রবিবার, ২১ এপ্রিল ২০২৪, ৮ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

যেভাবে বদলে যাচ্ছে সৌদি আরব

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২১, ০১:২৬ এএম

‘হোম অব ইসলাম’ নামেই সৌদি আরবের খ্যাতি। দেশটিতে দশকের পর দশক ধরে চলে আসা রক্ষণশীল ঐতিহ্য ভাঙার চেষ্টা করছেন যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান। বেশ কিছু সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। তার উদ্যোগে সত্যিই কি বদলে যাবে সৌদি আরব? দেশটির সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে লিখেছেন মুফতি এনায়েতুল্লাহ

রাজতন্ত্রের শুরু

আয়তনের দিক থেকে এশিয়ার পঞ্চম বৃহৎ রাষ্ট্র সৌদি আরব। দেশটির বেশির ভাগ ভূখণ্ড মরুভূমি ও পার্বত্যময়। চার অঞ্চলে বিভক্ত সৌদি আরব হেজাজ, নজদ, আল-আহসা ও আসির। ১৯০২ সালের ১৫ জানুয়ারি সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আবদুল আজিজ আবদুর রহমান আল সৌদ যুদ্ধের মাধ্যমে তার পৈতৃক শহর রিয়াদ দখল করেন। রিয়াদ দখলের ৩০ বছর পর ১৯৩২ সালের ২১ মে সৌদি আরবের বিভিন্ন অংশের একত্রীকরণের ঘোষণা দেওয়া হয়। ওই বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে বাদশাহ আজিজ তার গোষ্ঠীর নামে আধুনিক সৌদি আরব গঠন করেন। সেই থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের জাতীয় দিবস। দেশটিতে রাজতান্ত্রিক শাসন চলছে। সৌদি আরব দুই পবিত্র মসজিদের ভূমি হিসেবেও পরিচিত। যে কারণে মুসলিম বিশ্বসহ সারা দুনিয়ার মানুষ সৌদি আরবকে শ্রদ্ধা ও সম্মানের চোখে দেখে। তেল-গ্যাসের বিশাল মজুদ রয়েছে সৌদি আরবে। দেশটির তেলের মজুদের পরিমাণ ২৬০ বিলিয়ন ব্যারেল, যা বিশ্বের মজুদের এক-পঞ্চমাংশ। দেশটির সমৃদ্ধির প্রধান কারণ এটিই। ২১ লাখ ৪৯ হাজার ৬৯০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের দেশটির জনসংখ্যা সাড়ে তিন কোটির মতো। পৃথিবীর চতুর্থ সর্বোচ্চ সামরিক ব্যয়কারী সৌদিকে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতাধর দেশ হিসেবে ধরা হয়। রাজতান্ত্রিক দেশ হওয়ায় যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক সংগঠন কিংবা জাতীয় নির্বাচন সৌদি আরবে নিষিদ্ধ।

বাদশাহদের শাসন

গত মাসের ২৩ তারিখ সৌদি আরব ৯১তম জাতীয় দিবস পালন করেছে। এ ৯১ বছরে সৌদি আরব শাসন করেছেন ছয়জন বাদশাহ। সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আবদুল আজিজ ১৯৩২ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত ২১ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। ক্ষমতা গ্রহণের পর বাদশাহ আজিজ ১৯৩৩ সালে মার্কিন তেল অনুসন্ধানকারী কোম্পানি ‘স্ট্যান্ডার্ড ওয়েল অব ক্যালিফোর্নিয়া’র সঙ্গে চুক্তি করে দেশটিতে তেল অনুসন্ধান শুরু করেন। ১৯৩৮ সালের মার্চ মাসে সেুৗদিতে প্রথম তেলের খনির সন্ধান মেলে। শুরু হয় তেল উত্তোলন, ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে দেশটির চেহারা। সৌদি আরবের অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়ন থেকে শুরু করে দরিদ্র দেশসমূহে সাহায্য-সহযোগিতা, আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের কারণে বিশ্ব দরবারে দেশটি উঠে আসে নতুন শক্তি হিসেবে।

বাদশাহ আবদুল আজিজের মৃত্যুর পর সৌদ বিন আবদুল আজিজ ১৯৫৩ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত ১১ বছর, ফয়সাল বিন আবদুল আজিজ ১৯৬৪ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত ১১ বছর, খালিদ বিন আবদুল আজিজ ১৯৭৫ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত ৭ বছর, ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ ১৯৮২ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ২৩ বছর, আবদুল্লাহ বিন আবদুল আজিজ ২০০৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ১০ বছর এবং সালমান বিন আবদুল আজিজ ২০১৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বাদশাহ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সৌদি রাজতন্ত্রের ৯১ বছরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের নানান সংকট, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে দ্বন্দ্ব পেরিয়ে বাদশাহ ফাহাদের যুগকে নানা দিক থেকে সৌদি আরবের স্বর্ণযুগ বলা হয়। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন, বিভিন্ন দরিদ্র মুসলিম দেশে শিক্ষা বিস্তার এবং হজ-ওমরাহ পালনকারীদের কল্যাণে মসজিদে হারাম ও মসজিদে নববির ব্যাপক উন্নয়নে তার অবদান চির স্মরণীয় হয়ে আছে।

প্রথাভাঙার শুরু

বাদশাহ আবদুল আজিজের মৃত্যুর পর থেকে কয়েক দশক ধরেই বিভিন্ন প্রদেশ ও কেন্দ্রে শাসনের দায়িত্ব ভাই থেকে ভাইয়ের মধ্যেই হাতবদল হয়েছে। বাদশাহ আবদুল আজিজই পৃথিবীর একমাত্র সৌভাগ্যবান বাবা, যার ছয়জন সন্তান ধারাবাহিকভাবে বাদশাহ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে এখন পর্যন্ত বাদশাহ আবদুল আজিজের ছেলেরা থাকলেও নানা সময়ে ভাইয়ে-ভাইয়ে ও ভাতিজাদের সঙ্গে ক্ষমতাসীন বাদশাহকে লড়াই করে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে হয়েছে।

বর্তমানে সৌদি রাজ পরিবারের সদস্য সংখ্যা প্রায় ১৬ হাজার। তবে তাদের মধ্যে ভাগ্যবান দুই হাজারের মতো সদস্যদের দ্বারা সৌদি আরব পরিচালিত হয়। সৌদি সাম্রাজ্যের উত্তরসূরি নির্বাচক কমিটির সদস্য সংখ্যা ৪৩। তবে বাদশাহ অন্য আপন ভাই, সৎ ভাই, ভাইয়ের ছেলে, সৎ ভাইয়ের ছেলে, বোন, বোনের সন্তানদের রাষ্ট্রীয় নানান পদে আসীন করে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করে চলেন। এমন রীতিই চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। এজন্য কোনো বাদশাহর ছেলেকে কখনো যুবরাজ ঘোষণা করা হয় না। কিন্তু মুহাম্মদ তার বাবা সালমানের শাসনামলে রীতি ভেঙে ‘যুবরাজ’ নিয়োগ পেয়েছেন। এর মাধ্যমে রাজ পরিবারে প্রথাভাঙার সূচনা হয়েছে।

নারীর ক্ষমতায়ন

রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরব পৃথিবীর সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ও সংস্কার কার্যক্রম থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছে। তবে সময়ের আবর্তন, যুগের চাহিদার ভিত্তিতে পরিবর্তনের আওয়াজ উঠতে থাকে। এ আওয়াজের ফলে ১৯৫৫ সালে মেয়েদের জন্য প্রথম স্কুল এবং ১৯৭০ সালে মেয়েদের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় চালু করা হয়। সৌদি আরবে মেয়েদের প্রথম স্কুলের নাম দার আল হানান। আর রিয়াদ কলেজ অব এডুকেশন সৌদি নারীদের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়। পরিবর্তিত সময়ের চাহিদার ভিত্তিতে ধীরে ধীরে নারীদের সমাজের মূলস্রোতে তুলে আনার লক্ষ্যে এগোতে থাকেন শাসকরা। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০১ সাল থেকে নারীরা পুরুষ অভিভাবকের অনুমতি ছাড়াই পরিচয়পত্র নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। ২০০৫ সালে সৌদি আরবে নারীদের জোরপূর্বক বিয়ে নিষিদ্ধ হয়। ২০০৯ সালে বাদশাহ আবদুল্লাহ সৌদি আরবের প্রথম নারী মন্ত্রী হিসেবে নুরা আল কায়েজকে নিয়োগ দেন। ২০১২ সালে প্রথমবারের মতো অলিম্পিকে অংশ নেন সৌদি নারীরা। তাদের মধ্যে সারাহ আত্তার নারীদের ৮০০ মিটার দৌড়ে লন্ডন অলিম্পিকের ট্র্যাকে নামেন হিজাব পরে। ২০১৩ সালে কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় ইসলামি রীতিতে পুরো শরীর ঢেকে এবং কোনো পুরুষ আত্মীয়ের উপস্থিতিতে সাইকেল ও মোটরসাইকেল চালানোর অনুমতি পায় সৌদি নারীরা। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাদশাহ আবদুল্লাহ সৌদি আরবের রক্ষণশীল কাউন্সিল শুরায় প্রথমবারের মতো ৩০ জন নারী নিয়োগ দেন। ২০১৫ সালে সৌদি আরবের পৌরসভা নির্বাচনে নারীরা প্রথমবারের মতো ভোট দেওয়ার এবং নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। ওই নির্বাচনে ২০ জন নারী নির্বাচিত হন। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে সৌদি আরব দেশটির স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারপারসন হিসেবে সারাহ আল সুহাইমির নাম ঘোষণা করে আরেক ইতিহাস রচনা করে। ২০১৮ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর সৌদি আরব নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি-সংক্রান্ত এক আদেশ জারি করে। ২০১৮ সালের জুন মাসে এই আদেশ কার্যকর হয়। এর ফলে সৌদি নারীরা গাড়ি চালানোর স্বতন্ত্র লাইসেন্স পাচ্ছেন।

২০২১ সালের এপ্রিল মাসে প্রথমবারের মতো মক্কার মসজিদে হারাম ও মদিনার মসজিদে নববির নিরাপত্তার দায়িত্বে নারী সদস্য মোতায়েন করা হয়। এবারই প্রথমবারের মতো নারীদের একাকী হজপালনের অনুমতি দেয় সৌদি কর্র্তৃপক্ষ। চলতি বছরের আগস্ট মাসে হারামাইন পরিচালনা পরিষদে দশজন নারী সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়।

কর্মক্ষেত্রে সৌদি নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোরও পরিকল্পনা করা হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে জনশক্তির এক-তৃতীয়াংশ নারী করতে চায় দেশটি। এসব ছাড়াও সম্প্রতি প্রথম নারী রেস্তোরাঁ মালিক, প্রথম নারী পশু চিকিৎসক, প্রথম নারী ট্যুর গাইড পেয়েছে সৌদি আরব।

আধুনিকতার পথে ক্রাউন প্রিন্স

ইসলামি নিয়ম-কানুনে অভ্যস্ত দেশটিতে এখন পরিবর্তনের সুর। এমন সুর কিছুদিন আগেও ছিল অকল্পনীয়। এসব কিছুর মূলে রয়েছেন যুবরাজ মুহাম্মদ। তিনি দেশটিকে উদারপন্থি মুসলিম দেশে রূপান্তরিত করার ঘোষণা দিয়েছেন। অবশ্য যুবরাজের এই উদারপন্থি মনোভাবের কঠোর সমালোচনা করছেন অনেকে। কেউ আবার বলছেন, এটা বিনিয়োগ আকর্ষণের কৌশল। এত দিন সৌদি আরবের অর্থনীতি তেল দিয়ে চলেছে। ধারাবাহিকভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে যাওয়ায় এখন পর্যটন, প্রযুক্তি, বাণিজ্যসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে হাত বাড়াতে চাইছে দেশটি। হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকার মরুভূমিকে নতুন শহরে পরিণত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মূলত তেলভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে রূপান্তর, নতুন চাকরির ক্ষেত্র তৈরি ও বিনিয়োগ বাড়াতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে নতুন দেশ গড়ে তোলার স্বপ্নে ২০১৬ সালে ‘ভিশন ২০৩০’ ঘোষণা করেন মুহাম্মদ বিন সালমান। যার মাধ্যমে সৌদিকে রক্ষণশীলতার পরিবর্তে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে ব্যাপক কর্মকাণ্ড হাতে নেন।

মুহাম্মদ বিন সালমান আল সৌদ হলেন সৌদি আরবের যুবরাজ, উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং পৃথিবীর সবচেয়ে কমবয়সী প্রতিরক্ষা মন্ত্রী। পিতা বাদশাহ সালমানের পরেই তার ক্ষমতা। ২০১৭ সালের ২১ জুন মুহাম্মদ বিন নায়েফকে যুবরাজের পদ থেকে অপসারণ করে মুহাম্মদ বিন সালমানকে যুবরাজ মনোনীত করা হয়। রাজকীয় ফরমানে নায়েফকে তার সব পদ থেকে অপসারণ করে তার সব ক্ষমতা মুহাম্মদকে দেওয়া হয়।  ক্রাউন প্রিন্সের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সৌদি আরবে সংস্কারের লক্ষ্যে সামাজিক, অর্থনৈতিক,  আইন, সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন ধরনের মেগা প্রজেক্ট গ্রহণ করেন। যার মাধ্যমে রক্ষণশীলতার পরিবর্তে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সৌদি আরবকে চালাতে ব্যাপক কর্মকাণ্ড হাতে নেন।

সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার

২০১৮ সালের অক্টোবরে ক্রাউন প্রিন্স ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ উদ্যোগের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেশকে মডারেট ইসলামি দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি করেন। ২০১৯ সালে এক ডিক্রিতে নারীদের ভ্রমণের বিধিনিষেধ রহিত করে জানানো হয়, ২০১৯ সালের ২০ আগস্টের পর থেকে ২১ বছর বা তার বেশি বয়সের নারীদের স্বাধীনভাবে ভ্রমণের অনুমতি রয়েছে। একই বছর সৌদি আরব ট্যুরিস্ট ই-ভিসা চালু করে। বিশ্বের ৪৯টি দেশের দর্শনার্থীরা নতুন এই ভিসা ব্যবহারের সুযোগ পায়। 

২০১৭ সালে যুবরাজের নেতৃত্বে দ্য পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড (পিআইএফ) গঠন করা হয়। একই বছর যুবরাজের নেতৃত্বে রিয়াদে দ্য মিস্ক ফাউন্ডেশন নামে একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। যেখানে দেশটির সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে যোগ্য তরুণদের একত্র করা হয়। ২০১৮ সালে সৌদি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ মন্ত্রণালয় ঘোষণা করে যে নারীদের নিজস্ব ব্যবসা শুরুর জন্য পুরুষ অভিভাবকের অনুমতির প্রয়োজন নেই। ২০১৮ সালে ক্রাউন প্রিন্স সৌদি আরবে প্রথম নিউক্লিয়ার প্রজেক্ট হাতে নেয়। ১৬টি পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণ করা হবে এই কার্যক্রমে। পরবর্তী ২৫ বছরের জন্য ৮০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে এ প্রকল্প নেওয়া হয়। ২০১৯ সালে সৌদি মন্ত্রিসভা বিশেষ আকামা সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা দেয়, যার ফলে বিদেশি নাগরিকরা কোনো স্পন্সর ছাড়া দেশটিতে কাজ করার ও থাকার সুবিধা পাবেন। একই বছর দেশটির শেয়ারবাজারে বিদেশিদের বিনিয়োগে বিশেষ সুবিধা গ্রহণ করে ও সৌদি আরামকো কোম্পানির শেয়ার ছাড়লে এটি বিশ্বের এটি বিশ্বের বৃহত্তম আইপিওতে পরিণত হয়।

মেগা প্রজেক্ট

ক্রাউন প্রিন্স রিয়াদের বাইরে কয়েকশ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে কিদ্দিয়া প্রকল্প ঘোষণা করেন। নতুন এই শহর বিনোদন, খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক শহর হিসেবে পরিচিত। বাদশাহ সালমান ২০১৮ সালে ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটির উদ্বোধন করেন। ক্রাউন প্রিন্স লোহিত সাগরের তীরে একটি মেগা পর্যটন প্রকল্প হাতে নেন, যেখানে ৫০টি দ্বীপপুঞ্জকে ঘিরে হ্রদ তৈরি করা হবে। এখান থেকে বার্ষিক চার বিলিয়ন ডলার আসবে এবং ৩৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে।২০১৭ সালে যুবরাজ তাঁবুক প্রদেশে ৫০০ বিলিয়ন ডলায় ব্যয়ে নিওম মেগা সিটি প্রকল্পের উন্মোচন করেন। বিশ্বের প্রথম স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে পরিচিতি লাভ করা এই মেগা সিটি সম্পূর্ণ বায়ু এবং সৌরশক্তিতে কাজ করবে।

শিল্প, সংস্কৃতি ও বিনোদনমূলক সংস্কার

২০১৮ সালে ৩৫ বছরের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে রিয়াদে প্রথম বাণিজ্যিক সিনেমা হল চালু হয়। যেখানে ‘ব্ল্যাক প্যান্থার’ সিনেমা মুক্তি পায়। একই বছর সৌদি আরব প্রথমবারের মতো কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে অংশ নেয়। ২০১৮ সালে সৌদি প্রথমবারের মতো ভেনিস আর্কিটেকচার বিয়েনলে অংশ নেয়। এ বছর রিয়াদের ফর্মুলা রেসে প্রথম আন্তর্জাতিক পারফরমারদের মধ্যে এনরিক ইগলেসিয়াস, আমর দিয়াব এবং ব্ল্যাক আইড পিস অংশ নেয়, যাদের জন্য প্রথম পরীক্ষামূলক ট্যুরিস্ট ভিসা মঞ্জুর করা হয়। এ বছরই সৌদিতে প্রথম শীতকালীন ট্যান্টোরা ফেস্টিভ্যাল শুরু হয়। আন্তর্জাতিক অভিনেতা এবং বিশ্বের দর্শনার্থীদের আলুলায় নিয়ে আসা হয়।

২০১৯ সাল থেকে সৌদি আরবজুড়ে গানের উৎসব হয়। দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে শুরু হওয়া এ অনুষ্ঠানে পিটবুল এবং আকনের মতো আন্তর্জাতিক তারকারা সংগীত পরিবেশনা করেন।

২০২০ সালে ডেজার্ট এক্স আলুলার প্রথম সংস্করণে সৌদি থেকে শিল্পীদের ১৪টি বড় আকারের ভাস্কর্য প্রদর্শনীর ব্যবস্থা হাতে নেয়। যেখানে সৌদি আরব, মধ্যপ্রাচ্য ও আমেরিকার শিল্পীরা অংশগ্রহণ করেন।

খেলাধুলা

২০১৭ সালে ভিশন ২০৩০-এর অন্যতম লক্ষ্য অনুসারে একটি ডিক্রি জারি করে স্কুলে মেয়েদের শারীরিক শিক্ষাকার্যক্রম অনুমোদন করে, যাতে আরও বেশি নাগরিক খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করতে পারে।

২০১৮ সালে জেদ্দায় আল-আহলি বনাম আল-বাটিন খেলায় প্রথমবারের মতো সৌদি নারীদের মাঠে বসে খেলা দেখার অনুমতি দেওয়া হয়। ২০১৯ সালে জেদ্দায় ইতালিয়ান সুপার কাপের জুভেন্টাস এবং এসি মিলানের মধ্যকার খেলা অনুষ্ঠিত হয়। রিয়াদের দিরিয়া স্টেডিয়ামে অ্যান্টনি জোশুয়া ও অ্যান্ডি রুইজ জুনিয়রের মধ্যকার লড়াই দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে প্রথম হেভিওয়েট বক্সিং ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়।

২০২০ সালে সৌদি আরব ডাকার র‌্যালির আয়োজন করে। প্রথমবারের মতো মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিতে এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন

যুগের পর যুগ ধরে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও উচ্চপর্যায়ের ধর্মীয় নেতারা জনগণের আচরণ ও দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের নিয়ম নির্ধারণ করতেন। সম্পদশালী ও ক্ষমতাধর শেখরা বলে দিতেন কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল। শুধু তা-ই নয়, অতীতে দেশটির ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সৌদি সাম্রাজ্যের তেল-সম্পদ ব্যয় করেছে সৌদি ইসলাম (সালাফিজম) প্রচারে। কিন্তু বৈশ্বিক রাজনীতিসহ নানা কারণে, যুবরাজ মুহাম্মদ সৌদি আরবে ‘মধ্যপন্থি’ ইসলামের বিস্তৃতি ঘটাতে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে রদবদল করেছেন, অর্থ ব্যয় কমিয়ে দিয়েছেন। এর ফলে কমে গেছে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও নেতাদের ক্ষমতা। বিন সালমান সৌদির ধর্মীয় পুলিশ বাহিনীর কাছ থেকে কাউকে গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছেন। যুবরাজের সমালোচনা করায় কট্টরপন্থি বেশ কয়েকজন ধর্মীয় নেতাকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই চরম রক্ষণশীল ইসলামি রাষ্ট্র সৌদি আরবকে সব দেশের সব ধর্মের মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন যুবরাজ। তিনি বলেছেন, ‘আমরা তো শুধু সেই মধ্যপন্থি ইসলাম ব্যবস্থায় ফিরে যাচ্ছি, যা আগে ছিলাম, যা ছিল পুরো বিশ্বের সব ধর্মের জন্য উন্মুক্ত। আমরা আমাদের জীবনের ৩০ বছর কোনো ধরনের উগ্রবাদী চিন্তাধারা সামলানোর পেছনে অপচয় করব না। আমরা চরমপন্থা নির্মূল করব।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত