শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ৬ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

প্রবীণদের পুষ্টি ও সামাজিক সুরক্ষা

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২১, ১২:৪৩ এএম

পহেলা অক্টোবর শুক্রবার পালিত হলো আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। জাতিসংঘ ঘোষিত এই দিবসটি বাংলাদেশও রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করে। এ বছর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘সব বয়সীর জন্য ডিজিটাল সমতা’। সন্দেহ নেই যে, দুনিয়াজুড়ে ডিজিটাল বিপ্লবের এই যুগে প্রবীণদের জন্যও ডিজিটাল সমতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। চলমান করোনাভাইরাস মহামারীতে বিশ^জুড়ে স্থবির হয়ে পড়া জনজীবন আর ঘরবন্দি থাকার অভিজ্ঞতার ফলে নবীন-প্রবীণ সব মানুষের জীবনেই ডিজিটাল মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগের ওপর নির্ভরশীলতার বিষয়টি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি উপলব্ধি করা গেছে। কিন্তু এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, নবীন বা প্রবীণের বিবেচনা তো অনেক দূরের বিষয়, দেশে এখনো শহর ও গ্রামাঞ্চলের মধ্যকার বিদ্যমান ডিজিটাল বৈষম্যই দূর করা যায়নি। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) একদল গবেষক প্রবীণদের নিয়ে নতুন এক গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, দেশের প্রবীণদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ অপুষ্টিতে ভুগছেন। প্রবীণদের স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার বিষয়টি তাই অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় আসা প্রয়োজন।

‘বাংলাদেশে প্রবীণদের অপুষ্টির কারণসমূহ’ শীর্ষক বিএসএমএমইউর এই গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রবীণের এক-চতুর্থাংশই অপুষ্টিতে ভুগছেন। পুরুষের তুলনায় নারী প্রবীণদের মধ্যে অপুষ্টির হার বেশি। নারীদের মধ্যে এই হার ২৯ ও পুরুষদের মধ্যে ২২ শতাংশ। আর অপুষ্টিতে ভোগা মোট প্রবীণদের মধ্যে জীবনসঙ্গীবিহীন প্রবীণদের অপুষ্টির হার ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ ও পুষ্টিহীনতার ঝুঁকির হার ৬৫ দশমিক ৩ শতাংশ। গবেষকরা প্রবীণদের অপুষ্টির প্রধান চারটি কারণ চিহ্নিত করেছেন। এগুলো হলো বিষণœতা, মুখ ও দাঁতের খারাপ স্বাস্থ্য, পুষ্টিযুক্ত খাদ্য পরিহারের অভ্যাস এবং অসংক্রামক রোগের উপস্থিতি। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, অপুষ্টির শিকার প্রবীণদের ৪০ শতাংশই বিষণœতায় ভুগছেন। স্বাভাবিকের তুলনায় বিষণœতায় ভোগা প্রবীণদের অপুষ্টিতে ভোগার আশঙ্কা ১৫ দশমিক ৬ গুণ বেশি। এমনকি যেসব প্রবীণের মুখ ও দাঁতের স্বাস্থ্য খারাপ, তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অপুষ্টিতে ভুগছেন। মুখ ও দাঁতের সুস্বাস্থ্যে থাকা প্রবীণদের তুলনায় মুখ ও দাঁতের খারাপ স্বাস্থ্যযুক্ত প্রবীণদের অপুষ্টিতে ভোগার আশঙ্কা ৭ দশমিক ৩ গুণ বেশি। বিশেষ করে মাংস, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার এবং ডিমজাতীয় খাবার পরিহার করা প্রবীণের মধ্যে অপুষ্টি এবং পুষ্টিহীনতার ঝুঁকি, দুটোই বেশি। এমনকি স্ট্রোক বা পক্ষাঘাতগ্রস্ত প্রবীণদের মধ্যে অপুষ্টির হার বেশি।

আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসকে কেন্দ্র করে দেশের একমাত্র মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষণা প্রবীণদের স্বাস্থ্যের দিকে আরও বেশি মনোযোগী হওয়ার তাগিদ দিচ্ছে। অপুষ্টি সংক্রান্ত গবেষণাটির সঙ্গে একই সময়ে ‘বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের প্রবীণদের বাত-ব্যথার ব্যাপকতা’ শীর্ষক আরেকটি গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের ৫২ শতাংশ প্রবীণ বাত-ব্যথায় ভুগছে এবং তাদের অর্ধেকেরও বেশি মাঝারি মাত্রায় শারীরিকভাবে অক্ষম। পুরুষদের মধ্যে এই হার ৪৩.৪ শতাংশ, আর নারীদের মধ্যে ৫৬.৬ শতাংশ। বাত-ব্যথায় ভোগা প্রবীণদের মধ্যে বেশির ভাগেরই কোমর ব্যথা (৪৩ দশমিক ৪ শতাংশ) এবং হাঁটুতে ব্যথা (৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ)। প্রবীণদের অপুষ্টি দূর করতে পুষ্টিবিষয়ক সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন এবং নারীদের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে গবেষণায়। এ ছাড়া প্রবীণদের সঠিক মুখের স্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে জোর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন গবেষকরা। দেশে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। সে হিসেবে দেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। বাংলাদেশে যেভাবে প্রবীণের সংখ্যা বাড়ছে, তাতে আগামী ২০৫০ সাল নাগাদ দেশে প্রবীণের সংখ্যা সাড়ে তিন কোটি ছাড়িয়ে যাবে। লক্ষ করা দরকার, ইউনিসেফ সম্প্রতি এক কৌশলপত্রে জানিয়েছে, আগামী দুই থেকে আড়াই দশকের মধ্যে বাংলাদেশ প্রবীণপ্রধান দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে। ইউনিসেফ বলছে, বাংলাদেশ প্রবীণপ্রবণ সমাজে পদার্পণ করবে ২০২৯ সালে। আর সেখান থেকে আস্তে আস্তে প্রবীণপ্রধান সমাজে পরিণত হবে ২০৪৭ সালে। অর্থাৎ মাত্র ১৮ বছরের মধ্যে এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাবে বাংলাদেশ। দ্রুততম সময়ে এই পরিবর্তন ঘটতে চলেছে বিশ্বে এমন সব দেশের মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। সিঙ্গাপুরে এটি ঘটবে ১৭ বছর সময়ের মধ্যে। এই বাস্তবতা আমলে নিয়ে এখন থেকেই দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর পুষ্টি এবং শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য নীতি ও কৌশলগত প্রস্তুতি গ্রহণ করা দরকার।

বলা হয়ে থাকে একটি রাষ্ট্র ও সমাজ কতটা অগ্রসর সেটা বোঝা যায় সেখানে প্রবীণদের জীবনমান ও সামাজিক মর্যাদা দেখে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশের আর্থসামাজিক কাঠামোর দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রবীণরা যে প্রথাগতভাবে প্রাপ্ত উচ্চ মর্যাদা এবং বিশেষ সুবিধাদি হারাচ্ছেন সেটা খোলা চোখেই দেখা যায়। এই বাস্তবতা বদলের জন্য প্রবীণ জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা বৃদ্ধি করা এবং প্রবীণদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারের বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত