মঙ্গলবার, ২৮ মে ২০২৪, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ইউরোপে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ

রপ্তানি খাতে ফের ধাক্কা

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২০, ০৩:৫৪ এএম

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সামলাতে ইউরোপের দেশগুলো ফের লকডাউনে যাচ্ছে। ফ্রান্স ও জার্মানি লকডাউন ঘোষণা করেছে। অন্যান্য দেশও বেশি সংক্রমিত এলাকায় লকডাউন দিয়েছে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সবচেয়ে বড় জোগানদাতা এই অঞ্চলে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। পুনরায় বেকার হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন সেখানকার প্রবাসীরা। অনেক ক্রেতা তাদের শিপমেন্ট পিছিয়ে দিচ্ছেন, অনেকে আবার কমিয়ে ক্রয়াদেশ দিচ্ছেন। এ অবস্থায় রপ্তানি খাতে বিদ্যমান ঋণের মেয়াদ পাঁচ বছর ও গ্রেস পিরিয়ড এক বছর করার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

ইউরোপের বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে সেখানে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়। বর্তমানে তা প্রকট আকার ধারণ করছে। ফ্রান্স ও জার্মানিতে শিল্প কারখানা খোলা থাকলেও রেস্টুরেন্ট-বারে কড়াকড়ি আরোপ হয়েছে। বন্ধ বিনোদন কেন্দ্র। এ ছাড়া যুক্তরাজ্য ও ইতালি লকডাউনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্য দেশগুলো বিভিন্ন এলাকায় বিধিনিষেধ আরোপ করছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ বাড়তে পারে এবং শীতজুড়ে তা বিস্তৃত হলে ইউরোপের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বড় ধাক্কা লাগবে।

বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের ৮৩ শতাংশ আয় পোশাক শিল্প থেকে। গত তিন অর্থবছরে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলো থেকে এ খাতের আয় হয়েছে মোট আয়ের ৬২ শতাংশ। চলতি বছরের শুরুতে করোনার কারণে ইউরোপের দেশগুলো লকডাউন দিলে দেশের পোশাক খাতে বিপর্যয় দেখা রপ্তানি খাতে ফের ধাক্কাদেয়। ক্রেতারা ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিত করতে থাকেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার শ্রমিকের বেতন পরিশোধে তাৎক্ষণিক প্রণোদনা ঘোষণা করে। পরে ৫০ হাজার কোটি টাকার আরও দুটি প্রণোদনার ঘোষণা দেয় সরকার। নভেম্বর থেকে ১৮ মাসের কিস্তিতে শ্রমিকের বেতন পরিশোধের দেওয়া ঋণ পরিশোধ করতে হবে। আর আগামী জানুয়ারি থেকে অন্য ঋণের কিস্তি শুরু হবে।

বিজিএমইএ নেতারা বলছেন, পোশাক রপ্তানিতে টানা দুই মাস বৃদ্ধির পর ইউরোপে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হলে এ খাতে নেতিবাচক ধারা ফিরতে শুরু করে। বিদায়ী অক্টোবর মাসের ২৭ তারিখ পর্যন্ত ১৯২ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ কম। গত বছরের ১ থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত ২০৪ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছিল। রপ্তানিকারকরা বলছেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের বিষয়ে তারা আগেই সতর্ক ছিলেন। কিন্তু এটা এত তাড়াতাড়ি আসবে তা ভাবতে পারেননি। তবে দ্বিতীয় ধাক্কায় রপ্তানি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও প্রথমবারের মতো প্রভাব পড়বে না বলে আশা করছেন তারা।

বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ফয়সাল সামাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্রেতারা এখন পর্যন্ত ক্রয়াদেশ বাতিল করেননি। কিন্তু শিপমেন্টের তারিখ পেছাতে শুরু করেছেন। এখন তো অনেক দেশ লকডাউনে যাচ্ছে। পরিস্থিতি কোন দিকে যায় বলা মুশকিল। আশা করব খুব খারাপ কিছু হবে না। তবে লকডাউন দীর্ঘমেয়াদি হলে পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাবে। বিষয়টি আমলে নিয়ে এখনই আমরা প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছি। এ ক্ষেত্রে সরকারেরও সহায়তা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। বিশেষ করে ঋণগুলোর গ্রেস পিরিয়ড ও সময়সীমা বাড়ালে আমরা পরিস্থিতি সামলাতে পারব।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শঙ্কার বিষয় বড়দিন উপলক্ষে ইউরোপে পোশাকের বড় বাণিজ্য হয়। করোনার প্রকোপ ওই সময়ে থাকলে সেখানকার পোশাক বাণিজ্যে বড় ধরনের ধস নামবে। এতে রপ্তানিতে বড় প্রভাব পড়বে। ক্রয়াদেশ কমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদের জন্য রপ্তানির অর্থ আটকে যেতে পারে।

এ বিষয়ে এফবিসিসিআই সহসভাপতি ও আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইউরোপে করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা নিয়ে আমরা বেশ শঙ্কিত। এটি আমাদের ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলে দেবে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে হয়তো এ বিষয়ে ধারণা পাওয়া যাবে। দ্বিতীয় ধাক্কায় মালিকরা বিপাকে পড়লে আমরা সরকারকে জানাব।’

বিজিএমইএ পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্রেতারা শিপমেন্ট পিছিয়ে দেওয়ায় আমাদের টাকা আটকে যাচ্ছে। আবার নতুন ক্রয়াদেশও কমে যাচ্ছে। তবে আমরা ক্রেতাদের কাছে ক্রয়াদেশ বাতিল না করার অনুরোধ জানাচ্ছি।’

অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি : করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা সামলাতে প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণের সময়সীমা ও গ্রেস পিরিয়ড বৃদ্ধির অনুরোধ জানিয়ে গত সেপ্টেম্বরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছিল পোশাক রপ্তানিকারকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৫ অক্টোবর আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক হয়। সেখানে চিঠিটি অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। এরপর গত ২২ অক্টোবর অর্থ মন্ত্রণালয়কে এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি অনুবিভাগের সহকারী প্রধান মোসা. শামীমা আক্তার স্বাক্ষরিত চিঠিতে শ্রমিকের বেতন পরিশোধের জন্য দেওয়া ঋণের গ্রেস পিরিয়ড ছয় মাস থেকে বাড়িয়ে এক বছর এবং কিস্তির মেয়াদ ১৮ মাস থেকে বাড়িয়ে ৬০ মাস (৫ বছর) করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

করোনায় পোশাক খাত এত সুবিধা পাওয়ার পরও কেন আরও সুবিধা চাচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে বিজিএমইএ পরিচালক শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনার দ্বিতীয় ধাক্কায় আমাদের আয় কমবে। এ অবস্থায় শ্রমিকের বেতন ও ঋণের টাকা একসঙ্গে পরিশোধ করা বেশিরভাগ মালিকের জন্যই কষ্টকর হবে। সরকার ঋণের গ্রেস পিরিয়ড বৃদ্ধি করলে আমরা আমাদের আয় দিয়ে বেতন পরিশোধ করতে পারব। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস সরকার বিষয়টি বিবেচনা করবে।’

ধাক্কা লাগবে প্রবাসী আয়ে : দেশের বৈদেশিক মুদ্রার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খাত প্রবাসী আয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত অর্থবছরে যেসব দেশ থেকে রেমিট্যান্স এসেছে, তার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে সৌদি আরব। এর পরেই রয়েছে যথাক্রমে সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র, কুয়েত, যুক্তরাজ্য, ওমান, মালয়েশিয়া, কাতার, ইতালি ও সিঙ্গাপুর। করোনার শুরুতেই ইউরোপে অবস্থানরত প্রবাসীরা বেকার হতে শুরু করেন। ওই সময়ে অনেকেই ইউরোপ ছেড়ে দেশে ফিরতে শুরু করেন। তাদের অনেকেই এখনো ফিরতে পারেননি। যারা ইউরোপে অবস্থান করছেন, তাদের অনেকেই এখনো বেকার। এ অবস্থায় করোনার দ্বিতীয় ধাক্কায় প্রবাসী বেকারের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। এতে কমে যেতে পারে রেমিট্যান্স প্রবাহ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গতকাল রবিবারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত চার মাসে প্রবাসী আয়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। তবে বিশ্বব্যাংক বলছে, বছর শেষে এই প্রবৃদ্ধির হারে ধস নামবে। সংস্থাটি বলছে, বছর শেষে এই হার ৮ শতাংশে নেমে আসবে।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশে রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় বাজার হচ্ছে ইউরোপ। অন্যদিকে রেমিট্যান্সও ইউরোপ অঞ্চল থেকে বেশি আসে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জাতীয়ভাবে লকডাউন না হলেও প্রাদেশিকভাবে শুরু হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্সে প্রভাব পড়বে। কিন্তু সে প্রভাব কতটুকু, তা সংক্রমণের ধরনের ওপর নির্ভর করবে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত