মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

মুক্তিযোদ্ধাকে পিটিয়ে হত্যা

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২০, ১০:৫৯ পিএম

সমাজে সংঘাত-সহিংসতা বাড়তে থাকলে যেসব গণ-মনোবিকার দেখা দেয় তার রূপটিও মারাত্মক সব সহিংস ঘটনার মধ্য দিয়ে সামনে আসে। দশকের পর দশক ধরে দেশে লাগাতার নির্যাতন-নিপীড়ন, ধর্ষণ-দলবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, গণপিটুনিতে হত্যা, গুম-খুন-বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে চলেছে। এ ধরনের সব সহিংসতারই মারাত্মক প্রভাব পড়ে জনমানসে। আজকাল তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশের ফলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সংবাদ মাধ্যমে এসব সহিংস ঘটনার খবর এবং ছবি-ভিডিও মুহূর্তেই হাতে হাতে ছড়িয়ে পড়ছে। এর মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন সমাজে ভীতি বা ত্রাস সঞ্চারিত হচ্ছে, আরেকদিকে এসব সহিংসতা বা অপরাধের যথাযথ বিচার ও শাস্তি না হওয়ায় সমাজে এই বার্তাও ছড়িয়ে যাচ্ছে যে, অপরাধীরা ক্ষমতাবান হলে যে কোনো কিছু করেই পার পাওয়া যায়। অপরাধের সাজা না হওয়ার এই বাস্তবতাকে মানবাধিকারকর্মীরা এক কথায় ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’ বলে থাকেন। অন্যদিকে, সমাজ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন সমাজে বৈষম্য বাড়তে থাকা, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, ভয় আর ত্রাসের সংস্কৃতি  জনগণকে আইনের প্রতি আস্থাহীন করে তোলে এবং এমন আস্থাহীনতা থেকে গণ-মনোবিকার দেখা দেয়। এই গণ-মনোবিকার এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে যেমন এক শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, তেমনি সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জের ধরে গ্রাম্য সালিশে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে ষাটোর্ধ্ব এক বীর মুক্তিযোদ্ধাকে।

গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারীতে আবু ইউনুস মোহাম্মদ শহীদুন্নবী নামের ৫০ বছর বয়সী এক শিক্ষক-গ্রন্থাগারিককে দলবদ্ধভাবে পিটিয়ে হত্যা করে লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা নিয়ে সারা দেশে যখন তোলপাড় চলছে তার দুদিন পরই টাঙ্গাইলের বাসাইলে এক মুক্তিযোদ্ধাকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটল। রবিবার দেশ রূপান্তরে ‘গ্রাম্য সালিশে মুক্তিযোদ্ধাকে পিটিয়ে হত্যা’ শিরোনামের প্রতিবেদনে ৬৫ বছর বয়সী মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফ খানকে হত্যার খবর প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার হাবলা ইউনিয়নের মটরা গ্রামে গত শুক্রবার সন্ধ্যায় হত্যাকা-ের ঘটনাটি ঘটে। নিহত মুক্তিযোদ্ধা লতিফ খান কাদেরিয়া বাহিনীর সদস্য হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, কিছুদিন যাবৎ লতিফ খানের সঙ্গে প্রতিবেশী আবু খান ও তার ছেলে পাভেল ও পারভেজের পুকুরের মাছ নিয়ে বিরোধ চলে আসছিল। বিষয়টি মীমাংসার জন্য ইউপি সদস্য শাহজাহান খানের বাড়িতে আয়োজিত সালিশের মধ্যেই লতিফ খানকে পিটিয়ে ও গলাটিপে জখম করা হয়। পরে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

তুচ্ছ বিষয় নিয়ে বিরোধ কিংবা আধিপত্য বিস্তার ও ক্ষমতার দাপট দেখাতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর হামলা, মারধর এমনকি হত্যার ঘটনাও বিরল নয়। বিগত কয়েক বছরেই সংবাদ মাধ্যমে এ ধরনের ঘটনার বহু প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। চলতি বছরের ২৭ আগস্ট কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার রাজারখলা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা সামছুল হককে বেধড়ক মারধর করে তাকে গুরুতর আহত করে এবং তার বাড়িতে প্রবেশের রাস্তা কেটে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে দেয় স্থানীয় প্রভাবশালীরা। তার আগে এ বছরের জানুয়ারিতে খুলনার ডুমুরিয়াতে সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত জমির সীমানা সংক্রান্ত বিরোধে মুক্তিযোদ্ধা শেখ মোশারফ হোসেন (৬৯) এবং তার স্ত্রী ও ছেলেকে বেধড়ক মারধর করে ছেলেটির কান ছিঁড়ে নেয়। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার উত্তর জয়পুর ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে নুর মোহাম্মদ (৭০) নামের এক মুক্তিযোদ্ধাকে মারধর করে শৌচাগারে আটকে রাখা হয়েছিল। প্রতিটি ঘটনাতেই জড়িতরা ছিলেন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী।

দেশের সাম্প্রতিক সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলবদ্ধ ধর্ষণ কিংবা একের পর এক গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনা এবং এমন সহিংসতার নেপথ্যে থাকা গণ-মনোবিকারকে তাই খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এক পরিসংখ্যানের বরাতে বিবিসি বাংলা জানাচ্ছে, বাংলাদেশে ২০১১ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত গণপিটুনিতে অন্তত ৮০০ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। অর্থাৎ প্রতি বছর ১০০ মানুষ এমন দলবদ্ধ সহিংসতার শিকার হয়ে মারা গেছেন। কখনো ছেলেধরা, কখনো ডাকাত বা চোর সন্দেহে ওই ব্যক্তিদের পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। এখন ধর্ম অবমাননার অভিযোগে কিংবা সম্পত্তির বিরোধে এমন দলবদ্ধ হত্যাকা- ঘটানো হচ্ছে। ফলে সমাজে এই বার্তা প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করা জরুরি যে অপরাধ যা-ই হোক না কেন কোনো অবস্থাতেই কাউকে শারীরিকভাবে আঘাত করা যাবে না, কোনো অবস্থাতেই কাউকে হত্যা করা যাবে না। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যে নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করল সে যেন পুরো পৃথিবীকে হত্যা করল, আর যে একজন (নিরপরাধ) মানুষকে বাঁচিয়ে দিল সে যেন পুরো পৃথিবীকে হত্যার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিল’ (সুরা মায়েদা: ৩২)। 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত