রোববার, ২৬ মে ২০২৪, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

খাদ্যশস্য মজুদের গুরুত্ব

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২০, ১১:১৫ পিএম

বাংলাদেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যে কোনো সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। যে কারণে সরকার দেশের মানুষের খাদ্য চাহিদা পূরণে দেশীয়ভাবে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রয়োজনে খাদ্যশস্য আমদানি করে থাকে। কয়েক বছর আগেও বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা দেশীয়ভাবে মেটানো সম্ভব ছিল না। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ চাল ও গম আমদানি করতে হতো। এখন কিন্তু সে অবস্থার অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। তবে, এখনো চাহিদার সিংহভাগ গম প্রতি বছরই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। প্রকৃত অর্থে দেশীয়ভাবে গমচাষে অনাগ্রহের কারণেই এখনো গম আমদানি করতে হয়। অথচ কৃষি বিজ্ঞানীদের নিরলস প্রচেষ্টায় উচ্চফলনশীল জাতের গম চাষাবাদের পরিধি ও যথেষ্ট সুযোগ থাকার পরও সরকার কেন গমচাষের বিস্তারে উদ্যোগী হয় না?

এক সময় দেশে প্রচুর পরিমাণ গমের চাষাবাদ হতো। শুধু উপযুক্ত মূল্যের অভাবেই গমচাষিরা গমচাষ প্রায় ছেড়েই দিয়েছে। অর্থাৎ উপযুক্ত পরিকল্পনার অভাব, সংরক্ষণ ও বিপণনে কার্যত সরকারিভাবে বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেওয়ার অভাবেই গমচাষের ধারাবাহিকতাকে ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কোনো মৌসুমে প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়, আবার কোনো কোনো মৌসুমে প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্যশস্য উৎপাদন হয় না। যে কারণে কোনো পণ্যের বাড়তি উৎপাদন হলেই উপযুক্ত মূল্যের অভাবে কৃষকদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এ জন্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণনে উপযুক্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করে চাষাবাদ করা উচিত। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে চাষাবাদ না হওয়ায় প্রয়োজন মাফিক উৎপাদন ব্যবস্থার তারতম্য লক্ষ করা যায়। ফলে খাদ্যশস্য উৎপাদনে টেকসই ধারাবাহিকতা বরাবরই বিঘিœত হয়। আবার তথ্য বিভ্রাটের মতো ঘটনা তো হরহামেশাই ঘটে। অনেক সময় সঠিক পরিসংখ্যানের অভাবে খাদ্যশস্যের সংকট দেখা দেয়।

পরিসংখ্যান মতে, বাংলাদেশের জনগণের জন্য বছরে চালের প্রয়োজন হয় প্রায় সাড়ে তিন কোটি মেট্রিক টন। সরকারি হিসাবে, চাহিদার প্রায় পুরো চাল দেশীয়ভাবেই জোগান দেওয়া সম্ভব হয়। তবে, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কোনো কোনো বছর হয়তো চাহিদার পুরোটাই দেশীয়ভাবে পূরণ করা সম্ভব হয় না। তখন জনগণের খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে বিদেশ থেকে চাল আমদানি করতে হয়। যেখানে দেশের মানুষের চালের চাহিদা প্রায় সাড়ে তিন কোটি টন, সেখানে সরকার বছরে কম-বেশি মাত্র ১০-১২ লাখ টন চাল অভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহ করে থাকে, যাকে মোট উৎপাদনের তুলনায় যৎসামান্যই বলা যায়। তারপরও সরকারিভাবে ধান-চাল মজুদের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে কৃষকের উৎপাদিত শস্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ, খাদ্যশস্যের বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখা, নিরাপত্তা মজুদ গড়ে তোলা, প্রয়োজনে ত্রাণ বিতরণ, স্বল্পআয়ের মানুষের মধ্যে খোলাবাজারে ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিসহ নানা চ্যানেলে চাল সরবরাহের কারণে সরকারিভাবে সন্তোষজনক খাদ্যশস্য মজুদ রাখা প্রয়োজন। যে কারণে সরকার প্রতি বছরই নিরাপদ খাদ্য মজুদ গড়ে তুলতে বোরো ও আমন মৌসুমেই কম-বেশি চাল-গম অভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহ করে থাকে। আর সরকারের গুদামে নিরাপদ খাদ্য মজুদ না থাকলে বাজার স্থিতিশীল রাখাও সরকারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। কোনো কারণে চালের দাম বৃদ্ধি পেলে সরকার যদি বাজার নিয়ন্ত্রণে খোলাবাজারে চাল বিক্রি, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় চাল বিতরণ না করে তাহলে চাল, আটার মূল্য নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়।

বিশেষ করে এ বছর বৈশ্বিক মহামারী করোনার কারণে গোটা বিশ্বেই খাদ্যশস্যের বাজার ঊর্ধ্বমুখী, যা করোনার প্রাদুর্ভাবের শুরুতেই বিশ্ব খাদ্য সংস্থা আশঙ্কা করেছিল। বাস্তবে তারই প্রতিফলন ঘটেছে। এ বছর সরকার অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি পরিমাণ ধান-চাল অভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েও শেষ পর্যন্ত শতভাগ সফল হতে পারেনি। আর এ ক্ষেত্রে সরকারের দূরদর্শিতার অভাব এবং ধানের দরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চালের সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ না করায় ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান পুরোপুরি সফল হয়নি। যার বিরূপ প্রভাব ইতিমধ্যেই চালের বাজারে পড়তে শুরু করেছে। এখন মোটা চালের বাজারদর কেজিপ্রতি প্রায় ৪৫ টাকার আশপাশেই থাকছে। ফলে নিম্নআয়ের মানুষের কষ্ট বাড়ছে। যদিও সরকার ইতিমধ্যেই খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ১০ টাকা কেজিতে কার্ডধারীদের অনুকূলে চাল সরবরাহ করছে। যা চাহিদার তুলনায় নিতান্তই কম। এখন খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির পাশাপাশি ওএমএস-এর আওতায় চাল বিক্রি করা একান্ত জরুরি। শুধু তাই নয়, আশ্বিন-কার্তিক মাসে দেশে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা বেড়ে যায়। ফলে এই সময়ে কাবিখা, টেস্ট রিলিফের মতো প্রকল্পের আওতায় সরকার খাদ্যশস্য সহায়তা দিয়ে থাকে। এ বছর আবার ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের’ মতো উপর্যুপরি বন্যার কবলে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এখন পঞ্চমবারের মতো কুড়িগ্রামের মতো জেলায় বন্যা দেখা দিয়েছে। এ বন্যার কারণে উঠতি ধানের ক্ষেত নষ্ট হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি নিকট অতীতে কখনই দেখা যায়নি।

আশার কথা, যদি আর বৃষ্টি না হয় এবং বন্যার পানি দ্রুত নেমে যায় তাহলে আমনের ভালো ফলন হবে। যা কিছুদিন আগেও ভাবা যায়নি। আমনের আবাদের চিত্র খুবই আশাব্যঞ্জক। তবে, আমনের উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা বরাবরই কম থাকে। অর্থাৎ বোরোর তুলনায় ধান কম উৎপাদন হয়। ফলে সামনের বোরো ধান না ওঠা পর্যন্ত চালের বাজার স্থিতিশীল থাকবে, যা আশা করাও কঠিন। যে কারণে সরকারিভাবে আপৎকালীন খাদ্য মজুদ বাড়াতে এই মুহূর্তে বেসরকারিভাবে না হলেও জিটুজি পদ্ধতিতে কিছু চাল আমদানি করা প্রয়োজন। কারণ শঙ্কার জায়গাটি হচ্ছে, করোনার দ্বিতীয় ধাপের ছোবল ইতিমধ্যেই নানা দেশে আঘাত হানতে শুরু করেছে। যা থেকে আমাদেরও নিস্তারের তেমন কোনো সুযোগ নেই। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগও নাজুক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। সবদিক বিবেচনায় নিয়ে খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে সরকার চাল আমদানির উদ্যোগ নিতে পারে।

দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। অনেক সময় সঠিক সিদ্ধান্তের অভাবে জনস্বার্থ রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। যেহেতু এ বছর বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বেই কম-বেশি প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগ্রাসন বেশি, সেহেতু খাদ্য নিরাপত্তার বৃহত্তর স্বার্থে সরকারিভাবে আপৎকালীন খাদ্য মজুদ বাড়ানো উচিত। তা না হলে, খাদ্যশস্যের বাজার সরকারের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। পরিণামে সাধারণ ভোক্তাকে বেশি দামে চাল কিনে খেতে হবে। অপ্রিয় হলেও সত্য, যখন খাদ্যশস্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার অসহায় হয়ে পড়ে, তখন সুযোগসন্ধানী অনেকেই এর সুযোগ নিয়ে বিত্তের পাহাড় গড়ে তোলে আর সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ে। পুঁজিবাদী অর্থনীতির এটাই বৈশিষ্ট্য। মানুষের ক্ষুধার জ্বালা নিবারণে সরকার যাতে সঠিক ও সময়োচিত সিদ্ধান্তটিই নিতে পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে সাধারণ ভোক্তার কষ্ট লাঘব করা অনেকাংশেই কঠিন হবে।

লেখক : কৃষিবিষয়ক লেখক

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত