মঙ্গলবার, ২৮ মে ২০২৪, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

সড়ক দুর্ঘটনা হত্যার পর্যায়ে চলে যাচ্ছে

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২০, ০৩:২৮ এএম

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সাইদুর রহমান পায়েলকে বাস থেকে নদীতে ফেলে হত্যার ঘটনার মামলায় তিনজনের ফাঁসির রায় দিয়েছে আদালত। তারা হলেন হানিফ পরিবহনের বাসচালক জামাল হোসেন, তার সহকারী ও ভাই ফয়সাল হোসেন এবং সুপারভাইজার জনি। গতকাল রবিবার ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক আবু জাফর মো. কামরুজ্জামান আসামিদের উপস্থিতিতে চাঞ্চল্যকর এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। আদালত তার রায়ের পর্যবেক্ষণে বলে, ‘সড়ক দুর্ঘটনা দিন দিন হত্যার পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। এত মানুষের মৃত্যু নিছক দুর্ঘটনা নাকি হত্যা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।’ নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে চালক ও সহকারীদের ডোপ টেস্টসহ  চারটি অভিমত দিয়েছে আদালত।

২০১৮ সালের ২১ জুলাই রাতে দুই বন্ধুর সঙ্গে হানিফ পরিবহনের একটি বাসে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার পথে রওনা হওয়ার পর নিখোঁজ হন পায়েল। পরে ২৩ জুলাই মুন্সীগঞ্জ উপজেলার ভাটেরচর সেতুর নিচের খাল থেকে তার লাশ উদ্ধার করে গজারিয়া থানা পুলিশ। ঘটনার পর হানিফ পরিবহনের ওই বাসের সুপারভাইজার জনি, চালক জামাল হোসেন ও তার সহকারী ফয়সাল হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আদালতে তাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির বরাতে পুলিশ জানায়, গজারিয়া এলাকায় যানজটে পড়ার সময় পায়েল প্রস্রাব করতে বাস থেকে নামেন। কিন্তু বাস চলতে শুরু করলে দৌড়ে এসে ওঠার সময় দরজার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে সংজ্ঞা হারান তিনি। তার নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের হলেও তাকে হাসপাতালে নেওয়ার বদলে দায় এড়াতে ভাটেরচর সেতু থেকে নিচের খালে ফেলে দেওয়া হয়। এমনকি তার পরিচয় গোপন করতে বাসচালক পায়েলের মুখ থেঁতলে দেন বলে অভিযোগ করে তার পরিবার।

এ ঘটনায় তিনজনকে আসামি করে গজারিয়া থানায় হত্যা মামলার পর তদন্ত শেষে ওই বছরের ৩ অক্টোবর তিনজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় গজারিয়া থানা পুলিশ। মুন্সীগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মামলার বিচারকাজ শুরু হলেও পায়েলের পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ মামলাটি চট্টগ্রামের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করে। ওই আদালতে ২০১৯ সালের ২ এপ্রিল তিন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশের পর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। পরে আসামিপক্ষের আবেদনে হাইকোর্টের আদেশে ওই বছরের ১৮ নভেম্বর মামলাটি ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এ পাঠানো হয়। ঢাকার ট্রাইব্যুনালে আসামিপক্ষ আগের আদালতে সাক্ষ্য দেওয়া সাক্ষীদের তলব করে (রিকল) পুনরায় জেরার আবেদন জানালে আদালত শুরু থেকে সাক্ষ্য নেওয়ার আদেশ দেয়। রাষ্ট্রপক্ষে ১৪ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে গত ৪ অক্টোবর রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ট্রাইব্যুনালের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর আবু আবদুল্লাহ ভুঞা।

আদালত রায়ে বলে, সাইদুর রহমান পায়েল একজন প্রতিভাবান মেধাবী ছাত্র ছিলেন। উচ্চশিক্ষা নিয়ে নিজের ক্যারিয়ার গড়ে দেশ ও জাতির সেবায় আত্মনিয়োগের জন্য যখন নিজেকে তৈরি করছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে বাস ড্রাইভার, সুপারভাইজার ও হেলপারের নির্মমতার শিকার হয়ে তাকে অকালে প্রাণ দিতে হলো। পায়েল হত্যাকা-ের মোটিভ সম্পর্কে আদালত পর্যবেক্ষণে বলে, ‘আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে পায়েলকে হত্যা করে লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে সেতু থেকে নদীতে ফেলে দেন। তদন্তে প্রকাশ পায় যে, তখনো পায়েল বেঁচে ছিলেন। ময়নাতদন্তে পরিষ্কার হয় যে, পায়েল মারা গেছেন পানিতে ডুবে।’ আদালত তার রায়ের পর্যবেক্ষণে বলে, ‘সড়ক দুর্ঘটনা দিন দিন হত্যার পর্যায়ে চলে যাচ্ছে, যা বলা বোধহয় ভুল নয়। অদক্ষ গাড়িচালক, বেপরোয়াভাবে বাস চালানো, গাড়ি চলাচলের অযোগ্য রাস্তা ও ফিটনেসবিহীন গাড়ির কারণে এ দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে। কিছু চালক রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পথচারীদেরও পিষে দিতে দ্বিধান্বিত হচ্ছে না। আর কত প্রাণ গেলে আমরা সজাগ হব? সড়কে প্রতিদিন এত মানুষের মৃত্যু নিছক দুর্ঘটনা, নাকি হত্যা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সর্বসাধারণের মনে।’

আদালত রায়ে সড়ক নিরাপদ নিশ্চিত করতে চারটি অভিমত দেয়। এর মধ্যে গাড়ি চালাতে দেওয়ার আগে চালক, সুপারভাইজার এবং চালকের সহকারী প্রত্যেককেই ডোপ টেস্ট করানো, চালক, সুপারভাইজার এবং চালকের সহকারীদের যাত্রীদের সঙ্গে নম্র ও ভদ্র আচরণ করা এবং যাত্রীদের সঙ্গে আচরণসংক্রান্ত কাউন্সেলিং বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, মহাসড়কের প্রতি তিন কিলোমিটার পরপর গাড়ির চালক, চালকের সহকারী, সুপারভাইজার এবং যাত্রী সাধারণের জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক আধুনিক বাথরুম স্থাপন করাসহ ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার (সিসি ক্যামেরা) মাধ্যমে মহাসড়কে যান চলাচলের ওপর মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত