বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই ২০২৪, ৯ শ্রাবণ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বাংলাদেশের ভাবনা যুক্তরাজ্যে জিএসপি

আপডেট : ০২ জানুয়ারি ২০২১, ০২:২৫ এএম

যুক্তরাজ্যের বাসিন্দাদের কাছে ব্রেক্সিট চুক্তি ক্রমেই আতঙ্কের নাম হয়ে উঠছিল। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে শেষমেশ ব্রেক্সিট ও বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে। গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারিভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অংশ ছিল যুক্তরাজ্য। ব্রাসেলসের সময় ৩১ তারিখ মধ্যরাতে ইউরোপ থেকে বিচ্ছিন্ন হলো যুক্তরাজ্য, ব্রেক্সিট সম্পূর্ণ হলো। এবার ভ্রমণ কিংবা বাণিজ্যে নতুন আইন-কানুন মানতে হবে দুই পক্ষকেই। ঐতিহাসিক এই ‘বিচ্ছেদের’ প্রভাব পড়ছে যুক্তরাজ্য বা ইইউর সঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য দেশ বা অঞ্চলের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও। ইতিমধ্যে ইইউর সঙ্গে চীন বিনিয়োগ চুক্তির বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছছে। বাংলাদেশ এখনই ব্রেক্সিট নিয়ে খুব বেশি মাথা না ঘামালেও চিন্তায় আছে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা (জিএসপি) নিয়ে। তবে যুক্তরাজ্য আগেই জানিয়েছিল ব্রেক্সিটের পরেও বাংলাদেশসহ বিশ্বের স্বল্পোন্নত ৪৭টি দেশ যুক্তরাজ্যে পণ্য রপ্তানিতে জিএসপি সুবিধা পাবে।

২০১৬ সালে ঐতিহাসিক গণভোটে ব্রেক্সিটের পক্ষে রায় আসার প্রায় সাড়ে তিন বছর পর ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ থেকে বিচ্ছিন্ন হয় যুক্তরাজ্য। কিন্তু উভয়পক্ষ একটি বাণিজ্য চুক্তিতে উপনীত হতে না পারায় গত ১১ মাস ধরে সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ আটকে ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তারা ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব এবং বাণিজ্য নিয়ে একটি চুক্তিতে উপনীত হতে সক্ষম হয়েছে। গত ২৪ ডিসেম্বর ইইউর ২৭টি সদস্য দেশের রাষ্ট্রদূতরা ইইউ-যুক্তরাজ্য বাণিজ্য চুক্তি সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন করেন। পরে ইইউর শীর্ষ কর্মকর্তারা চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে সই করেন। তারপর গত বুধবার যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউজ অব কমন্সে ৫২১-৭৩ ভোটে দ্রুতই চুক্তিটি অনুমোদন পায়। সেখান থেকে উচ্চকক্ষ হাউজ অব লর্ডসে এ চুক্তি চূড়ান্তভাবে অনুমোদনের পর রানীও তাতে সম্মতি দেন এবং সেটি আইনে পরিণত হয়।

নতুন চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাজ্যে উৎপাদিত পণ্য শুল্কমুক্তভাবে ইইউর অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রবেশ করার সুযোগ পাবে। তার অর্থ যুক্তরাজ্য এবং ইইউর মধ্যে পণ্য আমদানিতে কোনো কর দিতে হবে না।

কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, আগের মতো ব্যবসার প্রয়োজনে বা ইইউর দেশগুলো ভ্রমণে যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের কাগজপত্র লাগবে না। বরং এখন থেকে তাদের আরও বেশ কিছু কাগজপত্রের প্রয়োজন পড়বে। ব্যাংকিং এবং অন্যান্য সেবাখাত কোন নিয়মে চলবে তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা কাটেনি। য্ক্তুরাজ্যের অর্থনীতিতে এই দুই খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলে জানাচ্ছে, যুক্তরাজ্যের ব্রেক্সিটের সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক আছে। ৩১ তারিখ রাতেও সে বিতর্ক উসকে দিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। ইংরেজি নিউ ইয়ার উপলক্ষে দেওয়া বক্তৃতায় তিনি বলেছেন, যুক্তরাজ্য শুধু ফ্রান্সের প্রতিবেশী নয়, বন্ধু দেশ। ব্রেক্সিটের পর কীভাবে সেই সম্পর্ক বজায় থাকবে, তা নিয়ে ফ্রান্স উদ্বিগ্ন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন অবশ্য উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। নতুন বছর উপলক্ষে বক্তৃতায় বরিস বলেছেন, যুক্তরাজ্য একটি স্বাধীন, আন্তর্জাতিকতাবাদে বিশ্বাসী রাষ্ট্রে পরিণত হলো। স্বাধীনভাবে এবার বাণিজ্যে অংশ নেওয়া যাবে।

তবে এবার আর যুক্তরাজ্যের মানুষ ইউরোপে স্বাধীনভাবে যাতায়াত করতে পারবে না। ভিসা করেই ইউরোপের যেকোনো দেশে ঢুকতে হবে।

চুক্তি অনুযায়ী ১৮০ দিনের মধ্যে ৯০ দিন টানা যুক্তরাজ্যের  কোনো মানুষ ইউরোপের কোনো দেশে থাকতে চাইলে তাকে ভিসা করাতে হবে। অন্যদিকে ইউরোপের কোনো মানুষ যুক্তরাজ্যে টানা ছয় মাস ভিসা ছাড়া থাকতে পারবে। এর বেশি থাকতে চাইলে তার ভিসা লাগবে। ইউরোপ থেকে যুক্তরাজ্যে এসে কাজ করতে চাইলে অথবা যুক্তরাজ্য থেকে ইউরোপে গিয়ে কাজ করতে চাইলে ওয়ার্ক ভিসা বাধ্যতামূলক।

ব্রেক্সিটের কয়েক দিন আগে ইউরোপের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে। ফলে মুক্ত বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কিছু সুবিধা পাবে দুপক্ষই। জিব্রাল্টার নিয়ে বৃহস্পতিবার শেষ মুহূর্তে আরও একটি চুক্তি হয়েছে। যুক্তরাজ্য ও স্পেনের মধ্যবর্তী জিব্রাল্টার প্রণালি কার হবে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলছিল। ৩১ তারিখ শেষ মুহূর্তে দুই দেশ সিদ্ধান্ত নেয় জিব্রাল্টার স্পেন ও যুক্তরাজ্য দুই তরফের কাছেই খোলা থাকবে। এখানে যাতায়াতের জন্য আলাদা কোনো অনুমতি লাগবে না।

এদিকে গত সপ্তাহে যখন ব্রেক্সিটপরবর্তী বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে যুক্তরাজ্য ও ইইউ সম্মতি প্রকাশ করে তার পরই চীন-ইইউ মাল্টি-বিলিয়ন ইউরোর বিনিয়োগ চুক্তিতে সম্মতির কথা জানায়।

তখন জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডেয়ার লিয়েন এবং ইইউর সিনিয়র কর্মকর্তারা চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গে এক টেলিকনফারেন্সে অংশ নিয়ে চুক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেন।

পরে এক টুইট বার্তায় জার্মানির সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফন ডেয়ার লিয়েন বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় একক বাজার রয়েছে ইইউর। ব্যবসার জন্য আমরা উন্মুক্ত, তবে সুষম প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র এবং মূল্যবোধের বিষয়েও আমরা সম্পৃক্ত।

এদিকে যুক্তরাজ্য-ইইউ আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এফটিএ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. শহিদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ মুহূর্তে বাণিজ্য বিষয়ে ইংল্যান্ডের সঙ্গে কোনো আলোচনা হচ্ছে না। তবে আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি বেক্সিটপরবর্তী জিএসপি সুবিধা বহাল রাখতে। এ ছাড়া এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনপরবর্তী ১০ বছর যাতে জিএসপি সুবিধাটি থাকে সেই চেষ্টাও চলছে।

শহিদুল ইসলাম আরও বলেন, এখন আমরা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির পরিবর্তে বিভিন্ন ফোরামের সঙ্গে চুক্তি করার উদ্যোগ নিয়েছি। এতে সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, কোনো ফোরামের সঙ্গে চুক্তি হলে সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে আলাদা করে চুক্তি করার প্রয়োজন হয় না। অবশ্য এখন জাপানসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গেও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা চলছে।

তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশসহ বিশ্বের স্বল্পোন্নত ৪৭টি দেশ যুক্তরাজ্যে পণ্য রপ্তানিতে জিএসপি সুবিধা পাবে বলে আগেই জানিয়েছিল লন্ডন। ব্রিটিশ সরকারের ভাষ্য, সারা বিশ্বে ভিন্ন শুল্ক কাঠামোতে পণ্য আমদানি করলেও স্বল্পোন্নত আর উন্নয়নশীল দেশগুলোর পণ্য পুরোপুরি শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে।

গত বছরের নভেম্বর মাসের মাঝামাছি সময়ে যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিষয়কমন্ত্রী লিস ট্রাস ট্রুজ বলেছিলেন, যুক্তরাজ্য এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নে নেই। ব্রেক্সিট পুরোপুরি কার্যকর হলে ব্রিটিশ আমদানিকারকরা বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর পোশাক ও শাকসবজির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যগুলোতে শূন্য বা হ্রাস শুল্ক প্রদান অব্যাহত রাখবে। এটি উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোকে সুদৃঢ় শিল্প প্রতিষ্ঠা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়তা করবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, চুক্তি হলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সংকট এখনই কাটছে না। ইউনিয়ন ছেড়ে যুক্তরাজ্যের চলে যাওয়ার পর জোটের ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে। যুক্তরাজ্যের পথ ধরে ইউনিয়নের আরও দেশ জোট ছাড়তে চাইতে পারে। কারণ ইউনিয়নের কার্যক্রমের বড় হিস্যা ছিল যুক্তরাজ্যের। দেশটি চলে যাওয়ার ফলে ইউরোপের ব্যয় নির্বাহে যেমন চাপ বাড়বে তেমনি সামরিক জোটেও টানাপড়েন সৃষ্টি হতে যাচ্ছে। ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়ে ইতিমধ্যেই জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল ও ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নিকট ভবিষ্যতে এ উদ্বেগ যে আরও বাড়বে এমনটা বলছেন বিশ্লেষকরা।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত