শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৭ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও মুনাফার ন্যায্য হিস্যা

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২১, ১১:১১ পিএম

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রস্তুতিপর্বেই এ কালের নাগরিকদের সামাজিক যোগাযোগ, বিনোদন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান এবং অপরিহার্য মাধ্যম হয়ে উঠেছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলগুলোও এখন অনলাইন মাধ্যমগুলোতে গ্রাহকদের কাছে সেবা পৌঁছে দিচ্ছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল এসব মাধ্যমগুলো থেকে সেবাদানকারী বৈশ্বিক ও নানা দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল মুনাফা করছে। অথচ, যথাযথ আইন প্রণয়ন ও কার্যকর করার ধীরগতির কারণে সরকার বাংলাদেশে সক্রিয় নানা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রাপ্য বিপুল রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত থাকছে।

রবিবার দেশ রূপান্তরে ‘চলে যাচ্ছে শত শত কোটি টাকা’ শিরেনামের প্রতিবেদনে বৈশ্বিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুক ও সার্চ ইঞ্জিন গুগলের বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা করা এবং তাদের রাজস্ব প্রদানের নানা দিক তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের নানা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন থেকে ফেইসবুক ও গুগল ২০১৬ সালে আয় করেছিল গড়ে আট কোটি টাকার কিছু বেশি। মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় বাংলাদেশ থেকে বিজ্ঞাপন বাবদ বৈশ্বিক ওই প্রতিষ্ঠান দুটির আয় বেড়েছে গড়ে ২০ গুণ। অতিসম্প্রতি ফেইসবুক ও গুগল বাংলাদেশে মূসক নিবন্ধন করলেও এর আগ পর্যন্ত তারা নিজেরা কোনো রাজস্ব বাংলাদেশ সরকারকে দেয়নি। এক্ষেত্রে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে যে, মূসক নিবন্ধনের আগ পর্যন্ত তারা বাংলাদেশ থেকে যে বিপুল পরিমাণ বিজ্ঞাপন পেয়েছে, স্থানীয় বিজ্ঞাপনদাতারা সে সবের ওপর সরকারকে যথাযথ রাজস্ব প্রদান করেছে কি না। কেননা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী এ ধরনের লেনদেনের ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন দাতাকেই মোট প্রদেয় অর্থের ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট বা মূসক পরিশোধ করার কথা। আবার ফেইসবুক-গুগল এখন বাংলাদেশে মূসক নিবন্ধন করে ব্যবসা পরিচালনা করলেও শেয়ার-ইট, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো, টিন্ডার, ট্যানট্যান, পিডিএফসহ আরও বহু জনপ্রিয় অ্যাপস ও সফটওয়্যার কোম্পানি বাংলাদেশে নানা পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রদর্শন করে দেশি-বিদেশি বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা আয় করলেও এ বাবদ বাংলাদেশ সরকারকে কোনো ভ্যাট ও রাজস্ব দেয় না। বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনার জন্য এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মূসক নিবন্ধনও নেই।  

এই পরিপ্রেক্ষিতে দেশের বিজ্ঞাপনদাতা ব্যবসায়ী ও তথ্যপ্রযুক্তিবিদরা দাবি করছেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো নানা ফাঁকফোকর গলে দেশ থেকে প্রকাশিত হিসাবের বাইরেও বহুগুণ বেশি বিজ্ঞাপন পাচ্ছে এবং মুনাফা করছে। এসব অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞাপন ব্যয় যে পদ্ধতিতে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে ডলারের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়, সেটা অনেক ক্ষেত্রেই দেশ থেকে অর্থ পাচারের শামিল বলে মত বিশেষজ্ঞদের। এসব অ্যাপসে দেওয়া বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে কত টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে তার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান বা তথ্যও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে নেই। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ থেকে এসব বিদেশি প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞাপন দেওয়া কিংবা কোনো সেবা বা পণ্য কেনার ক্ষেত্রে অর্থ পরিশোধ করতে হয় ডলারে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে বৈধ পথে এই অর্থ পরিশোধ করার সুযোগ অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কিংবা ব্যক্তি পর্যায়ের ভোক্তার নেই। এক্ষেত্রে এমন কার্ড করার জন্য পাসপোর্ট থাকার বাধ্যবাধকতা এবং ডলারে অর্থ খরচের সর্বোচ্চ সীমা যথাযথ নয় বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। এসব জটিলতার কারণেই হয়তো অনেক উদ্যোক্তা ও ব্যক্তি তৃতীয় কোনো পক্ষের মাধ্যমে এমন লেনদেন করে থাকেন। সাম্প্রতিককালে এ জাতীয় লেনদেনের জন্য দেশে বেশ কিছু এজেন্টও তৈরি হয়েছে, যারা উদ্যোক্তা ও ব্যক্তি পর্যায়ের বিজ্ঞাপন দাতা ও ভোক্তাদের এসব লেনদেনের সুবিধা দিচ্ছে। এখন এই এজেন্টরা যথাযথ প্রক্রিয়ায় অর্থ পাঠাচ্ছে কি না এবং এমন প্রক্রিয়ার কারণেই সরকার এক্ষেত্রে রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে কি না সেটা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।   

এক্ষেত্রে গত পহেলা অক্টোবর থেকে দেশে বিজ্ঞাপনমুক্তভাবে বা ক্লিনফিড সম্প্রচার না করা বিদেশি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়টিও প্রাসঙ্গিক। আসলে বাংলাদেশে সম্প্রচারিত বিদেশি চ্যানেলগুলোতে যেসব পণ্যের বিজ্ঞাপন দেখানো হয় সেসব বাংলাদেশের বাজারেও বিক্রি হয়। তাই পণ্য বিক্রেতা বা আমদানিকারকরা আলাদাভাবে বাংলাদেশি চ্যানেলগুলোতে বিজ্ঞাপন দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন না। এতে দেশীয় চ্যানেলগুলো যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয় তেমনি সরকারও রাজস্ব বঞ্চিত হয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বহুজাতিক পণ্য নির্মাতারা বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে বিজ্ঞাপন নির্মাণ করে স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেল, সংবাদপত্রসহ অন্যান্য গণমাধ্যমে প্রচার না করায় দেশের বিজ্ঞাপন, চলচ্চিত্র ও গণমাধ্যমগুলো যেমন বঞ্চিত হচ্ছে তেমনি অসম প্রতিযোগিতারও মুখোমুখি হচ্ছে। এক্ষেত্রে নতুন সমস্যা হলো, হইচই, নেটফ্লিক্স, আমাজন, হট-স্টার, জি-ফাইভের মতো ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো বাংলাদেশের গ্রাহকদের সাবস্ক্রাইবার বানাচ্ছে এবং সেখানে বিপুল বিদেশি পণ্যের বিজ্ঞাপনও প্রচার করছে। এই বাস্তবতায় নতুন আসা ওটিটি-সহ সব ধরনের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে রাজস্ব আদায় এবং তাদের সঙ্গে অর্থ লেনদেনের নীতিকৌশল পর্যালোচনা করা এবং এ সংক্রান্ত আলাদা আইন প্রণয়ন ও কার্যকর করা জরুরি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত