শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৭ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

চলে যাচ্ছে শত শত কোটি টাকা

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২১, ০২:৫৭ এএম

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুক ও সার্চ ইঞ্জিন গুগল বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন থেকে ২০১৬ সালে আয় করেছিল গড়ে আট কোটি টাকার কিছু বেশি। মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় বাংলাদেশ থেকে বিজ্ঞাপন বাবদ বৈশ্বিক ওই প্রতিষ্ঠান দুটির আয় বেড়েছে গড়ে ২০ গুণ। অথচ প্রতিষ্ঠান দুটির আয়ের ন্যায্য ভাগ পাচ্ছে না বাংলাদেশ। গণমাধ্যমসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে প্রতিদিন লাখ লাখ নিউজ লিংক ও কনটেন্ট শেয়ার হয় ফেইসবুকে। সেসব কনটেন্ট যারা দেখেন, তাদের দেখিয়ে বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছ থেকে কোটি টাকা আয় করছে ফেইসবুক ও গুগুল। সংশ্লিষ্ট নিউজ ও কনটেন্ট নির্মাতারাও ওই অর্থের একাংশের দাবিদার। বাংলাদেশের উচিত বিজ্ঞাপনের ওই অর্থে ফেইসবুক ও গুগলের কাছ থেকে ভাগ বসানো। কারণ এটি তাদের ন্যায্য পাওনা। এসব কনটেন্ট গুগল ও ফেইসবুকের নিজের না। অন্যের কনটেন্ট ও নিউজ দিয়ে একচেটিয়া ব্যবসা করার সুযোগ আর এসব প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া উচিত না।

এদিকে গুগল ও ফেইসবুক বৈধপথে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নেওয়া বিজ্ঞাপনের অর্থের যে হিসাব দেখাচ্ছে, বাস্তবে তার আকার বহুগুণ বেশি বলে মনে করছেন বিজ্ঞাপনদাতা ব্যবসায়ী ও তথ্যপ্রযুক্তিবিদরা। তারা বলছেন, ফেইসবুক ও গুগল অর্থের যে হিসাব দেখিয়েছে, তাতে বাস্তব চিত্র প্রতিফলিত হয়নি। যত অর্থ বৈধভাবে বিজ্ঞাপনের জন্য তাদের দেওয়া হয়, অবৈধ পথে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি অর্থ দেওয়া হচ্ছে। ওই অর্থ অবৈধ পদ্ধতিতে বিদেশে ‘পাচার’ হচ্ছে।

আর শুধু যে ফেইসবুক-গুগলের কাছ থেকেই বাংলাদেশ ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তা নয়, শেয়ার-ইট, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো, টিন্ডার, ট্যানট্যান, পিডিএফসহ আরও বহু জনপ্রিয় অ্যাপস ও সফটওয়্যার বিজ্ঞাপন দেখিয়ে দেশি বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা আয় করলেও এ বাবদ বাংলাদেশ সরকারকে কোনো ভ্যাট ও রাজস্ব দেয় না। শুধু তা-ই নয়, এসব অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞাপন ব্যয় যে পদ্ধতিতে পরিশোধ করা হয়, তা টাকা পাচারের শামিল বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

শুধু বাংলাদেশে নয়, ফেইসবুকে বিজ্ঞাপন প্রদানের হার বাড়ায় বৈশ্বিকভাবে ছাপা পত্রিকা, টেলিভিশন চ্যানেল, রেডিওসহ ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ওই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অস্ট্রেলিয়ার সরকার ফেইসবুকের বিজ্ঞাপনের আয়ের ভাগ দেশটির গণমাধ্যমকে দিতে বাধ্য করেছে।

বাংলাদেশের বিজ্ঞাপনের বাজার ঠিক কত বড়, এ বিষয়ে পরিষ্কার কোনো তথ্য নেই। বিভিন্ন সময়ে এই খাতের বিশেষজ্ঞরা দেশের বিজ্ঞাপনের মোট বাজার সাড়ে তিন থেকে চার হাজার কোটি টাকা বলে তথ্য দিয়েছেন। তবে কেউ কেউ দাবি করেছেন প্রকৃত বাজার এর থেকেও বড়। এক সময়ে ছাপা পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর বিজ্ঞাপন খাত থেকে আয়ের প্রধান উৎস ছিল বিদেশি বহুজাতিক মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো। কিন্তু গত পাঁচ বছরে এসব কোম্পানি ছাপা পত্রিকা ও টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন দেওয়া প্রায় বন্ধই করে দিয়েছে। মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে ফেইসবুক, গুগলসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে। এর মধ্যে আবার এমন সব অনলাইন প্ল্যাটফর্ম রয়েছে, যেগুলোর মূসক (মূল্য সংযোজন কর) নিবন্ধন নেই বাংলাদেশে।

টেলিযোগাযোগ খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ৫ বছরে দেশের তিনটি বেসরকারি মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংক অনলাইন বিজ্ঞাপন বাবদ ৮ হাজার ৭৪৪ কোটি খরচ করেছে। অথচ ওই সময়কালে দেশে ফেইসবুক ও গুগলের মূসক নিবন্ধনই ছিল না। ফলে গোটা টাকাটাই তারা বেআইনিভাবে বিদেশি কোম্পানির ব্যাংক হিসেবে তুলে দিয়েছে বলে অনেকের মত। এটা মানি লন্ডারিং বা মুদ্রা পাচারের মতোই অন্যায়।

ফেইসবুক ও গুগলে বিজ্ঞাপন দেন এমন আটজন বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলেছে দেশ রূপান্তর। তারা বলেছেন, গুগল ও ফেইসবুক বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে বৈধপথে নেওয়া বিজ্ঞাপনের অর্থের যে হিসাব দেখাচ্ছে, বাস্তবে তার পরিমাণ বহুগুণ বেশি। এই ব্যবসায়ীরা গুগল ও ফেইসবুকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিজ্ঞাপন দেন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে। এই তৃতীয়পক্ষ যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ বা সংশ্লিষ্ট অন্য কোনো দেশের ব্যাংক হিসেবে খোলা কার্ড থেকে বিজ্ঞাপনের ব্যয় পরিশোধ করে। সে ক্ষেত্রে তারা প্রতি এক ডলার পরিশোধের জন্য ১০০ থেকে ১১০ টাকা নিয়ে থাকে। যদি বাজারে ডলারের মূল্য হয় ৮৫ টাকা তাহলে ডলারের সেবা দেওয়ার জন্য তৃতীয়পক্ষ বাংলাদেশের এসব ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রতি এক ডলার পরিশোধের জন্য ১০০ থেকে ১১০ টাকা নিয়ে থাকে। আর এভাবে তারা দেশের অর্থ বেআইনি পদ্ধতিতে বিদেশে পাচার করছে।

ওই ব্যবসায়ীরা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, দেশে নারী উদ্যেক্তাদের সবচেয়ে বড় ফেইসবুক গ্রুপ হলো উইম্যান অ্যান্ড ই-কমার্স ফোরাম (উই)। যেখানে ১২ লাখের বেশি সদস্য রয়েছেন। এসব উদ্যোক্তার বড় অংশ ফেইসবুক, গুগলসহ অনলাইন বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন দিয়ে ব্যবসা করেন। এর বাইরে লাখ লাখ ব্যক্তি ফেইসবুক ও গুগলে বিজ্ঞাপন দিয়ে ব্যবসা করেন। এসব দেশি উদ্যোক্তার কাছ থেকে ফেইসবুক ও গুগলের বছরে বিজ্ঞাপন বাবদ আয়ের উল্লিখিত হিসাবের বাইরে নেওয়া অর্থের পরিমাণই বরং বেশি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

তারা বলছেন, ফেইসবুক ও গুগুল এত দিন অবৈধভাবে বাংলাদেশে ব্যবসা করছিল। তারা বাংলাদেশ থেকে উপার্জিত অর্থের কোনো মূসক ও রাজস্ব দেয়নি। এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের নভেম্বরে উচ্চ আদালত ফেইসবুক ও গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে নিবন্ধন নেওয়ার পাশাপাশি তাদের কাছ থেকে কত টাকা পাওয়া যাচ্ছে তা ছয় মাস অন্তর আদালতকে জানানোর নির্দেশ দেয়। এরপরই ফেইসবুক ও গুগল বাংলাদেশে তাদের ব্যবসা পরিচালনার জন্য নিবন্ধন করে।

ফেইসবুক ও গুগলের মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের নিউজ কনটেন্টের মেধাস্বত্বের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গত শুক্রবার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তার ব্যক্তিগত সহকারী প্রশ্ন পাঠাতে বলেন। প্রশ্ন পাঠানোর পর কয়েক দফা যোগাযোগ করা হলে তার ব্যক্তিগত সহকারী জানান, প্রতিমন্ত্রী পলক ব্যস্ত আছেন। এরপর গতকাল শনিবার প্রতিমন্ত্রীর মোবাইল ফোনে ফের যোগাযোগ করা হলে আবারও তার ব্যক্তিগত সহকারী বলেন, ‘আমি প্রতিমন্ত্রী মহোদয়কে বিষয়টি জানাব।’ এরপর আর প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

অস্ট্রেলিয়ায় ফেইসবুকের নতি স্বীকার

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়ার সরকার দেশটির সংসদের উচ্চকক্ষে ‘নিউজ মিডিয়া বার্গেনিং কোড’ নামে একটি আইন পাস করে। ওই আইন অনুযায়ী, কোনো সংবাদ সংস্থার নিউজ কনটেন্ট ফেইসবুক বা গুগলের প্ল্যাটফর্মে রাখলে তার জন্য অর্থ দিতে হবে গুগল, ফেইসবুককে। কারণ তারা ওই সংবাদ থেকে অর্থ রোজগার করছে, যার লভ্যাংশ সংবাদ সংস্থাটিরও প্রাপ্য। ওই আইন পাস হওয়ার পর ফেইসবুক প্রথমে অস্ট্রেলিয়ায় কিছুদিনের জন্য সেবা বন্ধ করে দেয়। আর গুগল হুমকি দিয়ে বসে যে তারা এ আইন কার্যকর হলে অস্ট্রেলিয়ায় কার্যক্রম চালাবে না। তবে শেষ পর্যন্ত গত মার্চ মাসে অস্ট্রেলিয়ার আইন মেনেই ফেইসবুক দেশটির গণমাধ্যমকে অর্থ দিতে রাজি হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফেইসবুক ও গুগল নিজে কোনো নিউজ বা কনটেন্ট তৈরি করে না। নিউজ ও কনটেন্ট তৈরি করে বিভিন্ন গণমাধ্যম। তারা মূলত তাদের প্ল্যাটফর্মে এসব নিউজ ও কনটেন্ট শেয়ার করার সুযোগ করে দেয় সাধারণ ব্যবহারকারীদের। এর ফলে ফেইসবুক ও গুগলে প্রচুর ইউজার বা ট্রাফিক বেড়ে যায়। সেই ট্রাফিককে টার্গেট করে বিজ্ঞাপনদাতারা বিজ্ঞাপন দেয়, আর মাঝখান থেকে আয় করে ফেইসবুক ও গুগুল। এ কারণে যখন কোনো নিউজ লিংক ফেইসবুকে শেয়ার হবে আর গুগলের সার্চ ইঞ্জিনে তা পাওয়া যাবে, তখন তার জন্য ফেইসবুক ও গুগলকে বিজ্ঞাপন থেকে আয়ের ভাগ দিতে হবে অস্ট্রেলিয়ার গণমাধ্যমগুলোকে।

একইভাবে বাংলাদেশের গণমাধ্যমসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে প্রতিদিন লাখ লাখ নিউজ লিংক ও কনটেন্ট শেয়ার হয় ফেইসবুকে। সেসব কনটেন্ট যারা দেখেন, তাদের দেখিয়ে বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছ থেকে কোটি টাকা আয় করছে ফেইসবুক ও গুগুল। ওই অর্থে নিউজ ও কনটেন্ট নির্মাতাদের সত্যিকারে ভাগ রয়েছে। বাংলাদেশের উচিত বিজ্ঞাপনের ওই অর্থে ফেইসবুক ও গুগলের কাছ থেকে ভাগ বসানো। কারণ এটি তাদের সত্যিকারে পাওনা। এসব কনটেন্ট গুগল ও ফেইসবুকের নিজের না। অন্যের কনটেন্ট ও নিউজ দিয়ে একচেটিয়া ব্যবসা করার সুযোগ তাদের দেওয়া উচিত না।

দেশে পাঁচ বছরে ফেইসবুক-গুগুলের আয়

চলতি বছরের গত জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ফেইসবুক বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন থেকে আয় করেছে ১১০ কোটি টাকা। বছর শেষে এটি ১৬০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। ফেইসবুক ২০১৬ সালে বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন থেকে ৮ কোটি ৩৩ লাখ টাকা আয় করে। এরপরের বছর ২০১৭ সালে ফেইসবুক এ খাত থেকে আয় করে ১৫ কোটি ৮১ লাখ টাকা। ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠানটির আয় ছিল ৩৪ কোটি ৯২ লাখ টাকা। ২০১৯ সালে আয় করেছে ৬৭ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। গত বছর অর্থাৎ ২০২০ সালে ফেইসবুক বাংলাদেশ থেকে বিজ্ঞাপন বাবদ আয় করেছে ৮২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।

অন্যদিকে সার্চ ইঞ্জিন জায়ান্ট গুগল গত জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৯৫ কোটি টাকার বিজ্ঞাপন পেয়েছে বাংলাদেশ থেকে। আর গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশ থেকে গুগল বিজ্ঞাপন বাবদ আয় করেছে ৩৩১ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে গুগলের আয় ছিল বাংলাদেশে ৮ কোটি ২৪ লাখ, ২০১৭ সালে এই আয় বেড়ে দাঁড়ায় ১১ কোটি ২২ লাখ টাকায়। ২০১৮ সালে গুগল বাংলাদেশে আয় করে ৪৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। ২০১৯ সালে গুগল বিজ্ঞাপন বাবদ এখান থেকে আয় করে ৭৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। আর গত বছরে গুগল বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন থেকে আয় করেছে ৯৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এ বছরে গুগলের বাংলাদেশ থেকে আয় হতে পারে ১৫০ কোটি টাকা। গত পাঁচ বছরে গুগলের আয় বাংলাদেশে বেড়েছে প্রায় ২০ গুণ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব আরিফ জেবতিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফেইসবুক ও গুগল অর্থের যে হিসাব দেখিয়েছে তাতে বাস্তব চিত্র প্রতিফলিত হয়নি। যত অর্থ বৈধভাবে বিজ্ঞাপনের জন্য এদের দেওয়া হয়, অবৈধ পথে তার থেকে বহুগুণ বেশি অর্থ দেওয়া হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘নিউজ কনটেন্টসহ মানুষ ফেইসবুকে যখন কোনো পোস্ট লেখে, মেধাসত্ব অনুযায়ী সেটার ওপর ওই ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের অধিকার তৈরি হয়। ফলে কনটেন্টের জন্য গুগল ও ফেইসবুককে অর্থ দিতে হবে। আজকের দুনিয়ায় বিনা অর্থে ব্যবসা করার সুযোগ রাখা উচিত না। বাংলাদেশ থেকে নেওয়া বিজ্ঞাপনের আয়ের ভাগ দেওয়ার বিষয়ে সরকারের দ্রুত আইন করা উচিত।’

আড়ালে থাকছে শতাধিক অ্যাপস

শুধু যে ফেইসবুক-গুগলের কাছ থেকেই বাংলাদেশ ন্যায্য হিস্যা বঞ্চিত হচ্ছে তা নয়, আরও বহু জনপ্রিয় অ্যাপস ও সফটওয়্যার বিজ্ঞাপন দেখিয়ে দেশি বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা আয় করলেও এ বাবদ বাংলাদেশ সরকারকে কোনো ভ্যাট ও রাজস্ব দেয় না। এর মধ্যে একটি অ্যাপস হলো শেয়ার-ইট। এ অ্যাপসটির মাধ্যমে একটি মোবাইল বা ডিভাইস থেকে অন্য মোবাইল বা ডিভাইসে সহজে তথ্য আদান-প্রদান করা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ার-ইট অ্যাপসটি খুললে প্রচুর দেশি বিজ্ঞাপন ভেসে আসতে দেখা যাচ্ছে। একইভাবে ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ, টিন্ডার, ট্যানট্যান, পিডিএফসহ যেকোনো ধরনের অ্যাপস ও সফটওয়্যারের সুবিধা এখন আর মুফতে মেলে না। সেখানে থাকে একের পর এক দেশি বিজ্ঞাপন। অ্যাপসগুলো কোটি কোটি টাকা আয় করলেও তারা এ বাবদ বাংলাদেশ সরকারকে কোনো ভ্যাট ও রাজস্ব দেয় না। আর এসব অ্যাপসে যারা বিজ্ঞাপন দেয়, তারা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে বিজ্ঞাপনের অর্থ পরিশোধ করে। এসব অ্যাপসে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য দেশে ইতিমধ্যে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করা মূলত বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচারের শামিল। তবে এসব অ্যাপসের মাধ্যমে কত টাকা বিদেশে ‘পাচার’ হচ্ছে তার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান বা তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে নেই। কারণ হিসেবে তারা বলছে, যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অনলাইনের কোনো প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে তার ক্রেডিট কার্ড থেকে ডলার হিসেবে অর্থ জমা পড়ছে ওই প্রতিষ্ঠানের বিদেশি ব্যাংক হিসাবে। যদি অ্যাপস বা ডেটিং সাইটগুলো দেশে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান না হয়, তাহলে তাদের শনাক্ত করা কঠিন। ফেইসবুক, গুগুল, আমাজন ও মাইক্রোসফটের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো দেশে ভ্যাট নিবন্ধন করলেও শতাধিক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এখনো ভ্যাট নিবন্ধন করেনি। ফলে তাদের বিদেশের ব্যাংক হিসাবে জমা হওয়া বাংলাদেশি অর্থ মূলত পাচার হওয়া অর্থ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে চাকরি খোঁজার দেশীয় জনপ্রিয় অনলাইন পোর্টাল বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এ কে এম ফাহিম মাশরুর টেলিফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফেইসবুক, গুগল থেকে সরকার সামান্য কিছু ভ্যাট পাচ্ছে। বাস্তবে বহুগুণ বেশি অর্থ ফেইসবুক, গুগল অবৈধপথে নিচ্ছে বাংলাদেশ থেকে। সরকার সামান্য অর্থ পেলেও যে গণমাধ্যমের নিউজ কনটেন্ট শেয়ার করে ফেইসবুক এবং সার্চ ইঞ্জিন গুগল ব্যবসা করছে, সেই গণমাধ্যমের কোনো লাভ কিন্তু হচ্ছে না। যেসব মিডিয়ার নিউজ কনটেন্ট দেখিয়ে গুগল ও ফেইসবুক বিজ্ঞাপন নিচ্ছে, সেই মিডিয়াকে বিজ্ঞাপনের অর্থের ভাগ দিতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বহুদিন ধরে বলছি, যারা বাংলাদেশে ব্যবসা করবে, তাদের প্রত্যেকের বাংলাদেশের আইন মেনে, বাংলাদেশে কোম্পানি খুলে নিবন্ধন করে ব্যবসা করতে হবে। ফেইসবুক, গুগল শুধু ভ্যাট নিবন্ধন করেই ব্যবসা করছে। অস্ট্রেলিয়ার মতো যদি এদের বিজ্ঞাপনের অর্থ দেশের গণমাধ্যমের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে বাধ্য করতে হয়, তাহলে প্রথমে তাদের এ দেশে কোম্পানি খুলতে হবে, অফিস নিতে হবে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত