মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

সরকারের সাফল্য ও বিরোধী দল

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২০, ১১:১৭ পিএম

কোনো কোয়ালিশন হিসেবে নয়, একক শক্তি হিসেবে দেশ চালাচ্ছে আওয়ামী লীগ। পরপর তিন মেয়াদে দলটি সরকার পরিচালনার সুযোগ পেয়েছে। সত্যিকার অর্থে বিরোধী দল বলে কিছু নেই। যেখানে যতটুকু আন্দোলন সংগ্রামের সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে, তাও ছলে-বলে-কৌশলে নির্মূল করে দেওয়া হচ্ছে। দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে তেমন কোনো বাধা নেই। সেই হিসেবে দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতি হওয়ার কথা দ্রুততালে। কিন্তু তা হচ্ছে কি? অর্থমন্ত্রী যাই বলুন, অর্থনীতি কিন্তু অন্ধকারে। সীমান্তজুড়ে বৈরিতা। আগামী দিনে শিক্ষানীতি কী হবে, তাতে চরম অনিশ্চয়তা। গরিব কৃষকের অস্তিত্ব বিপন্ন।

মহাভারতের অন্যতম প্রধান চরিত্র ভীষ্মদেব বলেছিলেন, ‘শাসক কখনো পরিস্থিতির ক্রীতদাস হবে না, বরং তার কর্মের মধ্যে দিয়ে অন্যকে বানাবেন।’ কিন্তু আমরা যেন কেবলই পরিস্থিতির দোহাই দিচ্ছি।

কোয়ালিশন সরকারে যা হয়, আর পাঁচটা দলের নেতাদের শর্ত মানতে মানতেই বেলা কেটে যায়। পদে পদে চলে শরিকদের সঙ্গে স্বার্থের সংঘাত। এতে পণ্ড হয় কাজ। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে আমাদের দেশে পরিস্থিতি ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়েছে। আজ পেছন থেকে কোনো অন্তরাত্মা নয়, কোনো চতুর নেতা নয়, কোনো শরিক নেতার অঙ্গুলিহেলন নয়, গোটা দেশটা চলছে একটি দলের একচ্ছত্র নেতৃত্বে।

তবু এ পরিস্থিতিতে দেশটা কি ভালো আছে? অর্থনীতি? পররাষ্ট্রনীতি? অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষার পরিবেশ, সব ভালো চলছে তো? কী বলছে পরিসংখ্যান? যত বড় সরকার ভক্তই হোন না কেন, গত পাঁচ বছরে অর্থনীতি এগিয়েছে, সমৃদ্ধির বসন্ত শুরু হয়ে গিয়েছে, এ কথা বলার মতো লোক মিলবে কি?

হ্যাঁ, দেশে কোটিপতির সংখ্যা, কোটিপতি ব্যাংক আমানতকারীর সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু তার চেয়ে বৈষম্য বেড়েছে অনেক বেশি। মধ্যবিত্ত কৃষক গরিব কৃষকে পরিণত হয়েছে অনেক। ভূমিহীন মানুষের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ছিন্নমূল, নদীভাঙা মানুষের শহরমুখী স্রোত গত কয়েক বছরে কতটা বেড়েছে, আয়বঞ্চনা ও মূল্যবৃদ্ধির কারণে গরিব মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা কতটুকু পূরণ করতে পারছে, সে খবর কি কেউ রাখে। এগুলোর কোনো পরিসংখ্যানও নেই।

করোনা মহামারীর জেরে বিশ্বে দেখা দিয়েছে মন্দা পরিস্থিতি। প্রায় সব দেশের অর্থনীতিই জোর ধাক্কা খেয়েছে। বাংলাদেশও কর্মহীন হয়ে পড়েছে কয়েক লাখ মানুষ। সম্প্রতি বিশ্ব ব্যাংকের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনার জেরে ভয়ংকর আর্থিক দুর্দশার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে গোটা দেশ। বিশেষত ধাক্কা খেয়েছে রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রাম। ওই দুই শহরাঞ্চলে কর্মরত প্রায় ৬৮ শতাংশ মানুষ এ মহামারীকালে চাকরি খুইয়েছে। প্রতিবেদনমতে, শুধু রাজধানী ঢাকাতে করোনাকালে চাকরি হারানোর হার ৭৬ শতাংশ। বন্দরনগরী চট্টগ্রামে কাজ হারিয়েছে ৫৯ শতাংশ মানুষ। দিন আনা-দিন খাওয়া মানুষদের রোজগার কমেছে ভয়াবহ হারে। ৯০ শতাংশের বেশি ব্যবসায়ীদের আয়, স্বাভাবিক কারণেই কমেছে ভয়ংকরভাবে। দৈনিক বেতনভুক নারী কর্মচারীদের রোজগারে ধাক্কা লেগেছে অপেক্ষাকৃত বেশি। এর সঙ্গে তাল মেলাতে খাওয়া-খরচ কমিয়ে ফেলেছে প্রায় ৬৯ শতাংশ পরিবার।

এদিকে বাংলাদেশে ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে করোনা পরিস্থিতি। কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশে সংক্রমণের হার নিম্নমুখী হলেও এ হার এখনো স্বস্তিকর মাত্রায় পৌঁছায়নি। এর মধ্যে সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কার কথা বলা হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সম্প্রতি রোডম্যাপ তৈরি করার পরামর্শ দিয়েছে কভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি। সেখানে উল্লেখ করা হয়, কভিড-১৯ সংক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়ে চ্যালেঞ্জ থাকলেও বর্তমানে পরীক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং হাসপাতালের সেবার পরিধি ও মান উন্নয়ন করা হয়েছে। তবে যেসব দিকে এখনো ঘাটতি রয়েছে, সেগুলো পূরণ করে পূর্ণ প্রস্তুতি নিতে হবে। কিন্তু বাস্তবে তেমন কোনো উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে না।

করোনার কারণে অর্থনীতিতে মহাদুর্যোগ চলছে। গত ৫০ বছরে এত বড় চ্যালেঞ্জ দেশের অর্থনীতির সামনে আসেনি। কিন্তু মন্ত্রী-আমলাদের কথায়-আচরণে তার কোনো প্রতিফলন নেই। অপব্যয়, দুর্নীতি কমানোর কোনো কঠোর অঙ্গীকার কোথাও দেখা যাচ্ছে না। যেভাবে ব্যবসা মার খাচ্ছে তাতে সরকারি চাকুরে বাদে আর কজনের রোজগার আগের মতো থাকবে, তা বলা মুশকিল। আর এর কারণ শুধু করোনা নয়। মহামারীর আগে থেকেই দেশের আর্থিক বুনিয়াদের ওপর ‘ম্যান মেড’ আঘাত নামিয়ে আনা হয়েছে।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও তেমন কোনো সাফল্য নেই। সবকিছু উজাড় করে দিয়েও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত হয়নি। কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়া যার বড় নজির। অভিন্ন নদীর পানির বণ্টন তো দূরের কথা, সীমান্ত হত্যা পর্যন্ত বন্ধ করা যায়নি। যতটুকু যা বাণিজ্য বাড়ছে, তা একপক্ষীয়। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান নিয়েও তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি হয়েছে, দেশে বাড়ছে বিপুল পরিমাণে চীনা বিনিয়োগ, কিন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারকে চাপ দেওয়ার ব্যাপারে চীন-রাশিয়া বাংলাদেশের প্রস্তাব ও স্বার্থের বিপরীতেই অংশ নিচ্ছে। পররাষ্ট্রনীতির এ অধ্যায়কে কোনোভাবেই গৌরবোজ্জ্বল বলা যায় না।

রুটি সেঁকার জন্য তাওয়া গরম করতে হয়। আবার সেই তাওয়া বেশি তেতে গেলে রুটি যায় পুড়ে। তখন খাবারের থালার বদলে রুটির জায়গা হয় ডাস্টবিনে। রাজনীতিতেও তেমনটাই। মানুষজনকে চাঙ্গা করার জন্য নেতারা গরম গরম ভাষণ দেন। কিন্তু তা মাত্রা ছাড়ালে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেয়। পাতে তোলে না। বলতে বাধা নেই, কথায় ও কাজে মিল না থাকার কারণে ক্ষমতাসীনদের প্রতি ক্ষোভের মাত্রা ক্রমেই বাড়ছে। নির্বাচন ব্যবস্থা প্রহসনে পরিণত হওয়ার কারণে মানুষের এই ক্ষোভের হয়তো আপাতত প্রতিফলন নেই। কিন্তু শাসকদের তা বুঝতে না পারার কোনো কারণ নেই। এদিকে দেশে বিরোধী দলের অস্তিত্ব যেন কোনো এক অন্ধকার গহ্বরে হারিয়ে গেছে। দেশের অন্যতম জনপ্রিয় দল বিএনপিকে এখন আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। বিএনপি অবশ্য নিজের দোষেই এমন পরিণতি বরণ করেছে। জামায়াতের সঙ্গে মিলে বিএনপির হিংসাত্মক আন্দোলন দলটিকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করে। প্রতিবাদ হিংসার পথ নিলে দিকভ্রষ্ট হয় আন্দোলন। তখন লক্ষ্যকে ছাপিয়ে বড় হয়ে যায় উপলক্ষ। এ কথা প্রমাণ হয়েছে বারে বারে। সাফল্যের কোনো শর্টকাট রুট নেই। সাফল্য আসে ধারাবাহিকতার হাত ধরে। ধারাবাহিক ও সংযত আন্দোলনেই পূরণ হয় উদ্দেশ্য। অবিরাম বৃষ্টিধারা মাটির একটার পর একটা স্তর ভেদ করে ধীরে ধীরে পৌঁছায় গভীরে। পুষ্ট করে ভূগর্ভস্থ জলাধার। সেই বিশুদ্ধ জলই মানুষের জীবন বাঁচায়। আন্দোলনও তেমনই। ধারাবাহিক আন্দোলন মানুষের মনের গভীরে জায়গা করে নেয়। সুরক্ষা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার ভরসা জোগায়।

রাজনীতিতে গরম গরম কথা, হিংসাত্মক আন্দোলন, কদর্য ভাষার প্রয়োগ দেউলিয়াপনার লক্ষণ। উসকানিমূলক ভাষণ ও ব্যক্তি আক্রমণে স্তাবকদের হাততালি পাওয়া যায়, কিন্তু সাধারণ মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেয়। কারণ রাজনীতির চাওয়া-পাওয়ার বাইরে অসংখ্য মানুষ আছে, যারা শান্তি ছাড়া আর কিছুই চায় না।

বড় হওয়ার সর্বোত্তম রাস্তা নিজের উৎকর্ষ বৃদ্ধি। অন্যকে ছোট করে বড় হওয়ার চেষ্টা ভুল এবং বিপজ্জনক। কিন্তু রাজনীতিতে দিন দিন সেটাই জনপ্রিয় হচ্ছে। সমালোচনা করলেই হেনস্তার চেষ্টা। কমবেশি সব দলেই। ইতিহাস শুধু কিছু অতীত ঘটনার সাক্ষীই নয়, শিক্ষাও দেয়। কী করা উচিত আর কোনটা এড়িয়ে চলা দরকার, ইতিহাস সেই শিক্ষাও দেয়। কিন্তু কেউ শিক্ষা নেবে কি না, সেটা নিতান্তই তাদের নিজস্ব ব্যাপার।

লেখক লেখক ও কলামনিস্ট

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত