শুক্রবার, ১৪ জুন ২০২৪, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

সিসিমপুর : আনন্দের অন্য ভুবন

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০১৯, ১১:৩৪ পিএম

শিশুর শৈশবকে আনন্দময় করে গড়ে তুলতে আর আনন্দের সঙ্গে শিক্ষাগ্রহণের জন্য তৈরি করা হয়েছিল এক অনুষ্ঠান। মূলত সমাজের পিছিয়ে পড়া শ্রেণির জন্য তৈরি করা সেই অনুষ্ঠানের নাম সিসামি স্ট্রিট। এই অনুষ্ঠানে ভাষা, ঐতিহ্য ও কৃষ্টির সঙ্গে পরিচিত করে তোলা হয় শিশুদের। কাজ করা হয় শিশুদের সামাজিক আচার, আচরণ ও দক্ষতা নিয়ে। টেলিভিশনের মাধ্যমে শিশুদের শিক্ষাগ্রহণকে আনন্দদায়ক ও উপভোগ্য করার এই অনুষ্ঠানটি ৫০ বছরে পা ফেলছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রয়েছে এই অনুষ্ঠানের সংস্করণ। বাংলাদেশে জনপ্রিয় এই অনুষ্ঠানটির নাম সিসিমপুর। লিখেছেন লায়লা আরজুমান্দ

সিসামি ওয়ার্কশপ

‘সিসামি ওয়ার্কশপ’ একটি অলাভজনক শিক্ষামূলক সংগঠন। এই ওয়ার্কশপ ১৫০টির বেশি দেশে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সিসামি ওয়ার্কশপের

লক্ষ্য হলো টেলিভিশনকে শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে শিশুদের তার সর্বোচ্চ সম্ভাবনায়

পৌঁছাতে সাহায্য করা।কয়েক দশক ধরে শিশু ও অভিভাবকদের নিরাপদ, বিনোদনমূলক ও শিক্ষামূলক বিষয়বস্তুর কারণে সিসামি ওয়ার্কশপ বাবা-মায়েদের কাছে বিশ্বস্ত হয়ে উঠেছে। তবে টেলিভিশনের মাধ্যমে যাত্রা শুরু হলেও সংস্থাটি অন্যান্য মাধ্যম, যেমন : বই ও প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিশুদের আরও বুদ্ধিদীপ্ত, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ও শক্তিশালী এবং দয়ালু হিসেবে শিশুদের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে সহায়তা প্রদান করছে। গবেষণা-নির্ভর প্রতিষ্ঠানটি প্রতিটি দেশের জনগোষ্ঠীর চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে টেলিভিশন অনুষ্ঠান প্রস্তুত ও প্রচার করে থাকে। সিসামি স্ট্রিট তেমনই একটি অনুষ্ঠান। শিশু-কিশোরদের কাছে যার জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। এই অনুষ্ঠানটির বাংলাদেশি সংস্করণের নাম সিসিমপুর।

হাসতে শেখায় সিসামি স্ট্রিট

মার্কিন শিশুদের জন্য তৈরি একটি শিক্ষামূলক টেলিভিশন অনুষ্ঠান সিসামি স্ট্রিট। এই অনুষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৬৯ সালে। যেখানে থাকত নানা রঙিন মাপেট। এই মাপেট শেখাত বিনোদনের সঙ্গে শিক্ষামূলক নানা বিষয়। এই অনুষ্ঠানটি মূলত তৈরি হয়েছিল সমাজের অবহেলিত শ্রেণির শিশুদের জন্য। যারা ঠিকমতো স্কুলে গিয়ে তাদের পড়াশোনা করতে পারত না, তাদের শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে টেলিভিশনকেই বেছে নেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতিতেও আগ্রহী করে তোলা হয়। শিশুবিকাশ বিশেষজ্ঞ, গবেষক, শিশুশিক্ষাক্রম বিশেষজ্ঞ, লেখক, অডিও-ভিজ্যুয়াল পরিচালক, পাপেটিয়ার, সংগীত পরিচালক, অ্যানিমেটর ইত্যাদি অনেকের সমন্বয়ে নির্মিত হয়েছিল এই সিসামি স্ট্রিট। বর্তমানে এটি বিশ্বের ৭০টিরও বেশি ভাষায় প্রচারিত হচ্ছে। সামনে এই অনুষ্ঠানের ৫০ বছর হবে। আর এই  উপলক্ষে বর্ষব্যাপী উদ্যাপনের ঘোষণা দেওয়া হয়।

বিগ বার্ড, এর্নি আর বার্ট, দ্য কাউন্ট, গ্রোভার, কুকি মনস্টার, মাপেট শোর কার্মিট দ্য ফ্রগ এদের কাছ থেকে কত কিছুই তো শেখে ছোটরা। গুনতে শেখে, জ্যামিতির আকার, রং চিনতে শেখে। তবে সবচেয়ে বেশি করে ছোটরা যেটা শেখে সেটা হলোÑ হাসতে শেখে। তাই শিশু-কিশোরদের কাছে মার্কিন এই অনুষ্ঠানটি কী পরিমাণ জনপ্রিয়, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।

সিসামি ওয়ার্কশপের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার জেফরি ডুন জানান, এটি শিশুদের জন্য, শিক্ষার জন্য ও টেলিভিশনের জন্য এক অসাধারণ মাইলস্টোন। সিসামি স্ট্রিট এখন বিশ্বব্যাপী শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার জীবন পরিবর্তনের সুবিধা নিয়ে এসেছে। তাদের লক্ষ্য শিশুদের স্মার্ট, শক্তিশালী, দয়ালু করে গড়ে তোলা।

অটিজমে সচেতনতা বাড়াতে

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেড়েছে অটিজম আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা। তবে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়লে এ বিষয়ে সচেতন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। তাই এমন প্রেক্ষাপটে সিসামি স্ট্রিট নেয় এক অভিনব উদ্যোগ। অটিজম বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে তারা যোগ করেছে এক অটিজমে আক্রান্ত চরিত্র। চরিত্রটির নাম জুলিয়া। চার বছর বয়সী এই মাপেটটির মাথার চুল কমলা রঙের। চোখ সবুজ। তার আছে একটি খেলনা খরগোশ। অটিজম সচেতনতায় বিভিন্ন গঠনমূলক ভূমিকায় অংশ নেয় জুলিয়া।

লিঙ্গবৈষম্য

সব শিশুর রয়েছে শিক্ষার অধিকার। সেটা ছেলেমেয়ে উভয়ের জন্যই। তবে বিশ্বের প্রায় ৬১ মিলিয়ন কন্যাশিশু স্কুলে যায় না। নারীদের নিরক্ষরতার হার প্রায় পুরুষের দ্বিগুণ। শিক্ষিত নারী শুধু তার নিজের জীবন নয়, বদলে দিতে পারে তার পরিবার ও সম্প্রদায়ও। তাই সিসামি স্ট্রিট লিঙ্গবৈষম্য কমাতে, মেয়েদের সমান সুযোগ নিশ্চিতের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।

মানসিক আঘাত

আমাদের জীবনে অনেক সময় খারাপ সময় আসে। নানা ধরনের দুঃখজনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। যেমন : বাবা-মায়ের ডিভোর্স হলে, শিশুরা গৃহহীন হলে, শিশু নিপীড়িত ও নির্যাতিত হলে, বাবা-মা কারাগারে থাকলে। এগুলো ছাড়া আরও নানা কারণে শৈশবে মানসিকভাবে খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে পারে একটি শিশু। সিসামি স্ট্রিট এই সময়গুলোতে শিশুদের মানসিকভাবে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে। বিভিন্ন শিক্ষামূলক ভিডিও, খেলাধুলা, গল্পের বই হতে পারে তাদের অবলম্বন। এসব কিছু শুধু ছোটদেরই নয়, পরিবারের সবার সুখী, স্বাস্থ্যকর দৃষ্টিভঙ্গি গঠনেও সহায়তা করে। সিসামি স্ট্রিটের জনপ্রিয় চরিত্র, এলমো, গ্রোভার অ্যাবিÑ এসব বিষয়ে শিশু ও তাদের অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে।

এগুলো ছাড়াও রিফিউজি শিশু, স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা ও অন্যান্য সচেতনমূলক অনেক বিষয় নিয়ে কাজ করে থাকে এই সিসামি স্ট্রিট। জনপ্রিয় এই অনুষ্ঠানটিতে গিয়ে একবার সবজি চাষ করা শিখিয়েছিলেন সে সময়ের মার্কিন ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা। শিখিয়েছেন কীভাবে জীবনযাপনে স্বাস্থ্যকর রুটিন মেনে চলা যায়।

সেসেম স্কোয়ার ও তাকালানি সেসামি

২০০০ সালে নাইজেরিয়াতে শুরু হয় ‘সেসেম স্কোয়ার’-এর যাত্রা। লেখাপড়ার পাশাপাশি ম্যালেরিয়া ও এইডস রোগের ব্যাপারে শিশুদের সচেতন করার চেষ্টা চালায় সেসেম স্কোয়ার। কারণ দেশটিতে প্রতি বছর প্রায় তিন লাখ মানুষ ম্যালেরিয়ায় মারা যায়।

পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের ক্ষেত্রে পরিসংখ্যানটা আরও ভয়াবহ। একই সময়ে সাউথ আফ্রিকায় শুরু হয় ‘তাকালানি সিসামি’র যাত্রা। আর সেখানে ২০০২ সালে প্রথম পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় এইচ আইভি পজিটিভ একটি চরিত্রকে। মাপেটটির নাম কামি। কারণ বিশ্বের মধ্যে আফ্রিকাতেই এইডস রোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তাই এই রোগ সম্পর্কে শিশুদের সহজে তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

বগচ-ই-সিমসিম

বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশেই রয়েছে সিসামি স্ট্রিটের সংস্করণ। আফগানিস্তানই বা বাদ যাবে কেন। সেখানেও ২০১১ সালে শুরু হয়েছে জনপ্রিয় এই অনুষ্ঠান। আফগানিস্তানের মতো একটি সংঘাত-পীড়িত দেশে, শিশুদের মাত্র ৫০ শতাংশ স্কুলের মুখ দেখে। তাই সেখানে সিসামি স্ট্রিটের গুরুত্ব আরও অনেক বেশি। আফগানিস্তানে এই অনুষ্ঠানটির নাম ‘বগচ-ই-সিমসিম’। সেখানকার সেই অনুষ্ঠানের জনপ্রিয় একটি চরিত্রের নাম জারি। ছয় বছর বয়সী এই মেয়ে মাপেট সে স্কুলে যেতে ও খেলাধুলা করতে পছন্দ করে। জারির ভাইয়ের একটি চরিত্রও আনা হয়েছে এই অনুষ্ঠানে। তারা ক্রিকেটও খেলে। একসঙ্গে ব্যায়াম করে ও নাচে। ‘জেন্ডার ইক্যুইটি’ বা নারী-পুরুষের সমানাধিকারের একটা প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতও রাখা হয়েছে এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। সে সময়ে আফগান সিসামি স্ট্রিট প্রযোজনার উপদেষ্টা সায়েদ ফরহাদ হাশিমি জানিয়েছিলেন, আফগান শিশুদের কাছে এটাই হলো শিক্ষার একমাত্র উৎস। ধর্মীয়ভাবে রক্ষণশীল ও যুদ্ধপীড়িত এই দেশে অনুষ্ঠানটিকে নানাদিক থেকে গা বাঁচিয়ে চলতে হয়। দেশটির বাবা-মায়েরা ঠিক করেন তাদের শিশুরা কোন অনুষ্ঠান দেখবে আর কোনটা দেখবে না। বাবা-মায়ের পছন্দ না হলে তারা টিভি বন্ধ করে দেয়। তাই অনুষ্ঠানের কনটেন্ট নির্ধারণ করতে হয় বুঝেশুনে।

বিভিন্ন দেশের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্পর্শকাতরতার সঙ্গে মার্কিন সিরিজটিকে কীভাবে খাপ খাইয়ে নিতে হয়, তা তারা ভালোই জানেন। এই কাজের জন্য রাখা হয়েছে গবেষকও। রয়েছে প্রশিক্ষণের ও ব্যবস্থা। তবে সিসিমপুর বলি আর সেসেম স্কোয়ার বা বগচ-ই-সিমসিম, মূল অনুষ্ঠানটির নাম কিন্তু সিসামি স্ট্রিট। তৈরি হয়েছিল আমেরিকার শিশুদের জন্য।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত