রোববার, ১৪ জুলাই ২০২৪, ৩০ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

কোথায় নেবে রাসায়নিক?

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০১৯, ০৪:০২ এএম

প্লাস্টিক দানার কারখানার জন্য পুরান ঢাকার সিদ্দিকবাজারের হাজি ওসমান গনি রোডের ৯৫ নম্বর বাড়িটি ভাড়া নিয়েছেন সাইফুল ইসলাম। তিন দিন আগে অনুমোদনহীন কারখানাটির সব রাসায়নিক দ্রব্য সরানোর নির্দেশ দিয়ে মো. এরফানের মালিকাধীন একতলা ভবনটির বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) টাস্কফোর্স। সরেজমিনে গতকাল বুধবার দেখা গেছে, এখনো ওই কারখানার মালামাল সরানো হয়নি। একই এলাকার আমীন হাজির ৯৩ ও ৯৮ নম্বর বাড়ি থেকেও সরানো হয়নি রাসায়নিক দ্রব্য। নাজিরাবাদের ভুলুর গ্যাস সিলিন্ডারের গুদামও সরেনি। শুধু সিদ্দিকবাজার নয়, গতকাল পর্যন্ত চুড়িহাট্টা, পূর্ব ইসলামবাগ, শহীদনগর ও জয়নাগ রোডের পরিষেবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন বেশিরভাগ কারখানা বা গুদামের মালামালই সরানো হয়নি।

নিমতলীর আগুনের পর কেরানীগঞ্জে রাসায়নিক পল্লী স্থাপনের জন্য দুটি জমির কথা বলা হয়। কিন্তু সেখানে এখনো জমি অধিগ্রহণ হয়নি। এর মধ্যে সোনাকান্দা মৌজায় ২০ একর জমিতে কেমিক্যাল পল্লী নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। ব্যয় বৃদ্ধির অজুহাতে ব্যবসায়ীরা এতে আপত্তি তুলেছেন। সোনাকান্দার প্রস্তাব বাতিল করা হয়েছে। পরে কেরানীগঞ্জের কোন্ডা ইউনিয়নের ব্রাহ্মণগাঁও মৌজায় কেমিক্যাল পল্লী স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়, যা জিরো পয়েন্ট থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে। এটি পরিকল্পনা কমিশনে বাস্তবায়নের অপেক্ষায় থাকায় এখনো জমি অধিগ্রহণ হয়নি। জমিগুলো এখনো বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামেই রয়ে গেছে।

২০ ফেব্রুয়ারি রাতে চুড়িহাট্টায় আগুনের পর রাজধানীর কদমতলী থানার শ্যামপুরে উজালা ম্যাচ ফ্যাক্টরির ছয় একর এবং টঙ্গীতে ইস্পাত প্রকৌশল অধিদপ্তরের ছয় একর জমিতে পল্লী গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর একটি জমি বিসিকের, অপরটি বিএসইসির দখলে। কেরানীগঞ্জে পল্লী গঠনের আগ পর্যন্ত এ দুটি জায়গায় অন্তর্র্বর্তী হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ দুটি জমিতে পল্লী গঠন এখনো প্রস্তাবেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।

সাইফুলের কারখানার কর্মচারী আল-মামুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এত মালামাল নিয়ে কোথায় যাব? জায়গা ঠিক হয় নাই, সরানো হবে কি না, তা-ও জানাননি মালিক।’ একই এলাকার রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবসায়ী সজিবুর রহমান বলেন, ‘সরকারের উচ্চপর্যায়ে ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা দেনদরবার করছেন। তাদের নির্দেশনা পাওয়ার পর আমরা জানাব সরব কি সরব না।’ প্লাস্টিক প্রস্তুতকারক ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবুল খায়ের বলেন, ‘এ বিষয়ে এখন কিছু বলতে পারব না।’

গত ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে চকবাজারের চুড়িহাট্টায় রাসায়নিক অগ্নিবিস্ফোরণের ঘটনায় এ পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছে ৭১ জন। এরপর পুরান ঢাকার আবাসিক এলাকা থেকে ব্যবসায়ীদের রাসায়নিক দ্রব্য সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এতে ব্যবসায়ীরা সাড়া না দেওয়ায় অভিযান নামে ডিএসসিসির রাসায়নিকবিরোধী টাস্কফোর্স। ধারাবাহিক এ অভিযানের পঞ্চম দিন গতকাল ১৮টি হোল্ডিংয়ের পরিষেবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। এ নিয়ে পাঁচ দিনে ৯৪টি হোল্ডিংয়ের পরিষেবা বিচ্ছিন্ন করা হলো। আগামী ১ এপ্রিল পর্যন্ত অভিযান চলবে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ডিএসসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা উত্তম কুমার রায় জানান, গতকাল পুরান ঢাকার ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের হাজারীবাগের মনেশ্বর রোড, ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের উর্দু রোড ও হোসেনি দালান, ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের আগামসি লেন, ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের আওলাদ হোসেন লেনসহ বিভিন্ন এলাকায় চালানো অভিযানে ১৮টি হোল্ডিংয়ের পরিষেবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়।

স্থানীয়রা বলছে, পরিষেবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পরও তোয়াক্কা করছেন না ব্যবসায়ীরা। উল্টো টাস্কফোর্সের অভিযানকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে বিক্ষোভ করছেন। কর্মকর্তাদের অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনাও ঘটিয়েছেন। তারা আরও জানায়, বাড়ির মালিকেরাই ভাড়াটে ব্যবসায়ীদের সরে যেতে নিরুৎসাহিত করছেন। পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক দ্রব্যের বাজার সরিয়ে নিলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা থেকেই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একজোট হয়ে এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন তারা।

লালবাগ জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার কামাল হোসেন বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা মুখে মুখে কেমিক্যাল সরানোর কথা বললেও গোপনে বিরোধিতা করছেন। অন্যের বাড়িতে অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে টাস্কফোর্স কর্মকর্তাদের সহায়তা করলেও নিজের বাড়ির গোডাউন উচ্ছেদে বাধা দিচ্ছেন ব্যবসায়ী ও বাড়ির মালিকেরা।’

চুড়িহাট্টার আজগর লেনের ব্যবসায়ী দিদারুল আলম বলেন, ‘আমরা সরিয়ে কোথায় রাখব? সরকার জায়গা ঠিক করুক, তারপর দেখা যাবে।’ ওকে..

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত