শনিবার, ২৫ মে ২০২৪, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

জিডিপি ও অভিবাসন প্রত্যাশীদের কথা

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২০, ১১:১৩ পিএম

বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে আইএমএফের একটি মূল্যায়ন নিয়ে ভারতে যখন ‘নানা কথা’ বলা হচ্ছে, তখন ইউরোপের মুসলমানপ্রধান একটি দেশ বসনিয়া হারজেগোভিনার একটি ছোট্ট শহর ভেলিকা ক্লাদুসায় শত শত বাংলাদেশির জঙ্গলে কাটানোর ‘কাহিনী’ নতুন একটি মাত্রা এনে দিয়েছে। আইএমএফ বলছে, ডলারের মূল্যে ২০২০ সালে বাংলাদেশের জিডিপি ৪ ভাগ বেড়ে দাঁড়াবে ১৮৮৮ ডলারে, আর ভারতে ১০.৫ ভাগ হ্রাস পেয়ে তা দাঁড়াবে ১৮৭৭ ডলারে। অর্থাৎ মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে এগিয়ে থাকবে। বিপত্তিটা বেঁধেছে এ জায়গাতেই। স্বয়ং রাহুল গান্ধী টুইট করে বাংলাদেশের কথা উল্লেখ করে মোদি সরকারের অর্থনৈতিক নীতির সমালোচনা করেছেন। রাহুল গান্ধী তার টুইট বার্তায় বাংলাদেশসহ ১১টি দেশের একটি তালিকা দিয়েছেন, যেখানে ২০২০ সালের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও কভিড-১৯-এ মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখ করেছেন। যে ১১টি দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির তথ্য তিনি উল্লেখ করেছেন, সেখানে প্রবৃদ্ধির দিক দিয়ে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ (৩.৮ ভাগ)। আর ভারতের অবস্থান সর্বনিম্নে মাইনাস ১০.৩ ভাগ। তিনি চীন (১.৯ ভাগ), ভিয়েতনাম (১.৬), নেপাল (০.০), পাকিস্তান (মাইনাস ০.৪), এমনকি থাইল্যান্ডের (মাইনাস ৭.১ ভাগ) প্রবৃদ্ধির হারও উল্লেখ করেছেন। তিনি আরও দেখিয়েছেন কভিড-১৯-এর কারণে বাংলাদেশে মৃত্যুর হার প্রতি দশ লাখে ৩৪, সেখানে ভারতে ৮৩। রাহুল গান্ধী আইএমএফ, অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু ও ওয়ার্ল্ডোমিটারের সূত্রের কথা উল্লেখ করেছেন। রাহুল গান্ধীর টুইট বার্তার মেসেজটা স্পষ্ট বাংলাদেশ করোনা মোকাবিলা ভালোভাবে করছে, যে কারণে অর্থনীতিতে গতি আসছে। অন্যদিকে ভারতের ব্যর্থতা চরমে। মোদি সরকার করোনা মোকাবিলা করতে ব্যর্থ এবং অর্থনীতি চরম বিপাকে। ভারতের অর্থনীতি যে ঠিকমতো চলছে না, এ ব্যাপারে কারও দ্বিমত নেই। বিশ^ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসুর লেখার সঙ্গে যারা পরিচিত তারা জানেন তিনি মোদির অর্থনৈতিক নীতির সমালোচনা করেছেন। মি. বসু ৯০টি দেশের অর্থনীতির বিকাশের কথা উল্লেখ করে জানিয়েছেন, একমাত্র পেরুর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (মাইনাস ৩০.২ ভাগ) ভারতের চেয়ে খারাপ (ঞযব রিৎব, ২০ ঙপঃ. ২০২০)। ১৯৪৭ সালের পর ভারতীয় অর্থনীতি এ রকম দুরবস্থার মধ্যে আর পড়েনি, এই অভিমতও কৌশিক বসুর (গড়হবু পড়হঃৎড়ষ, অঁম ১০, ২০২০)।

ভারতের অর্থনীতির হাল-হকিকত ভালো নয় এটা সবাই স্বীকার করেন। কিন্তু বাংলাদেশের চেয়েও খারাপ, এটা বাংলাদেশের কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ মানতে নারাজ। কিন্তু বাস্তব সত্য হচ্ছে বাংলাদেশ একটি উঠতি অর্থনৈতিক শক্তি। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি বাংলাদেশকে একটি অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেছে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যেতে যে স্বপ্ন রয়েছে, তাতে করোনা কোনো প্রভাব ফেলবে না। মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা এই তিন সূচকেই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ (কালের কণ্ঠ)। এই তিন সূচক অর্জন করতে পারলে এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা দেওয়া হয়। বাংলাদেশ এ লক্ষ্যেই এগিয়ে যাচ্ছে। সিপিডির গবেষণায় এই বিষয়টি উঠে এসেছে।

এই যখন পরিস্থিতি তখন বসনিয়ার ভেলিকা ক্লাদুসার জঙ্গলে বাংলাদেশিরা কেন জীবন কাটায়? কেন লিবিয়া হয়ে ইতালি যেতে চায়? এর পেছনে রয়েছে একটা চক্র। তারা বাংলাদেশিদের স্বপ্নের কথা শোনায়। পাচারকারীরা বাংলাদেশ, ভারত, আফগানিস্তানসহ আফ্রিকা থেকে শত শত মানবসন্তানকে প্রধানত তুরস্ক নিয়ে আসে। সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয় লিবিয়াতে। তারপর ইঞ্জিনচালিত নৌকায় তুলে দেওয়া হয় ভূমধ্যসাগরে। ২০১৭ সালে আইওএমের (ওঙগ) তথ্যমতে ৩,১০৮ জনের সাগরে মৃত্যু ঘটেছিল। পাঠক, নিশ্চয়ই স্মরণ করতে পারেন ২০১৫-১৬ সালে সিরিয়ার লাখ লাখ নাগরিককের ইউরোপে আশ্রয় নেওয়ার কাহিনী। ইউরোপের পথেঘাটে, জঙ্গলে শত শত সিরীয় নাগরিকের উপস্থিতি ওই সময় আন্তর্জাতিক সংবাদে পরিণত হয়েছিল। এদের প্রায় সবাই এই সমুদ্র-রুট ব্যবহার করেছিল। পরবর্তী ক্ষেত্রে এই রুটে কিছুটা কড়াকড়ি আরোপ করা হলেও মানব পাচার থামেনি। তারা আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ২০০৮ সালে লিবিয়ার ওপর থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পরপরই লিবিয়া মানব পাচারকারীদের জন্য আকর্ষণীয় স্পটে পরিণত হয়। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে লিবিয়ার পরিস্থিতি ভালো নয়। সেখানে গৃহযুদ্ধ চলছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের কাছে তা গুরুত্ব পায়নি। কেননা তারা ইতিমধ্যেই লিবিয়ার স্থানীয় ‘ওয়ার লর্ড’দের সঙ্গে একটা সখ্য গড়ে তুলেছে। অতি সম্প্রতি লিবিয়ার পাশাপাশি সুদানও পাচারকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশিরা এই সুদান রুটটি ব্যবহার করছে। একটা অবৈধ ট্রাভেল ডকুমেন্ট দিয়ে বাংলাদেশিদের সুদানে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর তাদের সুদান থেকে নিয়ে যাওয়া হয় লিবিয়ার বেনগাজি। সুদান থেকে তাদের ট্রাকে করে সীমান্ত পার করে লিবিয়ায় ঢোকানো হয়। বাংলাদেশিরা এ পথেই লিবিয়ায় ঢুকছে। অনেক ক্ষেত্রেই আমরা এ তথ্যগুলো জানি না। লিবিয়ায় ২৬ জন বাংলাদেশির মৃত্যুর পর আমরা সংবাদপত্রের মাধ্যমে জেনেছিলাম। এখন জানলাম ভেলিকা ক্লাদুসার কাহিনী। মাঝখানে আমরা ভিয়েতনামে বাংলাদেশি অভিবাসী কর্তৃক সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাস ‘দখলের’ কাহিনী আমরা শুনেছিলাম। বাংলাদেশের একজন ছাত্রনেতা এর সঙ্গে জড়িত এসব অভিযোগও আমরা তখন শুনেছিলাম। লিবিয়া, ভিয়েতনাম কিংবা ভেলিকা ক্লাদুসা প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে পাচারকারী চক্র জড়িত। সবাইকে শোনানো হয় ইউরোপের কাহিনী। বলা হয়, ইউরোপে ঢুকতে পারলেই হলো নাগরিকত্বসহ লাখ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবতা বলে ভিন্ন কথা। ইউরোপে এখন আর আগের মতো পরিস্থিতি নেই। সেখানে অভিবাসীবিরোধী শক্ত জনমত গড়ে উঠেছে। বেআইনিভাবে ঢুকলে আর সেখানে থাকা যায় না। সবাইকে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করতে হয় এবং তাদের ডিপোর্ট করে। সাম্প্রতিক সময়ে এটা নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের কথাবার্তাও হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘চাপ’ও দিচ্ছে বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে নিতে। এতে করে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও নষ্ট হচ্ছে।

বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে ঢাকায় কিছু পাচারকারী চক্রকে চিহ্নিত করে তাদের গ্রেপ্তারও করেছে। কিন্তু তারপরও পাচার বন্ধ হচ্ছে না। এখনো এই চক্র শক্তিশালী। তারা তৎপর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও। বিমানবন্দরে কর্মরত কিছু ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। ভিয়েতনাম, লিবিয়া কিংবা ইউরোপে কাজের কোনো সুযোগ নেই। তুরস্কে যারা যায়, তাদের টার্গেট তুরস্ক নয় এটা ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের জানার কথা। এতগুলো লোক ভুয়া ডকুমেন্ট দেখিয়ে বিমানবন্দর পার হলো, কেউ এটা বুঝতে পারল না এটা হতে পারে না। এর অর্থ হচ্ছে এই পাচারকারীদের সঙ্গে বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন অফিসারদের ‘সখ্য’ আছে। তারাই বিমানবন্দরে উপস্থিত থেকে হতভাগ্য যাত্রীদের বিমানবন্দর পার করে দেন। সুতরাং তুরস্ক ফ্লাইটে কোনো কোনো কর্মকর্তা বিমানবন্দরে উপস্থিত থাকেন, তাদের আইনের আওতায় আনা উচিত। একই সঙ্গে বাংলাদেশে কিছু কিছু অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সি মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত। পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের কাছে এই তথ্য থাকার কথা। তাহলে প্রশ্ন ওঠে ওইসব অসাধু এজেন্সির বিরুদ্ধে আমরা কোনো ব্যবস্থা নিলাম না কেন? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা দরকার। দু-একজনকে গ্রেপ্তার করেই কি সব শেষ হলো? বাকিরা কোথায়? তাদের গ্রেপ্তার করা হলে এ ধরনের পাচার কমবে। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, তারা লিবিয়া হত্যাকা-ের জন্য লিবিয়া সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ চাইবেন ও দোষী ব্যক্তিদের বিচার চাইবেন। বিষয়টি অনেকটাই হাস্যকর। কেননা এই মুহূর্তে লিবিয়ায় কার্যত কোনো সরকার নেই। ত্রিপোলিতে যে সরকার আছে এবং যা জাতিসংঘ স্বীকৃত, সেই সরকারের অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে। জেনারেল হাফতারের বাহিনী যেকোনো সময় ত্রিপোলি দখল করতে পারে। সুতরাং বাংলাদেশ কার কাছে ক্ষতিপূরণ চাইবে? কে ক্ষতিপূরণ দেবে? বরং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছিল বাংলাদেশের জনগণকে সতর্ক করা তারা যেন লিবিয়াতে না যায়। পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এই কাজটি করা যেত। তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় করেনি। এমনকি ভেলিকা ক্লাদুসার জঙ্গলে প্রায় ৮০০ বাংলাদেশি আটকে থাকার ঘটনা জানতে জার্মানির ডয়েচে ভেলের বাংলা বিভাগের সাংবাদিকরা সেখানে ছুটে গেলেও বাংলাদেশ দূতাবাসের কোনো কর্মকর্তা সেখানে যাননি। অথচ বাংলাদেশিদের স্বার্থরক্ষা দূতাবাসের দায়িত্ব। বাংলাদেশিদের স্বার্থরক্ষা তারা কতটুকু করতে পারছেন এটাই মূল প্রশ্ন এখন।

করোনাপরবর্তী বিশে^ অভিবাসনের প্রশ্নটি আরও শক্তিশালী হবে। অভিবাসন প্রক্রিয়া আর সহজ থাকবে না। নানা বিধিনিষেধ আসবে। সুতরাং বিপুল জনগোষ্ঠীকে অভ্যন্তরীণভাবে কীভাবে দক্ষ কর্মশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা যায়, এই বিষয়টির দিকে নজর দিতে হবে। না হলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়লেও বাংলাদেশ থেকে মানব পাচার রোধ করা যাবে না।

লেখক অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত