শনিবার, ২২ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

খালাফ হত্যা

সাইফুলের ফাঁসি কার্যকর

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০১৯, ০২:৪১ এএম

ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি দূতাবাসের কর্মকর্তা খালাফ বিন মোহাম্মদ সালেম আলি (৪৫) হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত সাইফুল ইসলাম মামুনের (৪৯) ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে গতকাল রবিবার রাত ১০টা ১ মিনিটে এই রায় কার্যকর করা হয় বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন কারা তত্ত্বাবধায়ক শাহজাহান। ফাঁসি কার্যকর করে জল্লাদ রাজুর নেতৃত্ব ৫ সদস্যের জল্লাদ দল। ফাঁসি হওয়ার পর রাত ১১টায় সাইফুলের লাশ গ্রহণ করেন তার মা আলেয়া বেগম। রাতেই তারা লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীর বলেন, সাইফুল ইসলাম মামুনের দণ্ড কার্যকরের সময় তার প্রতিনিধি হিসেবে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক উপস্থিত ছিলেন।

হাইসিকিউরিটি কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক শাহজাহান আহমেদ দেশ রূপান্তরকে জানান, ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাস থেকে আসামি সাইফুল হাইসিকিউরিটি কারাগারে বন্দি। লাল কাপড়ে মোড়ানো মৃত্যু পরোয়ানা গতকাল সকালে কাশিমপুর কারাগারে পৌঁছায়। কারাবিধি অনুসরণ করে রায় কার্যকর করা হয়। সাইফুলের আত্মীয়স্বজনদের খবর দেওয়া হয় এবং তারা সর্বশেষ সাইফুলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে।

নিয়ম অনুযায়ী কারাগারের চিকিৎসক ও সিভিল সার্জন সাইফুলের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে সুস্থ ঘোষণা করেন। এরপর একজন ইমাম তাকে তওবা পড়ান। রাত ১০টা ১ মিনিটে কারা তত্ত্বাবধায়ক শাহজাহান আহমেদ তার হাতের রুমাল ফেলেন। সঙ্গে সঙ্গেই লিভারে টান দেন জল্লাদ রাজু। ১০ মিনিট ঝুলিয়ে রেখে লাশ নামানো হয়। সিভিল সার্জন আসামির দুই পায়ের রগ কেটে দেন। গোসল শেষে কাফন পরিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে করে তার লাশ গ্রামে পাঠানো হয়। 

সাইফুলের গ্রামের বাড়ি বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার মধ্য খোন্তাকাটা গ্রামে। তার বাবা প্রয়াত আবদুল মোতালেব হাওলাদার। বাগেরহাটের পুলিশ সুপার পঙ্কজ রায় গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাত ৮টা পর্যন্ত আমরা কোনো নির্দেশনা পাইনি।’

কাশিমপুর কারাগার সূত্রে জানা যায়, মৃত্যু পরোয়ানা পাওয়ার পর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের পর ফাঁসির মঞ্চ তৈরি করা হয়। ফাঁসি কার্যকরের আগে সিভিল সার্জন ডা. সৈয়দ মঞ্জুরুল হক, গাজীপুর জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মশিউর রহমান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা) আবু নাসার উদ্দিন, গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার মোহাম্মদ শরিফুর রহমান কারাগারে হাজির হয়েছিলেন। তাদের উপস্থিতিতে ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, ২০১২ সালের ৫ মার্চ মধ্যরাতে গুলশানে নিজের বাসার কাছে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান সৌদি দূতাবাসের নন-ডিপ্লোম্যাটিক স্টাফ হিসেবে কর্মরত খালাফ বিন মোহাম্মদ সালেম আলি। হত্যাকাণ্ডের দুদিন পর পুলিশ গুলশান থানায় একটি হত্যা মামলা করে। ওই মামলার তদন্তে অগ্রগতি না হওয়ায় কয়েক দফায় অসন্তোষ প্রকাশ করে সৌদি আরব। মামলার সাড়ে চার মাস পর অপর একটি অস্ত্র মামলায় চার আসামি সাইফুল, আল-আমীন, আকবর আলী ও রফিকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় খালাফ হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত পিস্তল। পরে ফরেনসিক পরীক্ষাতেও হত্যাকাণ্ডে ওই পিস্তল ব্যবহারের প্রমাণ মেলে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা খালাফকে হত্যার বিষয় স্বীকার করে।

ডিবি পুলিশ ২০১২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর পাঁচজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। এতে গ্রেপ্তার চারজনের সঙ্গে সেলিম চৌধুরী নামে পলাতক আরেক আসামির নাম উল্লেখ করা হয়। ঢাকার ৪ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মোতাহার হোসেন ২০১২ সালের ৩০ ডিসেম্বর মামলার রায় ঘোষণা করেন। ওই মামলায় পাঁচ আসামির সবাইকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশ দেওয়া হয়। আসামিদের আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের শুনানি শেষে হাইকোর্ট ২০১৩ সালের ১৮ নভেম্বর রায় দেয়। তাতে শুধু সাইফুল ইসলামের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে অপর তিন আসামি আল-আমীন, আকবর আলী ও রফিকুল ইসলামের দণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন করা হয়। পলাতক আসামি সেলিম চৌধুরীকে খালাস দেওয়া হয়। হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়, আসামিরা উদ্দেশ্যমূলকভাবে ডাকাতি করতে ওই হত্যাকাণ্ড ঘটায়।

আসামিরা জবানবন্দিতে বলে, খালাফকে হত্যা তাদের উদ্দেশ্য ছিল না। তারা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে এই হামলা করে। খালাফকে পয়েন্ট ২২ বোরের রিভলবার দিয়ে গুলি করে সাইফুল। এতে আহত হয়ে পরে মারা যান খালাফ। পলাতক আসামি সেলিমের বিরুদ্ধে তেমন কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ না থাকায় খালাস দেওয়া হয়। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালে আপিল করে আসামিপক্ষ। অস্থায়ী প্রধান বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞার নেতৃত্বে চার বিচারকের আপিল বেঞ্চ ২০১৭ সালের ১ নভেম্বর আপিল খারিজ করে দেয়। ওই রায়ের ফলে সাইফুলের মৃত্যুদণ্ড এবং তিনজনের যাবজ্জীবন সাজার আদেশ বহাল থাকে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত