শুক্রবার, ১৪ জুন ২০২৪, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

রাসায়নিকের গুদাম-কারখানা সরাতেই হবে

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০১৯, ১০:০৯ পিএম

চকবাজারের জীবনঘাতী অগ্নিকাণ্ডের পর পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকসহ দাহ্য পদার্থের গুদাম-কারখানা সরানোর কাজে নিয়োজিত বিশেষ টাস্কফোর্সের অভিযান ব্যবসায়ীদের বাধার মুখে পড়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত কারখানা ও গুদাম সরাতে গিয়ে শনিবার মূলত স্থানীয় প্লাস্টিক ও প্লাস্টিকজাত দ্রব্যাদির ব্যবসায়ী এবং কিছু বাসিন্দার তোপের মুখে পড়েছেন টাস্কফোর্স সদস্যরা। ব্যবসায়ীদের অনুযোগ, রাসায়নিক শিল্প সরিয়ে নেওয়ার জন্য বিকল্প স্থানের ব্যবস্থা করা হলেও প্লাস্টিক শিল্প সরানোর জন্য তেমন উদ্যোগ নেই। তাদের দাবি, সরকার নির্ধারিত ২৯টি বিস্ফোরক-দাহ্য দ্রব্যের বাইরে অন্য কোনো কারখানা-গুদাম বন্ধ করতে দেবেন না তারা।  কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না রাসায়নিকের মতোই এসব প্লাস্টিকজাত দ্রব্যাদিও দাহ্য এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

নিমতলী আর চকবাজার ট্র্যাজেডিতে এত শত মানুষের মৃত্যুর পর রাসায়নিক-প্লাস্টিকসহ সব ধরনের বিস্ফোরক-দাহ্য পদার্থের গুদাম ও কারখানা সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো প্রকার বিকল্প ভাবনার সুযোগ নেই।  জানা গেছে, মারাত্মক দাহ্য নানা রাসায়নিক আমদানি ও গুদামজাত করতে হলে সরকারের বিস্ফোরক অধিদপ্তর থেকে লাইসেন্স নিতে হয় কিন্তু প্লাস্টিক বা রাবারের কারখানা করার ক্ষেত্রে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের অনুমোদন প্রয়োজন হয় না। এই সুযোগে রাসায়নিকের মতোই মারাত্মক দাহ্য প্লাস্টিক পণ্যের কারখানা ও গুদাম বছরের পর বছর ধরে কোনো নিয়মনীতি না মেনেই পুরান ঢাকার মতো বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায় অবাধে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। যথাযথ নীতিমালা না থাকার এই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই কেউ কেউ প্লাস্টিক কারখানা ও গুদাম সরাতে বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। বিষয়টিকে আমলে নিয়ে অবশ্যই এ বিষয়ে সরকারের যথাযথ কর্র্তৃপক্ষকে পদক্ষেপ নিতে হবে। ব্যবসায়ীদের কথাও শুনতে হবে। তাদের যৌক্তিক দাবি মেটানোর চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু অযৌক্তিক দাবির মুখে রাসায়নিক গুদাম সরানোর ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। 

রাসায়নিকসহ এমন ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পের বিষয়ে নানা আইন এবং সরকারের নানা সংস্থা ও দপ্তরগুলোর মধ্য সমন্বয় থাকলে এবং বিদ্যমান আইনকানুনের কঠোর প্রয়োগ হলে পরিস্থিতি আজকের মতো নাজুক অবস্থায় আসত না।  এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আসলে রাসায়নিকসহ এমন ঝুঁকিপূর্ণ দাহ্য ও বিস্ফোরক দ্রব্যাদি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত জাতীয় নীতিমালা না থাকা এবং একক কোনো শক্তিশালী কর্র্তৃপক্ষ না থাকার বিপদগুলোই সামনে নিয়ে আসছে।  আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশ রাসায়নিকের এক বিশাল বাজার। বছরে ১৬ হাজার ২০০ কোটি টাকার রাসায়নিক আমদানি করে বাংলাদেশ, যা মোট বার্ষিক আমদানির প্রায় সাড়ে সাত ভাগ। সংশ্লিষ্টদের হিসাব মতে আগামী ১০ বছরে রাসায়নিকের চাহিদা প্রায় দ্বিগুণ হবে। ফলে রাসায়নিকের নীতিমালা ও ব্যবহার নিয়ে সরকারি-বেসরকারি সংস্থা এবং ব্যবসায়ী ও জনসাধারণসহ সর্বস্তরে সচেতনতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।

উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, দেশে কোথায় কী পরিমাণ রাসায়নিক কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে সে বিষয়ে এখনো পর্যন্ত কোনো ‘জাতীয় রাসায়নিক তথ্যভাণ্ডার’ নেই। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রাসায়নিকের ব্যবহার সংক্রান্ত নানা চুক্তি ও নানা সংস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়েও বাংলাদেশ সক্রিয় নয়। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ দুবাইয়ে ‘স্ট্র্যাটেজিক অ্যাপ্রোচ টু ইন্টারন্যাশনাল কেমিক্যাল ম্যানেজমেন্ট’ (এসএআইসিএম)-এ স্বাক্ষর করেছিল। কিন্তু এই চুক্তির বিষয়ে পরে আর কোনো অগ্রগতির খবর পাওয়া যায়নি। এদিকে বিশ্বজুড়ে সব ধরনের রাসায়নিকের শ্রেণিকরণ, লেবেল লাগানো ও মোড়কজাতকরণ সংক্রান্ত ২০০৯ সালের আন্তর্জাতিক চুক্তি ‘গ্লোবালি হারমোনাইজড সিস্টেম-জিএইচএস’-এও স্বাক্ষর করেনি বা পক্ষভুক্ত হয়নি বাংলাদেশ।

দেশের রাসায়নিক শিল্পের নিয়ন্ত্রণ এবং তদারকির জন্য অবিলম্বে ‘জাতীয় রাসায়নিক কাউন্সিল’ কিংবা এই ধরনের একটি জাতীয় সমন্বয় কমিটি গঠনের বিষয়ে সরকারকে অবশ্যই দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট সবার বাস্তব অভিজ্ঞতা ও মতামতকে কাজে লাগানোর স্বার্থে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি সংস্থা এবং রাসায়নিক ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে এই কাউন্সিল বা সমন্বয় কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। এই প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার পাশাপাশি টাস্কফোর্সের চলমান রাসায়নিক স্থানান্তর অভিযান অবশ্যই কঠোরভবে চালিয়ে যেতে হবে। নিমতলী-চকবাজার ট্র্যাজেডির শিক্ষা থেকে বলা যায় এ বিষয়ে কোনোরকম গাফিলতি কিংবা কোনোরকম ছাড় দেওয়া হলে ভবিষ্যতে তা  আবারও বিপর্যয় ডেকে আনবে। 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত