রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

এনআইডি ও গেজেট জালিয়াতি

দুই জায়গা থেকে ভাতা নেন এক মুক্তিযোদ্ধা!

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২১, ০৩:০০ এএম

জাতীয় পরিচয়পত্র ও গেজেট জালিয়াতির মাধ্যমে সাত বছর ধরে একই সঙ্গে দিনাজপুরের বিরামপুর এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থেকে মুক্তিযোদ্ধার ভাতা তুলতেন ফাইজুল ইসলাম। কিন্তু সমাজসেবা কার্যালয়ে এমআইএস সফটওয়ারের মাধ্যমে ভাতাভোগীর ডেটাবেইস তৈরির কার্যক্রম শুরু হওয়ায় ধরা পড়ে এই মুক্তিযোদ্ধার জালিয়াতি। একই জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর দিয়ে একাধিক স্থান থেকে সরকারি ভাতা নেওয়ার পথ তার বন্ধ হয়ে যায়। অবশ্য তাতেও দমেননি ফাইজুল। দুই জায়গা থেকেই কৌশলে ভাতার টাকা তোলার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যান। এমন পরিস্থিতিতে বিরামপুর উপজেলা প্রশাসন ও সমাজসেবা কার্যালয়ের তদন্তে ফাইজুল ইসলামের ভাতা জালিয়াতির বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর বিরামপুর থেকে তার ভাতা উত্তোলন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

দিনাজপুরের বিরামপুর এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ সমাজসেবা কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্যমতে, ফাইজুল ইসলামের আদি নিবাস চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে। স্বাধীনতার পরপর সপরিবারে বিরামপুরে এসে আবাস গড়েন। ফাইজুল ইসলাম বর্তমানে বিরামপুরের খানপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ শাহাবাজপুর (পত্নিচান) গ্রামের বাসিন্দা। বিরামপুর সমাজসেবা কার্যালয়ে জমা দেওয়া তথ্যে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার গেজেট নম্বর উল্লেখ রয়েছে ৯১৫। অন্যদিকে শিবগঞ্জ সমাজসেবা কার্যালয়ে জাতীয় পরিচয়পত্রে ঠিকানা হিসেবে ফাইজুল ইসলাম তার গ্রাম আটবশিয়া দামোদিয়ার, ডাকঘর-শিবগঞ্জ, উপজেলা-শিবগঞ্জ, জেলা-চাঁপাইনবাবগঞ্জ উল্লেখ করেছেন। আর মুক্তিযোদ্ধার গেজেট নম্বর উল্লেখ করেছেন ১০৪। ফাইজুল ইসলামের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ২৭১১০৭১৮২৪৭৬৯ এবং লাল মুক্তিবার্তা নম্বর ০৩০৮১০০১৮৫। ২০১৪ সাল থেকে তিনি বিরামপুর হতে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা গ্রহণ করে আসছেন। ২০২০ সালে সমাজসেবা কার্যালয়ে এমআইএস সফটওয়্যারের মাধ্যমে ভাতাভোগীর ডেটাবেইস তৈরির কার্যক্রম শুরু হয়। এর ফলে একই জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর দিয়ে একাধিক জায়গা থেকে সরকারি ভাতা নেওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়। ফাইজুল ইসলাম চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে আগে থেকেই ডেটাবেইসে অন্তর্ভুক্ত থাকায় বিরামপুর থেকে তার ভাতা প্রদান বন্ধ হয়ে যায়। এ নিয়ে তিনি প্রতিবাদ জানান। সে সময় সমাজসেবা কার্যালয় ফাইজুল ইসলামের প্রতারণার বিষয়টি ধরতে না পারায় মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের আইটি শাখা থেকে আবারও বিরামপুরে তার ভাতা চালু করা হয়। কিন্তু শিবগঞ্জে ভাতা বন্ধ হয়ে যায়। ফাইজুল ইসলাম আবারও শিবগঞ্জে ভাতা চালু করলে বিরামপুরে পুনরায় ভাতা বন্ধ হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে বিরামপুর সমাজসেবা কার্যালয় থেকে অনুসন্ধান শুরু করলে গত বছরের ডিসেম্বরে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের আইটি শাখা থেকে জানানো হয় যে ফাইজুল ইসলাম একই সঙ্গে বিরামপুর ও শিবগঞ্জ থেকে ভাতা উত্তোলন করছেন।

এ প্রসঙ্গে বিরামপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. রাজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষের নির্দেশনা পেয়ে এ বছর ফেব্রুয়ারি মাস থেকে ফাইজুলের ভাতা প্রদান বন্ধ করা হয়েছে।’

অন্যদিকে শিবগঞ্জ সমাজসেবা কর্মকর্তা কাঞ্চন কুমার দাস বলেন, ‘ফাইজুল ইসলাম জাতীয় পরিচয়পত্র এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বেসরকারি গেজেট জালিয়াতির মাধ্যমে দীর্ঘদিন থেকে দুই জায়গা থেকে ভাতা উত্তোলন করে আসছিলেন বলে তথ্য পেয়েছি। এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

মুক্তিযোদ্ধার ভাতা জালিয়াতির বিষয়ে জানতে চাইলে বিরামপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পরিমল কুমার সরকার বলেন, ‘ফাইজুল ইসলামের বিরামপুর সমাজসেবা কার্যালয় থেকে ভাতা উত্তোলন বন্ধ রয়েছে। ভাতার বাড়তি নেওয়া টাকা ফেরতসহ এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সব নথিপত্র জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।’

ভাতা জালিয়াতির অভিযোগের বিষয়ে জানতে এই প্রতিবেদক মোবাইল ফোনে বীর মুক্তিযোদ্ধা ফাইজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। একই সঙ্গে বিরামপুর ও শিবগঞ্জ থেকে ভাতা উত্তোলনের বিষয়টি প্রথমে তিনি অস্বীকার করলেও পরে বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, বর্তমানে বিরামপুর থেকে ভাতা তোলা বন্ধ রয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত