বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৫ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ফোকলোর সাধনায় মোহাম্মদ সাইদুর

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০১৯, ১০:১২ পিএম

বাংলাদেশের ফোকলোরচর্চার ইতিহাসে মোহাম্মদ সাইদুর একজন সাধক-সংগ্রাহক হিসেবে অনন্য ভূমিকা রেখে গেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন পর্যন্ত অধিকাংশ মনীষী বাংলার ফোকলোর বলতে শুধু গ্রামীণ সংগীতের ধারা তথা বাউলগান, মুশির্দি-মারফতি গান, মেয়েলিগীত ইত্যাদি এবং তার অন্তর্গত জ্ঞান, সাধনা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বিশ্লেষণের ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন; অবশ্য, এ কথাও বলে রাখা ভালো যে, রবীন্দ্রনাথের আগ্রহের সঙ্গে বাংলার ছড়া, রূপকথা, নাট্যপালার পরিবেশনা, লোকশিল্প ও গ্রামীণ জীবনের নানা বিষয় যুক্ত ছিল; দীনেশচন্দ্র সেন ও চন্দ্রকুমার দে থেকে ক্ষিতিশচন্দ্র মৌলিক প্রমুখের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল আখ্যান-গীতির ধারা, তাদের ভাষায় ‘গীতিকা’, ‘পল্লীগাথা’ বা ‘পালাগান’; অন্যদিকে কবি জসীম উদ্দীনের মূল আগ্রহ ছিল গ্রামীণ সংগীত ও নাট্যপালার দিকে, গুরুসদয় দত্তের আগ্রহের বিষয় ছিল ‘পটুয়াসংগীত’, বাংলার লোকনৃত্য ইত্যাদি এবং এমনকি উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক কালের লোকজ্ঞান গবেষকদের মধ্যে শক্তিনাথ ঝা, সুধীর চক্রবর্তী, আবুল আহসান চৌধুরী প্রমুখ খ্যাতনামা ব্যক্তিত্বদের প্রধান আগ্রহের স্থানে রয়েছে বাউল-সাধকদের জীবন ও সংগীত।

এই বিচারে মোহাম্মদ সাইদুর ছিলেন একেবারেই ব্যতিক্রম। তিনি জন্মসূত্রে লোকজ্ঞানের প্রাণবন্ত ভুবনের অকৃত্রিম এক উত্তরাধিকারী হিসেবে অনেকটা স্বপ্রণোদিতভাবেই বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় ফোকলোর চর্চায় ব্রতী হন। একদিকে তিনি গ্রন্থিত করেছেন বাংলাদেশের মৌখিক সংস্কৃতির কিচ্ছা, পালা, নাট্য, গীতি, কথা, পুঁথি, কাব্য, আখ্যান, ধাঁধা, প্রবাদ ইত্যাদি গ্রামীণ সাহিত্যের অমূল্য ভা-ার; অন্যদিকে বস্তুগত সংস্কৃতির কাব্যিক আধার সূচিশিল্প, নকশিকাঁথা, শখের হাঁড়ি, টেপা পুতুল, কাঠের পুতুল, লোক অলংকার, কাগজ কাটা শিল্প, নকশি শিকা, কুটির শিল্পের প্রাচীন ঐতিহ্য বস্ত্রশিল্প ইত্যাদি; বাংলাদেশের কৃত্যমূলক ফোকলোর মুহররম, বেড়া ভাসান ইত্যাদি; এদেশের স্থানীয় লোকক্রীড়া, পেশাজীবী সম্প্রদায়ের পরিচয়, ব্যাঙ বিয়ে ও পুতুলের বিয়ে। এছাড়া, বাংলাদেশের মেলা ও উৎসবের প্রথম পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়নের ব্যাপারে নিঃসন্দেহে তিনিই পথিকৃৎ। এক্ষেত্রে, ইতিহাসের আলোকে বাংলার ফোকলোর গবেষণার ক্ষেত্রে মোহাম্মদ সাইদুরের ফোকলোর সংগ্রহের দুটি বিশেষত্বের কথা উল্লেখ করা যায় ১. তিনি বাংলাদেশের সামগ্রিক ফোকলোর চর্চার সংগ্রহের ব্যাপারে একনিষ্ঠ ছিলেন, এক্ষেত্রে খুব সম্ভবত তার আগ্রহ ছিল বাংলাদেশের ফোকলোর চর্চার একটি সামগ্রিক ইতিহাস প্রণয়ন; ২. মোহাম্মদ সাইদুরের ফোকলোর সংগ্রহের পদ্ধতি আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক, কেননা তিনি তার সংগ্রহের প্রায় সকল ক্ষেত্রে সংগ্রহ সম্পর্কিত সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বস্তুগত সামগ্রিক তথাদি প্রদান করেছেন, যার ওপর ভিত্তি করে মোহাম্মদ সাইদুর সংগৃহীত ফোকলোর উপাদানের একটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাস রচনা করা সম্ভব। এছাড়া, ব্যক্তিগতভাবে তার এলাকায় জনসংস্কৃতি সমীক্ষণে গিয়ে প্রত্যক্ষ করেছি যে, মোহাম্মদ সাইদুর তার ফোকলোর সংগ্রহের মাধ্যমে আরেকটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করেছেন, যার প্রভাব আজও তার জন্মস্থান বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে রয়ে গেছে। কেননা, তিনি যে সব শিল্প ও সাধকদের কাছ থেকে সরাসরি গান, কিচ্ছা, পুঁথি ইত্যাদি সংগ্রহ করেছিলেন, তারা মোহাম্মদ সাইদুরের সংগ্রহ পদ্ধতিতে এতটাই আবিষ্ট হয়েছিলেন যে এখনো উক্ত অঞ্চলের মানুষ তাদের নিজের ঐতিহ্য রক্ষা ও চর্চার ব্যাপারে অত্যন্ত সক্রিয় রয়েছেন।

এ কথা বলতে দ্বিধা নেই, বাংলাদেশের অন্তত তিনটি জাদুঘর তথা বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর এবং মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মোহাম্মদ সাইদুরের সংগ্রহে অনেকটাই সমৃদ্ধ হয়েছে। এর বাইরে বাংলা একাডেমির লোকঐতিহ্য সংগ্রহশালা খুব সম্ভবত মোহাম্মদ সাইদুরের সংগ্রহের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছিল, বর্তমানে যার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া দুষ্কর!

এবারের এই কীর্তিমান ফোকলোরবিদ মোহাম্মদ সাইদুরের ব্যক্তিগত ও কর্মজীবনের অন্যান্য পরিচয় দেওয়া যাক। তিনি ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ২৮ জানুয়ারি কিশোরগঞ্জ জেলার চরবগাতিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা কুতুবদ্দিন আহমদ ছিলেন একজন পুঁথি পাঠক ও লোকগীতি গায়ক। তিনি ১৯৫৬ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে একটি জারিগানের দল নিয়ে মওলানা ভাসানীর ডাকে ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনে যোগ দেন।

কর্মজীবনের শুরুতেই মোহাম্মদ সাইদুর দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নিজ জেলার সংবাদ পরিবেশনের সময় তিনি চন্দ্রকুমার দে-র মতো নিজ অঞ্চলের লোকসংস্কৃতির পরিচয় প্রদান করতে শুরু করেন। এরপর ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি বাংলা একাডেমির সংগ্রাহক হিসেবে কাজ শুরু করেন। চাকরিরত অবস্থায় ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি এসএসসি পাস করেন। বাংলা একাডেমির চাকরি জীবনে তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে গান, কবিতা, কাহিনী, কিচ্ছা, নাট্যপালা, পুঁথি ও লোকজীবনের অন্যান্য উপাদান সংগ্রহের সুযোগ গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে বাংলা একাডেমি থেকে তার সংগ্রহ ও সংকলনের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত হতে থাকে বেশ কিছু গ্রন্থ, যেমনÑ জামদানি এবং বাংলা একাডেমি ফোকলোর সংকলন-এর তিনটি খ-ের অন্তর্ভুক্ত ‘পালাগান’, ‘বেড়াভাসান’, ‘মুহররম অনুষ্ঠান’ তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। এছাড়া, দেশ-বিদেশের পত্র-পত্রিকায় তার শতাধিক প্রবন্ধ, নিবন্ধ, প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলা একাডেমিতে এবং ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে শিল্পকলা একাডেমিতে তার সংগৃহীত নিদর্শন প্রদর্শিত হয়েছে। ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে লন্ডনের  হোয়াইট চ্যাপেল আর্ট গ্যালারিতে তার সংগৃহীত লোকশিল্প নিদর্শনের প্রদর্শনী হয়। বাংলা একাডেমি থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে যোগ দেন, আমৃত্যু তিনি সেখানে কর্মরত ছিলেন।

বিভিন্ন জাদুঘর ও প্রতিষ্ঠানে অকাতরে নিজের সংগ্রহ বিলিয়ে দিয়েও মোহাম্মদ সাইদুর বোধকরি শেষ পর্যন্ত এদেশে শিল্পকর্মের যথার্থ সম্মান প্রদর্শন প্রত্যক্ষ করতে পারেননি, অথবা নিজের সংগ্রহের যথার্থ প্রদর্শনী কোথাও দেখে খুশি হতে পারেননি। তাই তিনি জীবন সায়াহ্নে এদেশীয় লোকশিল্পের একটি পূর্ণাঙ্গ ও ব্যতিক্রমী সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিশ্বখ্যাত ফোকলোরবিদ ও আমেরিকার ফোকলোর গবেষক হেনরি গ্লাসি’কে দিয়ে নিজ বাড়িতে উদ্বোধন করান একটি ‘লোকশিল্প সংগ্রহশালা’। কিন্তু ২০০৭ খ্রিস্টাব্দের ৪ মার্চ মোহাম্মদ সাইদুরের শারীরিক জীবনের অবসান ঘটায় তিনি এর কাজ শেষ করে যেতে পারেননি। পরে জানা গিয়েছিল যে, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের তত্ত্বাবধানে তার স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলার কার্যক্রম শুরু করেছিল। যদি মোহাম্মদ সাইদুরের নামে সেই লোকশিল্প সংগ্রহশালাটি প্রতিষ্ঠিত হয় তবে তা বাংলাদেশের ফোকলোরের বিকাশ ও বিস্তারে বিশেষ ভূমিকা রাখবে এবং মোহাম্মদ সাইদুরের ফোকলোর চর্চায় জীবন নিবেদন এ মর্ত্যে অম্লান থাকবে।

লেখক: গবেষক ও লেখক

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত