সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

এ যেন ঘরের মাঠেই খেলা

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২১, ১১:৩৫ পিএম

মালের রাশমি ধান্দু স্টেডিয়ামের আশপাশ এলাকায় প্রচুর বাংলাদেশি প্রবাসীর বসবাস। জীবিকার সন্ধানে দেশ ছেড়ে তারা বাস করছেন এই দ্বীপ দেশটিতে। একটা সময় লক্ষাধিক বাংলাদেশি বসবাস করতেন মালদ্বীপে। করোনায় চাকরি হারানোয় অনেকেই ফিরে গেছেন দেশে। তারপরও থেকে যাওয়াদের সংখ্যাটা নেহাত কম নয়। প্রায় ৭০ হাজার বাংলাদেশি বাস করেন বিভিন্ন দ্বীপে। বড় সংখ্যাটাই থাকেন রাজধানী মালেতে। আর এখানে যখনই বাংলাদেশের কোনো দল খেলতে আসে সমর্থন জানাতে প্রবাসীদের আগ্রহের শেষ নেই। মালেতে পা রাখার পর থেকেই সেটা বোঝা যাচ্ছিল। বাংলাদেশের সংবাদকর্মী পরিচয় পেলেই ঘিরে ধরছেন তারা। অনেক কথার ফাঁকে অনুরোধ রাখছেন একটা টিকিট জোগাড় করে দেওয়ার। মাঠে থেকে লাল-সবুজের সৈনিকদের পক্ষে গলা ফাটাতে চান তারা। কিন্তু গ্যালারির আসনসংখ্যা যে সীমিত। সাত হাজার আসনের সবটা আবার বিক্রির জন্য ছাড়া হয়নি। ফলে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচের আগের দিনই শেষ টিকিট। ম্যাচের আগে শত শত প্রবাসী বাংলাদেশি ভিড় করেও পাননি কাক্সিক্ষত টিকিট। ভাগ্যবানরা অবশ্য সারাক্ষণই বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ধ্বনিতে মুখরিত করে রেখেছেন গোটা স্টেডিয়াম। লাল-সবুজ পতাকা নিয়ে, ড্রাম, ভেপু বাজিয়ে তারা চেয়েছেন প্রিয় দলের ফুটবলারদের উজ্জীবিত করতে।

সাত বছর ধরে মালেতে থাকেন আবদুর রাজ্জাক। পঞ্চাশোর্ধ্ব এই প্রবাসী ফুটবলের পোকা। মাসখানেক আগে এএফসি কাপের গ্রুপপর্বের খেলায় দর্শক প্রবেশের অনুমতি ছিল না। স্টেডিয়ামের পাশের দশতলা ভবনের ছাদে গিয়ে ঝুঁকি নিয়ে দেখেছেন বাংলাদেশের লিগ চ্যাম্পিয়ন বসুন্ধরা কিংসের খেলা। তারও আগে ২০১৫ সালে মালেতেই স্বাগতিক মালদ্বীপের কাছে ৫-০ গোলে হারের লজ্জাটাও দেখেছেন গ্যালারিতে বসে। এবারও আগেভাগেই টিকিট কেটেছেন সবকটি ম্যাচের। স্টেডিয়ামের বাইরে দেখা হতেই বললেন, ‘ভাই আমি কেবল বাংলাদেশের খেলাই দেখব না। অন্য দলের খেল্ওা দেখব। ফুটবল অনেক ভালোবাসি। নিজেও খেলতাম। কিন্তু অর্থাভাবে খেলার বিলাসিতা বাদ দিয়ে বেছে নিতে হয় কঠিন প্রবাস জীবন। এখানে এখন ভালোই উপার্জন করি। দেশেও ভালো টাকা পাঠাই। কিন্তু মাঠে বাংলাদেশের খেলা থাকলে কোনো কিছুই আমাকে আটকে রাখতে পারে না। আমার যে করেই হোক আসতেই হবে মাঠে।’ রাজ্জাক ভাগ্যবান। কিন্তু টিকিট না পেয়ে হতাশা নিয়ে স্টেডিয়ামের বাইরে থাকাদের একজন মোহাম্মদ ইব্রাহিম। চাকরিস্থল থেকে ছুটি নিয়ে এসেছেন দলের খেলা দেখতে। কিন্তু ম্যাচের তিন ঘণ্টা আগে টিকিট বুথে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থেকেও ঢুকতে পারেননি। আক্ষেপ করে বললেন, ‘আমাদের এখানে ছুটি পাওয়া খুব কঠিন। কিন্তু মালিককে দেশের খেলার কথা বলে ছুটি নিয়েছি। কিন্তু এখন এসে দেখি টিকিট নেই। মনটা খুব খারাপ লাগছে। পারতপক্ষে দেশের খেলা হলে মিস করি না। ২০১৫ সালে সেই ম্যাচটাও গ্যালারিতে বসে দেখেছি। ওমন হারের পর মালদ্বীপের মানুষরা আমাদের নিয়ে হাসাহাসি করেছে। কিন্তু লাল-সবুজ জার্সি পরে দল যখন মাঠে নামে, তখন যত খারাপই হোক সমর্থন দেই, দিয়ে যাব।’

স্টেডিয়ামের ৫০০ গজের মধ্যেই একটা মনিহারী দোকানে চাকরি করেন চাঁদপুরের মনির হোসেন। তিনিও টিকিট জোগাড় করতে পারেননি। তারপরও মনে-প্রাণে দলের সাফল্য কামনা করছেন, ‘এখানে বাংলাদেশিরাই বেশি কাজ করেন। কিন্তু মালদ্বীপের মালিকরা বেশিরভাগ খুব অবহেলা করেন। সাফে দল যদি সফল হয় এবং বাংলাদেশ যদি মালদ্বীপকে হারাতে পারে তাহলে অনেক খুশি হব। তাদের একটা জবাবও দেওয়া যাবে।’

মালে মিউনিসিপ্যালিটিতে চাকরির সুবাদে সাফের সাজসজ্জার কাজে নিয়োজিত আছেন বেশ কজন বাংলাদেশি প্রবাসী। তাদেরই একজন আলমগীর বললেন, ‘স্যারকে বলে-কয়ে মাঠে ডিউটি নিয়েছি যাতে এই সুযোগে দেশের খেলা দেখতে পারি। এমনিতে তো ছুটি পাব না। এখন মাঠে কাজ করার সুযোগে খেলা দেখতে পারব।’

এ রকম প্রায় ৫ হাজার বাংলাদেশি গতকাল প্রাণভরে সাক্ষী হয়েছেন দলের গুরুত্বপূর্ণ জয়ের। সাফ অভিযানের শুরুতে প্রিয় দলকে জিততে দেখে সাফ নিয়ে আগ্রহটাই বহুগুণ বেড়ে গেছে জীবিকার তাড়নায় আপনজন ছেড়ে মালদ্বীপ আসা বাংলাদেশিদের। মাঠে তপুরা যেমন পাত্তা দেননি লঙ্কানদের, তেমনই গ্যালারিতেও জয় হয়েছে বাংলাদেশিদের।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত