশি করতে অনেক প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হলেও সেসব প্রকল্পে উল্লেখ করার মতো টাকা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (আরএডিপি)। যেসব মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলো প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করে অনুমোদন নিয়েছে, নির্বাচন শেষে নতুন সরকার গঠনের পর তারাই এখন বলছে, বরাদ্দ কমিয়ে দিতে। জুন পর্যন্ত মেয়াদ থাকা চলতি অর্থবছরে পর্যাপ্ত বরাদ্দ পেলেও খরচ করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো নামকাওয়াস্তে বরাদ্দ চেয়েছে। মূলত প্রকল্প পরিচালকের (পিডি) জন্য গাড়ি কেনা ও আনুষঙ্গিক খরচ মেটাতে অল্প অর্থ বরাদ্দ চেয়েছে বলে পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, নির্বাচনের আগে স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নে প্রকল্প অনুমোদনে সংসদ সদস্যদের কাছ থেকে বিপুল চাপ আসে। সরকারগুলোও মেয়াদের শেষ দিকে এসে সারা দেশের নতুন নতুন প্রকল্প অনুমোদন দিয়ে ভোটারদের তুষ্ট করার চেষ্টা করে। নির্বাচনের আগে স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন সংসদ সদস্যরা। আর জাতীয়ভাবে বৃহৎ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে ব্যস্ত সময় কাটান সরকারের মন্ত্রীরা। আগে থেকে চলে আসা এই চর্চা অব্যাহত ছিল গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগেও।

গত বছরের ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া চলতি অর্থবছরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ২৫টি বৈঠক আয়োজনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। প্রতিটি বৈঠকে গড়ে চারটি করে এক বছরে ২০০ নতুন প্রকল্প অনুমোদনের লক্ষ্য ছিল তাদের। নতুন প্রকল্প পাসের হিড়িকে ২০০ প্রকল্প পাসের লক্ষ্য পার হয়েছে গত পাঁচ মাসেই। নভেম্বর পর্যন্ত একনেকে অনুমোদন পেয়েছে ২৪০ নতুন প্রকল্প। এর বাইরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় আরও ৯৯ প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী। সব মিলে সংশোধিত এডিপিতে (আরএডিপি) যোগ হচ্ছে ৩০৯ নতুন প্রকল্প।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রকল্প অনুমোদনের পর বাস্তবায়ন পর্যায়ে  যেতে বেশ কয়েকটি ধাপ পার হতে হয়। এতে কয়েক মাস সময় লাগে। নির্বাচনের আগে পাস হওয়া বেশির ভাগ প্রকল্পেই এখন নামমাত্র অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। সংশোধিত এডিপিতে বেশির ভাগ প্রকল্পই বরাদ্দ পাচ্ছে ১০ থেকে ২০ কোটি টাকার মধ্যে। পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থের কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু যেসব মন্ত্রণালয় ও সংস্থা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করবে, তারাই কম বরাদ্দ চাচ্ছে। বরাদ্দ দেওয়ার পর টাকা যদি খরচই না হয়, তাহলে বরাদ্দ দিয়ে লাভ কি?

জেলা মহাসড়ক যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণে নির্বাচনের আগে প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পে চট্টগ্রাম অঞ্চলের জন্য প্রকল্প ব্যয় ৬৫২ কোটি টাকা। এডিপিতে সংশোধন করে এখন দেওয়া হচ্ছে ২৫ কোটি টাকা। একইভাবে রাজশাহী অঞ্চলের জন্য প্রকল্প ব্যয় ৭৬৬ কোটি টাকার জায়গায় বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ২০ কোটি টাকা। ময়মনসিংহ অঞ্চলের জন্য প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৬৮ কোটি টাকা। বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ১০ কোটি টাকা। আর গোপালগঞ্জ অঞ্চলে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৮৯ কোটি টাকা, বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ২০ কোটি টাকা।

জয়পুরহাট (হিচমী)-পুরান আইপল-পাঁচবিবি-হিলি মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পটিও নির্বাচনের আগেভাগে অনুমোদন পেয়েছে। ১৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ৮ কোটি টাকা। সোনাপুর থেকে চেয়ারম্যান বাড়ি সড়ক উন্নয়নে অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পে ব্যয় হবে ১৭৯ কোটি টাকা। এ প্রকল্প বরাদ্দ পাচ্ছে পাঁচ কোটি টাকা। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় রেলওয়ে ওভারপাস নির্মাণে ৯২ কোটি টাকার প্রকল্প পাস হলেও বরাদ্দ মোট এক কোটি টাকা। নির্বাচনের আগে পাস হলেও কিছু প্রকল্পে যথেষ্ট বরাদ্দ দেওয়ার নজিরও পাওয়া গেছে। ঢাকার বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় শহীদ রমিজ উদ্দীন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুই শিক্ষার্থীর নিহত হওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে আন্দোলন হয়। তখন শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতে সেখানে একটি আন্ডারপাস করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরে ৪৯ কোটি ৯৮ লাখ টাকা ব্যয়ে সেখানে আন্ডারপাস নির্মাণে প্রকল্প অনুমোদন দেয় একনেক। এডিপি সংশোধনকালেও এ প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ৪০ কোটি টাকা। এ ছাড়া, ‘ঢাকা খুলনা (এন-৮) যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা থেকে (ইকুয়ারি বাবু বাজার লিংকরোডসহ) মাওয়া পর্যন্ত এবং পাচ্চর পর্যন্ত ভাঙ্গা অংশ ধীরগতির যানবাহনের জন্য পৃথক লেনসহ ৪ লেনে উন্নয়ন প্রকল্পের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্তকরণ’ প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে দু হাজার ৪৯৬ কোটি টাকা। এ প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ১১২ কোটি টাকা খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন সংক্রান্ত ৪৮টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে নির্বাচনের আগে। সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে এসব প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয় ২১ হাজার ৩৩৬ কোটি টাকা। সংশোধিত এডিপিতে এসব প্রকল্পে মোটে ৩ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রকল্প অনুমোদন হলেই বাস্তবায়ন শুরু হয়ে যায় না। সময় স্বল্পতার কারণে বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো বরাদ্দ কম চেয়েছে। সেজন্যই নতুন প্রকল্পে কম বরাদ্দ দেওয়া জচ্ছে। চলতি অর্থ বছরের মেয়াদ জুন পর্যন্ত আছে। বেশি বরাদ্দ নিলেও এই কয়েক মাসে ব্যয় করতে পারবে না। এজন্য বরাদ্দ কম চেয়েছে। জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানি সম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য মোহাম্মদ আসিফ-উজ-জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, নতুন প্রকল্পে বরাদ্দ বেশি দেওয়ার দরকার নেই। মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলো থেকে এখন যে পরিমাণ বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে, তা দিয়ে মূলত প্রকল্প পরিচালকের গাড়ি কেনা হবে। এর বাইরে অফিস ডেকোরেশন, লজেস্টিক সাপোর্ট, কর্মকর্তাদের বেতন বাবদ খরচ হবে।

তিনি বলেন, ‘এই বিষয়টিকে অন্যভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। চলতি অর্থবছরে খুব বেশী সময় নেই। আর গাড়ি না কিনলে পিডিরা চলাফেরা করবেন কেমনে। প্রকল্প শুরু করতেও অনেক দৌড়াদৌড়ি করতে হয়।’

সদ্য বিদায়ী পরিকল্পনা বিভাগের সচিব জিয়াউল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রকল্প অনুমোদন দেয়ার দায়িত্ব পরিকল্পনা কমিশনের, বাস্তবায়নের না। যারা বাস্তবায়ন করবে, তারাই বলতে পারবে কেন কম বরাদ্দ চেয়েছে। আমার জানা মাতে, নতুন ও চলমান প্রকল্পের বাস্তবায়নের গতি বাড়াতে এডিপির সংশোধিত আকার বাড়ানো হচ্ছে। এর মানে হল অর্থ সংকট নাই। বাস্তবায়ন পর্যায়ে সমস্যা রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের লীড ইকোনমিষ্ট ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, চলতি অর্থবছরে নির্বাচন পর্যন্ত যেসব প্রকল্প নেয়া হয়েছে, তার বেশীরভাগেই তাড়াহুড়া করা হয়েছে। যত বেশি সম্ভব প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এখন নামমাত্র হলেও বরাদ্দ দিতে হচ্ছে। এজন্য এডিপি সংশোধনীতে এবার মূল বাজেটের বরাদ্দের চেয়ে বরাদ্দ বাড়তে পারে, যা সচরাচর দেখা যায় না।
তিনি বলেন, প্রয়োজন, সামর্থ্য ও বাস্তবতার নিরিখে অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করা যেতে পারে। প্রয়োজনে কিছু প্রকল্প বাতিলও করা যেতে পারে। জানতে চাইলে গবেষনা সংস্থা বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, এডিপি বাস্তবায়নের সমস্যাগুলো সমাধানে উদ্যোগ নিতে হবে। অনেক দূর্বলতা সত্বেও প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। বাস্তবায়ন পর্যায়ে গেলে এসব সমস্যা ধরা পড়ে। সামর্থ্যরে বাইরে গিয়ে প্রকল্প অনুমোদনের ধারা থেকের বের হয়ে আসতে হবে।

 

   
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত