সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

অন্ধকারে টিভি দর্শক

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২১, ০৩:৪৪ এএম

বিদেশি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো গত শুক্রবার থেকে বন্ধ রেখেছে কেব্ল অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব)। তবে আইন অনুযায়ী সরকারের পক্ষ থেকে ‘শুধু বিজ্ঞাপনসহ বিদেশি চ্যানেলগুলো খোলা রাখলে অভিযান করা হবে’ এমন ঘোষণার পর থেকে বিদেশি প্রায় সব চ্যানেলই বন্ধ রয়েছে। এতে টেলিভিশন দর্শকদের মধ্যে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। কেন বিদেশি চ্যানেল বন্ধ এবং ক্লিন ফিড চ্যানেলগুলো কেন বন্ধ রাখা হচ্ছে এ ব্যাপারে দর্শকদের মধ্যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

জানা গেছে, কোয়াব সরকারের সঙ্গে সব শর্তের বিষয়টি ভঙ্গ করে বিজ্ঞাপনমুক্ত চ্যানেল সিএনএন, আলজাজিরা, বিবিসিসহ ১৭টি চ্যানেলও বন্ধ রেখেছে। দর্শকদের মধ্য থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া পাওয়ার জন্য এবং বিদেশি চ্যানেল চালু করতে আন্দোলনের পরিস্থিতি তৈরিও চেষ্টা করছে একটি পক্ষ।

এদিকে গত শুক্রবার থেকে বিদেশি টেলিভিশন চ্যানেল বন্ধে দেশব্যাপী দর্শকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকেই স্থানীয় কেব্ল অপারেটরদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। অপারেটররা তাদের বলেছেন সরকারের সিদ্ধান্ত। সংবাদ ও খেলার চ্যানেলগুলোও অপারেটররা বন্ধ রেখেছেন ক্লিন ফিড চ্যানেল হওয়ার পরও। যদিও বেশিরভাগ দর্শকই জানেন না ক্লিন ফিড চ্যানেল কী এবং বিজ্ঞাপনযুক্ত বিদেশি চ্যানেলে দেশের আর্থিক ক্ষতি কতটা।

তবে গত দুদিনে আমাদের স্থানীয় প্রতিনিধি এবং ঢাকার প্রতিবেদকদের সঙ্গে প্রতিক্রিয়ায় দর্শকরা বিদেশি চ্যানেল বন্ধে হতাশা ব্যক্ত করলেও আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি জানার পর বুঝতে পেরেছেন। তবে দর্শকরা চান, সরকার এবং অপারেটরদের মধ্যে একটা ফলপ্রসূ আলোচনা হোক। বেশিরভাগ দর্শকই দেশের টেলিভিশনগুলোর নির্মিত অনুষ্ঠান, নাটক এবং প্রচারিত সিনেমার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের কর্মকর্তারা বলছেন, বিজ্ঞাপনযুক্ত বিদেশি চ্যানেল প্রচারের ফলে দেশ ২ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, ‘বিজ্ঞাপনসহ বিদেশি চ্যানেল দেশে সম্প্রচার করা যাবে না। এ নিয়ে আন্দোলনের কথা বলা অযৌক্তিক। যেসব চ্যানেল দেশের আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করছে এবং সংস্কৃতিকে চোখ রাঙাচ্ছে, সেগুলোর পক্ষে ওকালতি করা দেশের স্বার্থবিরোধী, আইনবিরোধী। আশা করি কেউ দেশের স্বার্থবিরোধী কাজে লিপ্ত হবেন না।’

গতকাল রবিবার হাছান মাহমুদ সচিবালয়ে এ প্রসঙ্গে আরও বলেন, ‘সরকার কোনো চ্যানেল বন্ধ করেনি। বাংলাদেশের আকাশ উন্মুক্ত। যেকোনো চ্যানেল সম্প্রচার করা যাবে, কিন্তু সেটা দেশের আইন মেনে। আইনানুযায়ী বাংলাদেশে যেকোনো বিদেশি চ্যানেল বিজ্ঞাপনমুক্তভাবে প্রচার করতে হয়। এটি ভারতসহ বিভিন্ন দেশে আছে।’ তিনি বলেন, ‘সরকার এ আইন বাস্তবায়নের জন্য দুই বছর আগে সংশ্লিষ্টদের বলেছিল। তাগাদা দেওয়া হয়েছিল। সবশেষ গত মাসে সব পক্ষকে নিয়ে বসে ১ অক্টোবর থেকে এ আইন কার্যকরের সিদ্ধান্ত হয়।’

বিদেশি বেশ কিছু চ্যানেলের ক্লিন ফিড থাকার পরও দেশে সম্প্রচার করা হচ্ছে না এমন অভিযোগের ভিত্তিতে হাছান মাহমুদ আরও বলেন, ‘বিবিসি, সিএনএন, আলজাজিরাসহ ১৭টির বেশি চ্যানেলে ক্লিন ফিডে আসে। অনেকে এগুলো চালাচ্ছেন না। এটি কেব্ল অপারেটর লাইসেন্সের শর্তবিরোধী। সুতরাং কেউ শর্ত ভঙ্গ করলে সেই অপরাধে অভিযুক্ত হবেন।’

কোয়াব নেতারা বলছেন, শুধু বাংলাদেশি চ্যানেল দিয়ে তাদের পক্ষে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। যে চ্যানেলগুলো ক্লিন ফিড দেয় সরকার সেগুলোর তালিকা সরবরাহ করলে তারা সেগুলো সম্প্রচার করবে।

বিদেশি চ্যানেলে বিজ্ঞাপনহীন সম্প্রচার চালানোর জন্য সরকার নির্দেশ দেওয়ার পর গত শুক্রবার থেকে দেশে সব বিদেশি চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ রেখেছেন কেব্ল অপারেটররা। এর ফলে সরকার এবং কেব্ল অপারেটররা মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। মাঝখান থেকে দর্শকরা তাদের পছন্দের অনুষ্ঠান দেখা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

ক্লিন ফিড চ্যানেলের বিষয়ে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এতে পুরো দায়িত্ব কিন্তু কেব্ল অপারেটরের নয়। কিন্তু কোনো কোনো কেব্ল অপারেটর এজেন্টদের পাশ কাটিয়ে স্যাটেলাইট থেকে পাইরেসি করে ডাউনলিংক করে। এজেন্ট ডাউনলিংকের অনুমোদনপ্রাপ্ত। কিন্তু কোনো কেব্ল অপারেটরের যদি পারমিশন না থাকে তাহলে ডাউনলিংক করতে পারবে না। তারা যেটা করে সেটা পাইরেসি এবং আইনবহির্ভূত। যেসব চ্যানেল ক্লিন ফিড পাঠায় না, তাদের এখানে এজেন্ট আছে। এই দায়িত্ব হলো সংশ্লিষ্ট চ্যানেল ও এজেন্টের।’

এদিকে কেব্ল অপারেটরস সমন্বয় কমিটি নামে কোয়াবের এক অংশ গত শনিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে চার দফা দাবি জানায়। এ দাবিগুলো হলো আজকের মধ্যে (৪ অক্টোবর) টিভি নিয়ে জটিলতার অবসান না হলে সমগ্র বাংলাদেশের কেব্ল অপারেটরদের নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনে যাবে তারা। সংগঠনের এক অংশের যুগ্ম আহ্বায়ক সৈয়দ মোশারফ আলী এ বিজ্ঞপ্তি দেন।

কোয়াবের নেতা আনোয়ার পারভেজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ক্লিন ফিড চালাতে পারব না। তাই কেব্ল টিভির সম্প্রচার বন্ধ রেখেছি। যতদিন বিষয়টির সুরাহা না হচ্ছে ততদিন সম্প্রচার বন্ধ থাকবে।’

সরকারের পক্ষ থেকে বলা ১৭ ক্লিন ফিড চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের বলা হয়েছে বিদেশি বিজ্ঞাপনযুক্ত চ্যানেল চালানো যাবে না। এখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে কোনো বিজ্ঞাপন যদি প্রচার হয়ে যায় সেটার দায় কে নেবে? কোয়াবের পক্ষে তো এত চ্যানেল মনিটর করা সম্ভব নয়। যে কারণে সব বিদেশি চ্যানেলই বন্ধ রাখা হয়েছে।’

আন্দোলনের হুমকি দিয়ে অন্য অংশের বিজ্ঞপ্তি সম্পর্কে আনোয়ার পারভেজ বলেন, ‘অপারেটরদের অ্যাসোসিয়েশনের একাংশের এ ঘোষণার সঙ্গে মূল অংশের সম্পৃক্ততা নেই।’

অপারেটরস সমন্বয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক সৈয়দ মোশারফ আলী জানিয়েছেন, তাদের দাবি নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তারা মন্ত্রী বরাবর একটি চিঠিও লিখেছেন। তিনি বলেন, ‘ক্লিন ফিডের বিষয়টা ব্রডকাস্টার ও লোকাল ডিস্ট্রিবিউটরদের ওপর নির্ভর করে। ক্লিন ফিড আনার বিষয়টাতে সময় লাগবে। আমরা চিঠিতে সময় চেয়েছি। আর বলেছি তার আগে সব চ্যানেল উন্মুক্ত করে দিতে।’

২০০৬ সালে এ আইন হয়েছে। অপারেটরদের বিজ্ঞাপন ছাড়া চ্যানেল সম্প্রচারের ব্যবস্থা করতে প্রায় দুই বছর সময় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এখন অপারেটররা এ আইন বাতিল করার কথা বলছেন। গত শনিবার বনানীতে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে কোয়াব নেতারা বলেছেন, এখন এ আইন বাস্তবায়ন করতে গেলে মানুষ টেলিভিশনবিমুখ হবে। এ জায়গা ইন্টারনেটভিত্তিক বিনোদনমাধ্যমগুলো দখলে নিয়ে যাবে। চ্যানেল অপারেটিং পদ্ধতি ডিজিটালাইজড (সেট টপ বক্সের মাধ্যমে সম্প্রচার) না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান ধারা অব্যাহত রাখাই ভালো।

তবে বাংলাদেশে একমাত্র ডিটিএইচ সংযোগকারী আকাশ ডিটিএইচ সংবাদভিত্তিক কয়েকটি বিদেশি চ্যানেলের সম্প্রচার করছে। এ সংযোগ যেসব গ্রাহকের বাসায় আছে তারা বিবিসি, সিএনএন, আলজাজিরা, এনএইচকে, ফ্রান্স টিভি দেখতে পাচ্ছেন। আকাশ ডিটিএইচের এক কর্মকর্তা বলেছেন, এ চ্যানেলগুলোতে বিজ্ঞাপন দেখায় না। এ কারণে সম্প্রচার অব্যাহত রাখা হয়েছে।

জানা গেছে, ক্লিন ফিড বা বিজ্ঞাপন ছাড়া বিদেশি চ্যানেলের সম্প্রচার হবে, এটা নতুন কোনো ধারণা নয়। বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপালেও ক্লিন ফিড বা বিজ্ঞাপন ছাড়া বিদেশি চ্যানেলের সম্প্রচার হয়। ইউরোপ-আমেরিকাতেও এটি আছে আরও আগে থেকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশি চ্যানেল বিজ্ঞাপনমুক্ত করে সম্প্রচার করা সম্ভব। বাংলাদেশে যেসব বিদেশি চ্যানেল সম্প্রচার হয় সেগুলোকে বিজ্ঞাপনমুক্ত করেই ডাউনলিংক করতে হবে। বাংলাদেশে যারা স্যাটেলাইট থেকে চ্যানেল ডাউনলিংক করে, তারা চ্যানেলের অনুষ্ঠানের ফাঁকে থাকা বিজ্ঞাপন বাদ দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে রিয়েল টাইমের চেয়ে কিছুটা দেরি হবে। আর চ্যানেলগুলো নিজেরা না করলে বাংলাদেশে যারা ডাউনলিংক করছে অর্থাৎ কেব্ল অপারেটর বা ডিটিএইচ সংযোগকারী ও ডিস্ট্রিবিউটরদেরই এটি করতে হবে।

দেশের টেলিভিশন চ্যানেলের মালিকদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন চ্যানেল ওনার্সের (অ্যাটকো) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মোজাম্মেল বাবু বলেন, ‘বিদেশি চ্যানেল বিজ্ঞাপনশূন্য না হওয়ায় বাংলাদেশের অন্তত দেড় হাজার কোটি টাকার ওপরে ক্ষতি হয়। বিদেশি চ্যানেলের কারণে এখন যে প্রায় কোনো বিদেশি পণ্যের বিজ্ঞাপন পাওয়া সম্ভব হয় না।’

বিভিন্ন টেলিভিশনের মালিকরা বলছেন, দেশে ভারতীয় বিভিন্ন চ্যানেলের দর্শকই এখানে বেশি। এসব চ্যানেলে বিদেশি যেসব পণ্যের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় সেগুলো বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হয়। আগে দেশের টেলিভিশনগুলোতে এসব পণ্যের বিজ্ঞাপন দেওয়া হতো। কিন্তু এখন পাওয়া যায় না। আবার নতুন বিজ্ঞাপন হতো বাংলাদেশের টেলিভিশনে দেখানোর জন্য। এখন তাও হচ্ছে না। ফলে নতুন বিজ্ঞাপনে বিনিয়োগসহ নানা খাতে বাংলাদেশ ২ হাজার কোটি টাকার বেশি আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

বিদেশি চ্যানেল চালু রাখতে আইনি নোটিস : বিদেশি চ্যানেল পুনরায় চালু করতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং কোয়াবকে আইনি নোটিস পাঠানো হয়েছে। গতকাল রবিবার রেজিস্ট্রি ডাকযোগে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খন্দকার হাসান শাহরিয়ার এ নোটিস পাঠান। এতে নোটিসগ্রহীতাদের সাত দিনের সময় দেওয়া হয়েছে। ব্যত্যয় হলে এ নিয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হবে বলে জানান নোটিসদাতা আইনজীবী।

নোটিসে বলা হয়েছে, বিদেশি চ্যানেলগুলোর সঙ্গে ক্লিন ফিড ছাড়া কীভাবে বাংলাদেশে সম্প্রচার অব্যাহত রাখা যায়, সে বিষয়ে কোনো আলোচনা না করে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় ও কোয়াবের এ সিদ্ধান্তের ফলে দেশের কোটি কোটি মানুষ বিদেশি চ্যানেল দেখার প্রয়োজনীয় ফি প্রদান করেও তা দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এর ফলে মানুষের বিনোদনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

এতে আরও বলা হয়, দেশের টিভি চ্যানেলগুলোর অনুষ্ঠানের মান অত্যন্ত নিম্নমানের। যে কারণে বেশিরভাগ মানুষ বিদেশি চ্যানেলগুলোতে বিনোদনের স্বাদ পান। কিন্তু এ হঠকারী সিদ্ধান্তের ফলে দেশের শিশু ও নারীরা যেমন বিনোদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তেমনি সংবাদ, খেলা না দেখতে পেয়ে অনেকে বিড়ম্বনায় পড়ছেন। এটি প্রচলিত আইনের পরিপন্থী। ক্লিন ফিড (বিজ্ঞাপনবিহীন) ছাড়া কোনো বিদেশি চ্যানেল সম্প্রচার করা হলে দেশের সব টিভি চ্যানেলেও ক্লিন ফিড সম্প্রচারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে নোটিসগ্রহীতারদের অনুরোধ জানানো হয় নোটিসে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত