রোববার, ১৪ জুলাই ২০২৪, ৩০ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

আচরণবিধি লঙ্ঘনের হিড়িক

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০১৯, ০২:২৪ এএম

দীর্ঘ ২৮ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসজুড়ে চলছে জমজমাট প্রচার। ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, বামপন্থি ছাত্র সংগঠন, কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী, স্বতন্ত্রসহ সব প্রার্থীই রয়েছেন প্রচারের মাঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) প্রশাসনের পক্ষ থেকে ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের আচরণবিধি মেনে চলতে অনুরোধ করা হলেও তা মানছেন না অধিকাংশ প্রার্থীই।

আগামী ১১ মার্চ ভোটকে কেন্দ্র করে প্রার্থীরা হলের কক্ষে কক্ষে গিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন। এছাড়া গতকাল মঙ্গলবার কলাভবন, ব্যবসা অনুষদ, অপরাজেয় বাংলা, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, হাকিম চত্বর, মধুর ক্যান্টিন, টিএসসিসহ গুরুত্বপূর্ণ সব এলাকায় প্রচার চালাতে দেখা গেছে প্রার্থীদের। বিভিন্ন পয়েন্টে লাগানো হয়েছে সাদাকালো পোস্টার। ডিজিটাল প্রচারের অংশ হিসেবে অনলাইনে বিভিন্ন পোস্টারের মাধ্যমেও প্রচার চলছে। প্রার্থীদের পক্ষে অনেককে লিফলেট বিলি করতে দেখা গেছে। পাশাপাশি প্রার্থীরা ফেইসবুক লাইভের মাধ্যমে ভোটারদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন।

প্রচারের দ্বিতীয় দিনেও ছাত্র সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ইশতেহার ঘোষিত হয়নি। তবে লিফলেটের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন অঙ্গীকার দিচ্ছেন। এদিন ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে প্রচারে ছিল ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, স্বাধিকার স্বতন্ত্র পরিষদ, প্রগতিশীল ছাত্র ঐক্য, জাসদ ছাত্রলীগ (ইনু), জাসদ ছাত্রলীগ (আম্বিয়া), স্বতন্ত্র জোট, ছাত্র মৈত্রী, বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদসহ অন্য সংগঠনের নেতাকর্মী এবং বিভিন্ন পদের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।

দুপুরে কলা অনুষদের বিভিন্ন শ্রেণিকক্ষে গিয়ে ভোট চান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও ডাকসু ভিপি পদপ্রার্থী রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন। এর আগে বিজয় একাত্তর হলের পাঠকক্ষে ঢুকে ছাত্রলীগের প্রার্থীরা প্রচার চালান। ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের আচরণবিধির ৫ (চ)-তে বলা হয়েছে, ‘পাঠদান ও পরীক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে এমন কোনো স্থানে যেমন- শ্রেণিকক্ষ, পাঠকক্ষ, পরীক্ষার হল ইত্যাদি) সভা/সমাবেশ বা নির্বাচনী প্রচারণা চালানো যাবে না।’

এদিকে রোকেয়া হল সংসদে ছাত্রলীগের মনোনীত প্রার্থীদের লিফলেটে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের আচরণবিধির ৬ (ক) তে বলা হয়েছে- ‘নির্বাচনী প্রচারণায় কোনো প্রার্থী নিজের সাদাকালো ছবি ছাড়া লিফলেট বা হ্যান্ডবিলে অন্য কারও ছবি বা প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে না।’ আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে জানতে শোভন এবং ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও ডাকসুতে সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী গোলাম রাব্বানীকে ফোন করা হলেও রিসিভ করেননি।

সকাল থেকেই ক্যাম্পাসের বিভিন্ন এলাকায় প্রচার চালাতে দেখা যায় ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান, ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার, সাধারণ সম্পাদকসহ বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী অংশ নেন। ছাত্রদলের এই তিন নেতার ছাত্রত্ব না থাকা ও বয়স ৩০-এর বেশি হওয়ায় ডাকসুর ভোটার বা প্রার্থী কোনোটিই নন। এছাড়া ছাত্রত্ব না থাকা ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী প্রচারে অংশ নেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রদল থেকে ডাকসুর জিএস প্রার্থী আনিসুর রহমান খন্দকার বলেন, ‘স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে আমাদের সিনিয়র নেতারা ক্যাম্পাসে এসেছিলেন। প্রচার চালানোর উদ্দেশ্যে তারা ক্যাম্পাসে যাননি।’ ছাত্রলীগের শেল্টারে অনেক বহিরাগত হলে থাকছে ও প্রচারে অংশ নিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ আছে বামপন্থি ছাত্রসংগঠনগুলোর প্যানেলের বিরুদ্ধেও। মঙ্গলবার বিভিন্ন দাবি সংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে শোভাযাত্রা বের করেন প্রগতিশীল ছাত্র ঐক্যের নেতাকর্মীরা। ছাত্র ঐক্যের প্যানেলে ভিপি প্রার্থী লিটন নন্দীর নেতৃত্বে বিভিন্ন পদের প্রার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। শোভাযাত্রায় বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করায় নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ আনে ছাত্রলীগ। দুপুরে ছাত্রলীগ সমর্থিত সম্মিলিত শিক্ষার্থী পরিষদের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান সনজিত চন্দ্র দাস রিটার্নিং অফিসার অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন। ডাকসু নির্বাচনের আচরণবিধির ৩(ক) ধারায় কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বা তার পক্ষে মনোনয়নপত্র জমাদান, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার বা নির্বাচনী প্রচারে কোনো ধরনের যানবাহন, মোটরসাইকেল, রিকশা, ঘোড়ার গাড়ি, হাতি, ব্যান্ড পার্টি ইত্যাদি নিয়ে শোভাযাত্রা, শোডাউন বা মিছিল করা যাবে না বলে বলা হয়েছে। তবে লিটন নন্দী অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমরা আচরণবিধি লঙ্ঘন করিনি। প্যারেড ড্রামের তালে তালে আমাদের নেতাকর্মীরা মিছিলে গান গেয়েছে। কোনো ব্যান্ড পার্টি আমরা নিয়ে আসিনি।’

আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ কে এম গোলাম রব্বানী বলেন, ‘কেউ আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা ব্যবস্থা নেব। দল-মত নির্বিশেষে সবার জন্য আমাদের বিধান একই থাকবে।’ ছাত্রলীগের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শুধু অভিযোগ করলেই হবে না, প্রমাণও লাগবে।’ ডাকসুতে ২৫টি পদে এবং হল সংসদগুলোতে ১৩টি করে পদে নির্বাচন হচ্ছে। প্রকাশিত চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা অনুযায়ী, ডাকসু নির্বাচনে ২৫ পদের বিপরীতে লড়ছেন ২২৯ জন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত