মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

আল্লাহতায়ালার রহস্যময় সৃষ্টি চাঁদ

আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০১:০৯ এএম

কাজল কালো রাতের আকাশে অজস্র তারকার মধ্যখানে রুপার থালার মতো উজ্জ্বল যে বস্তুটি রাতভর তার স্নিগ্ধ আলোয় আলোকিত করে রাখে পুরো পৃথিবীকে, তার নাম চাঁদ। চাঁদকে চেনে না কে? চাঁদকে আমরা অনেক নামেই চিনে থাকি। এই যেমন চন্দ্র, চন্দ্রিকা, শশী ইত্যাদি। ইংরেজিতে চাঁদকে বলা হয় মুন। আর পবিত্র কোরআনে চাঁদের নাম রাখা হয়েছে ক্বামার। ক্বামার নামে পবিত্র কোরআনে একটি সুরাও আছে। নতুন চাঁদকে আরবি ভাষায় অবহিত করা হয় হেলাল বলে। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের মানুষজন বিভিন্ন ভাষায় চাঁদকে বিভিন্ন নামে ডাকেন। সত্যিই! চাঁদ আমাদের সবার কাছে অতি আদরমাখা একটি নাম। পৃথিবীতে এমন লোকের সংখ্যা খুব কমই হবে, চাঁদ যাদের তার মায়াবী জোছনায় বিমোহিত করেনি।

চাঁদের সৃষ্টির তথ্য নিয়ে আমাদের মধ্যে মত-দ্বিমতের শেষ নেই। বিজ্ঞানীরা বলেন, চাঁদ পৃথিবীরই একটি অংশ। মহাবিস্ফারণের ফলে এর জন্ম হয়েছে। তারা মনে করেন চাঁদ তৈরি হয়েছে একটি ছোট গ্রহের সঙ্গে পৃথিবীর ধাক্কা লাগার কারণে। এই সংঘর্ষের ফলে পৃথিবীর যে ধ্বংসাবশেষ হয়েছে, সেই ধ্বংসাবশেষগুলো পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকে। ঘুরন্ত সেই মেঘগুলোই একপর্যায়ে জমাটবদ্ধ হয়ে চাঁদে পরিণত হয়।

এবার আসুন জেনে নিই এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআন কী বলে। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘কল্যাণময় তিনি, যিনি নভোম-লে রাশিচক্র সৃষ্টি করেছেন এবং তাতে রেখেছেন সূর্য ও দীপ্তিময় চন্দ্র।’ (সুরা আল ফুরকান, আয়াত : ৬১)

চাঁদকে কেন্দ্র করে যেমন রূপকথার শেষ নেই, তেমনি শেষ নেই উপ-কথারও। পাশ্চাত্য দেশের মানুষরা মনে করতেন, ‘চাঁদে একটা মানুষ আছে, আর সে মানুষটি প্রায় চাঁদের সমান বড়। প্রাচীন যুগের কিছু মানুষ মনে করতেন, চাঁদ প্রত্যেক রাতে মরে গিয়ে ছায়ার জগতে মিলিয়ে যায়। আবার কেউ কেউ মনে করতেন, সূর্য আর নক্ষত্রের মতো চাঁদও বুঝি তাদের আরেকটি দেবতা। চাঁদকে তারা নাম দেন চন্দ্রদেব।

চাঁদ নিয়ে আমাদের মধ্যেও একটি ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। আর তা হচ্ছে চাঁদের গায়ের কালো দাগগুলো নিয়ে। আমরা অনেকেই মনে করে থাকি এই দাগগুলো বুঝি চাঁদের কলঙ্ক। চাঁদের কোনো কলঙ্ক থাকার প্রশ্নই আসে না। আর এটি বিজ্ঞানীরাও প্রমাণ করেছেন। তারা বলেছেন, চাঁদের পিঠ অত্যন্ত এবড়োখেবড়ো। সেখানে কালো কালো দাগ আছে। এই দাগগুলোই আমাদের কাছে চাঁদের কলঙ্ক মনে হয়। এখানে অজ্ঞানতাবশত অনেকেই আবার বলে থাকেন, রাসুল (সা.) যে চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করেছিলেন, সেই খণ্ডিত অংশের মিলনস্থলের দাগগুলোই চাঁদের কলঙ্ক। যারা এমন মনে করেন তাদের চিন্তায় যথেষ্ট ভ্রান্তি রয়েছে। হ্যাঁ এটা চিরসত্য যে, মহানবী (সা.)-এর হাতের ইশারায় চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হয়েছে। আর তা হয়েছে আল্লাহর হুকুমেই। এখন প্রশ্ন হলো যে, আল্লাহ চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করেছেন, সে আল্লাহ কি আবার এই চাঁদকে নিখুঁতভাবে জুড়তে পারেন না?

চাঁদ পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ, যেটি আমাদের সবচেয়ে নিকটতম প্রতিবেশী। যদিও ১৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, গ্রিক জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিপ্পার্কাস (১২০-১৯০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে) ত্রিকোণমিতির প্রণালি দিয়ে পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব হিসাব করে দেখিয়েছেন যে, পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব ৩৮৪,৪০০ কিলোমিটার।

আচ্ছা ভাবুন তো! যদি সৃষ্টিজগতে না থাকত এই রুপালি চাঁদখানা, তাহলে কেমন হতো এই রাতের পৃথিবী? কেমন হতো পৃথিবীতে বসবাসকারীদের অবস্থা? এই যে পৃথিবীর সবকিছু এখন যেভাবে চলছে, তা কি এই একই নিয়মতন্ত্রে চলত? না, চলত না। যদি না থাকত এই চাঁদখানা, তাহলে বদলে যেত আমাদের চারপাশের চিরাচরিত অনেক কিছুই। সমুদ্রে থাকত না কোনো জোয়ারভাটা। জমিতে ফলত না সোনার ফসল। সুতরাং চাঁদকে শুধু আকাশে ঝুলিয়ে রাখা একটি গোলাকার আলোর বল হিসেবে ধারণা করলে তা হবে আমাদের জন্য শুধুই বোকামি। কেননা মহান আল্লাহতায়ালা তার বান্দাদের আরও নানা প্রয়োজনের সুবিধার্থেই এই চাঁদকে সৃষ্টি করেছেন।

চাঁদের স্নিগ্ধ কিরণ রাতের অন্ধকারে প্রাণিজগতের জন্য যেমন প্রদীপের মতো আলো বিতরণ করে, তেমনি তা মরুপ্রান্তরে রাতের যাত্রীকে পথনির্দেশ করে। চাঁদের অন্যতম উপকারিতা হলো, এর মাধ্যমে মানুষ বছর গণনা ও সময়ের হিসাব জানতে পারে। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘তিনিই (আল্লাহ) সূর্যকে করেছেন তেজস্কর এবং চন্দ্রকে করেছেন কিরণদীপ্ত আর এর জন্য মঞ্জিল (তিথি) নির্দিষ্ট করেছেন, যাতে তোমরা বছর গণনা ও সময়ের হিসাব জানতে পারো।’ (সুরা ইউনুস, আয়াত : ৫)

চাঁদের নির্মল আলো মানুষের মনকে আকর্ষণ করেছে চিরকাল। শান্ত নদীর প্রান্তজুড়ে শুভ্র কাশবনে জোছনার উথলে ওঠা ঢেউ, কিংবা মেঠোপথের দুধারে ঘুমন্ত বৃক্ষপুঞ্জে চাঁদের রুপালি আলোয় যে চিত্র অঙ্কিত হয়, তা কি মনের গহিনে দাগ কাটার মতো নয়? চাঁদের এই বিমোহিত রূপ জাগিয়ে তোলে ঘুমন্ত কবিসত্তা। তাই চাঁদ আর চাঁদের আলো নিয়ে কবিরা রচনা করেন অসংখ্য কবিতা, সাহিত্যিকরা রচনা করেন গল্প-উপন্যাস।

চাঁদ নিয়ে কবি লিখেছেন

বেবিলেন কোথা হারায়ে গিয়েছে

মিসর ‘অসুর’ কুয়াশার কালো

চাঁদ জেগে আছে আজও অপলক

মেঘের পালকে ঢালিছে আলো।

চাঁদের জোছনায় ধৌত হয় মুমিনের হৃদয়। হৃদয় মিনারে সুর বাজে প্রভুবন্দনার। মুমিনের আঁখিযুগল যতবার এই চাঁদের দিকে তাকায়, ততবারই মনে পড়ে প্রিয় নবীর সেই অমিয় বাণী। যে বাণীতে স্বপ্ন আছে প্রভু দর্শনের। জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক রাতে আমরা রাসুল (সা.)-এর কাছে ছিলাম। হঠাৎ তিনি পূর্ণিমা রাতের চাঁদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘শোনো! নিশ্চয় তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে তেমনি স্পষ্ট দেখতে পাবে, যেমন স্পষ্ট এই চাঁদকে দেখতে পাচ্ছো। তাকে দেখতে তোমরা কোনো ভিড়ের সম্মুখীন হবে না।’ (বুখারি শরিফ, হাদিস : ৫৫৪)

চাঁদ বা চাঁদের আলো নিয়ে যদিও আমাদের মধ্যে আগ্রহের কমতি নেই। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, চাঁদের নিজস্ব কোনো আলো নেই। আমরা চাঁদের যে আলো দেখি তা আসলে চাঁদের আলো নয়, তা হচ্ছে সূর্যের আলো। সূর্য থেকে প্রায় ১৫০ মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চাঁদ। তাই সূর্যের আলো যেমন উজ্জ্বল, চাঁদের আলো সে রকম উজ্জ্বল নয়।

মূল বিষয় হচ্ছে চাঁদ মহান আল্লাহতায়ালারই একটি সৃষ্টি- এটি বিনাবাক্যে মেনে নেওয়া। আর এটাই মুমিনের পরিচায়ক। তা ছাড়া চাঁদ বলি আর সূর্য বলি, এসবকিছুই তো এক দিন আলোহীন হয়ে যাবে। পবিত্র কোরআনে তো বলাই আছে, ‘যেদিন সূর্যকে আলোহীন করা হবে।’ (সুরা তাকভীর, আয়াত : ১)

এখানে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কিয়ামতের সেই বিভীষিকার কথা বলেছেন। সেদিন সূর্যের আলোকে মøান করে দেওয়া হবে। সুতরাং সৌরজগতের মূল কেন্দ্রবিন্দু সূর্যকেই যখন আলোহীন করে দেওয়া হবে, তখন তার গ্রহ-উপগ্রহগুলোও আলোহীন হয়ে যাবে। সেদিন চোখের পলকে সবকিছু ওলট-পালট হয়ে যাবে। যেসব নির্বোধ আল্লাহর এমন সৃষ্টি-নৈপুণ্য, মহাকৌশল এবং সৃষ্টির অনুপম সৌন্দর্য দেখে আল্লাহর সামনে মাথানত না করে, আল্লাহর সৃষ্টি চন্দ্র-সূর্যের কাছে নত করে। সেদিন তাদেরই জাহান্নামের অতলান্তে নিক্ষেপ করা হবে। শুধু তা-ই নয়, মুসাদ্দাদ (রহ.) হজরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর সূত্রে রাসুল (সা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ‘কিয়ামতের দিন চন্দ্র ও সূর্য উভয়কেই লেপ্টে দেওয়া হবে।’ (মুসলিম : ২৯৭৩, ইফা.)

চাঁদের নির্মল আলো শুধু পৃথিবীকেই আলোকিত করে না, আলোকিত করে মানুষের মননকেও। তাই আসুন এই চাঁদের নির্মল আলোর মতোই আমাদের ভেতর ও বাহিরকে আলোকিত করি। আলোকিত করি আমাদের চিন্তা-চেতনাকে। আর যে স্রষ্টা এই রহস্যঘেরা চাঁদকে সৃজেছেন, সেই স্রষ্টার প্রেমে নিজেকে করি উজাড়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত