সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪, ৩০ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

নবীনদের দিয়ে ‘নকল’ লাইন

আপডেট : ১২ মার্চ ২০১৯, ০৩:৫৫ এএম

সোমবার দুপুর দেড়টা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের প্রবেশপথ। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো শিক্ষার্থীরা কেউ মুঠোফোনে ব্যস্ত, কেউ ব্যস্ত আলাপচারিতায়। এলোমেলো ও অলস ভঙ্গিতে দাঁড়ানো ৩৫ থেকে ৪০ শিক্ষার্থীর ভোট দেওয়া নিয়ে দৃশ্যত কোনো তাড়া ছিল না। প্রবেশপথে শুরু হওয়া এই লাইনের শেষ মাথা থেকে অন্তত ৫০ গজ দূরে ছিল বুথ। বুথের আগে এত ফাঁকা কেন জানতে চাইলে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরের (বিএনসিসি) এক সদস্য জানালেন, হলের প্রবেশ গেটে নকল লাইন। মাঝখানে তাই ফাঁকা। বিএনসিসির ক্যাডেট আরও কিছু বলতে চাইলে অন্য একজন সরিয়ে নিলেন। তার কথার সূত্র ধরে ভোটগ্রহণের সেই বুথ পাওয়া গেল। সেখানে প্রবেশের আগে আর্চওয়ে ঘিরে ছিল ‘হল শাখা ছাত্রলীগ’ নেতাকর্মীদের জটলা। সেখানকার একজন ধমকের সুরে অন্যদের বললেন, ‘এই তোরা এখান থেকে সরে যা। গেটের লাইনে দাঁড়া! কাউকে ঢুকতে দিবি না।’

সে কথা শুনে বুথের ভেতর থেকে একজন মধ্যবয়সী লোক বেরিয়ে এলেন, যাকে দেখে উপস্থিত সবাই ‘স্যার স্যার’ বলে সম্বোধন করলেন। সেই ব্যক্তি পরামর্শ দিলেন, ‘তোমরা এখানে এমন কোরো না। সাংবাদিকরা এসব ছবি পেলে আমাদের দুর্নাম হবে।’

এরপরই উপস্থিত যুবকদের একজন আর্চওয়ের পাশে দাঁড়ানো অবস্থায় এই প্রতিবেদকের পরিচয় জানতে চান। সাংবাদিক পরিচয় পেয়েই তিনি বলতে থাকেন, ‘এখানে আপনি কেন?  চলে যান!’ এরপরই অন্যদের নির্দেশ দিয়ে বললেন, ‘এই সাংবাদিককে পথ দেখিয়ে বাইরে নিয়ে যা!’ তার কথামতো দুজন এসে দুই হাত ধরে হলের প্রবেশ গেট পর্যন্ত নিয়ে যান।

গেটে এসে সেই লাইনের সামনে দাঁড়াতেই একজন ভোটার হন্তদন্ত হয়ে ঢুকতে চাইলেন। তাকেও আটকালেন লাইনে দাঁড়ানো শিক্ষার্থীরা। কেউ বললেন, ‘সবার পেছনে দাঁড়ান।’ কেউ বললেন, ‘ভোট শেষ।’ কিছুক্ষণ পর হল প্রাধ্যক্ষের একজন কর্মচারী গেটের সামনে এসে ভোটারদের ভোট দিতে ডাকাডাকি করতে লাগলেন। তার ডাকাডাকিতে গেটে দাঁড়ানো একজন বলতে লাগলেন, ‘আপনের ডাকাডাকি করতে হবে না, যান। আমরা আছি।’ এরপর ওই কর্মচারী যাওয়ার পরই হলের কলাপসিবল গেট বন্ধ হয়ে যায়। শুধু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের নয়, গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সরেজমিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ, জিয়া, স্যার সলিমুল্লাহ (এসএম), বিজয় একাত্তর, মুহসীন ও স্যার এ এফ রহমান হলের ভোটকেন্দ্র ঘুরে এমন দৃশ্য ও তথ্য পাওয়া গেছে। ভোটারদের এসব লাইন তদারকিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কাউকে দেখা যায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, বেশিরভাগ হলের গণরুম ও বারান্দায় থাকা প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের সকাল সাড়ে ৭টা থেকেই লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখেন ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা। কৃত্রিম জটলা সৃষ্টি করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করেন অনাবাসিক ও অপরিচিত সাধারণ শিক্ষার্থীদের। এর মধ্যে ছাত্রলীগের প্যানেলে ভোট প্রদানকারীদের লাইনের বাইরে থেকে সরিয়ে লাইন ছাড়াই ভোট প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। যেসব ভোটারের ছাত্রলীগের বিপক্ষে যাওয়ার শঙ্কা ছিল তাদেরই মূলত আটকানোর কৌশল হিসেবে এই নকল লাইন দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এভাবে সকাল থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে নকল ভোটার লাইন তৈরি করা হয়। এ ছাড়া হলের বাইরে থেকে বুথ পর্যন্ত বিভিন্ন পয়েন্টে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে অবস্থান নেন। নতুন কাউকে দেখলেই দফায় দফায় জেরা করেন। জেরার মুখে তাদের অনুকূলে মনে হলে লাইনে দাঁড়ানোর অনুমতি দেন, অন্যথায় হলের বাইরে থেকেই ফিরিয়ে দেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এ এফ রহমান হলের প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সকাল ৮টায় লাইনে দাঁড়িয়েছি। প্রায় এক ঘণ্টায় এক কদমও এগোতে পারিনি।’ একই হলের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘সকাল ৭টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে একই জায়গায় আছি। ভেতরে কী হচ্ছে, কিছুই বুঝতে পারছি না।’ এসব বিষয়ে হলের প্রাধ্যক্ষ সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তাদের অভিযোগ সত্য নয়। একযোগে ১৫টি বুথে ১৫ জন করে ভোটার যাচ্ছে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত