বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই ২০২৪, ৯ শ্রাবণ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

সুখবর ব্যাংকারদের জন্য

আপডেট : ০৫ মে ২০২২, ১০:৫৭ পিএম

ব্যাংক কর্মকর্তারা ও গ্রাহকরা নানান সময়ে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হয়ে থাকেন। গ্রাহকদের সেসব অভিযোগের জন্য সুযোগ থাকলেও ব্যাংকারদের অভিযোগের সুযোগ ছিল না। অনেক সময় ব্যাংক কর্মকর্তাদের ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো তুলে ধরার কোনো সুযোগ থাকে না। সেসব অভিযোগ তুলে ধরে প্রতিকার পাওয়ার জন্য, আইনি ও নিয়ন্ত্রক অবকাঠামোর মধ্যে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কিত গ্রাহকদের স্বার্থ সুরক্ষায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিস বিভাগ কাজ করছে ২০১৭ সাল থেকে। যা দেশের জন্য ইতিবাচক। সুখবর ব্যাংকারদের জন্য। আবার কোনো গ্রাহক সেবার বা অন্যান্য যেকোনো বিষয়ে ব্যাংক থেকে কোনো প্রতিকার না পেলে তার জন্যও এই বিভাগ সুফলতা আনবে। এমন ধারণা নিয়ে, ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৫ ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রাবাজারের বাইরেও জনস্বার্থে কিছু কাজ করার সুযোগ রয়েছে। সেই সুযোগ থেকেই আমানতকারীসহ সব ধরনের গ্রাহকের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক এ-ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। অনেক ব্যাংকারও এই ব্যবস্থায় নিজেদের সমস্যার কথা জানাচ্ছেন। ফলে ব্যাংকের গ্রাহক, ব্যাংকার সব পর্যায়ে এ উদ্যোগটি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। হয়েছে প্রশংসিত। আমাদের দেশের ব্যাংক খাত দেশের অন্যান্য খাতের তুলনায় সুসংগঠিত। এর কারণ হলো এই খাতে প্রয়োজনীয় আইন-বিধি-নির্দেশনাও মেনে চলতে হয়।

দিন দিন ব্যাংক খাতের কর্মকাণ্ড অনেক বিস্তৃত হয়েছে। যুক্ত হয়েছে ফিন্যান্সিয়াল টেকনোলজি। ব্যাংকগুলো এখন মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসসহ বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা দিচ্ছে। গ্রাহকদের ভেতরে বেড়েছে কার্ডের ব্যবহার-প্রবণতা, বৈদেশিক লেনদেনসহ অন্যান্য কর্মকাণ্ডও বেড়েছে বহুগুণ। ফলে নিত্যনতুন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। ব্যাংকিং খাতে যে শতভাগ সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাও কিন্তু নয়। করপোরেট গভর্ন্যান্সও পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। অনেক সময় দেখা যায়, অনেক ব্যাংকার অভিযোগ করেন, তাদের অনেকে সময়মতো পদোন্নতি পাচ্ছেন না, মিলছে না প্রাপ্য আর্থিক সুবিধাদিও। যেমন একটি সরকারি ব্যাংকে টানা চার বছরে কোনো পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। অনেকের বেতন তার বেতন স্কেলের সর্বশেষ স্তরে পৌঁছে যাওয়ার কারণে বাজারের দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। তাহলে এসব ব্যাংক কর্মীরা কীসের আশায় কাজ করবেন। পদোন্নতির জন্য ডাক পেয়ে, তিনি পরের ধাপে না যেতেন তাহলেও তিনি মনে করতেন তার যোগ্যতা নেই বিধায় তিনি পরের ধাপে যেতে পারেননি। তিনি কিন্তু তার যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ পাচ্ছেন না। সামাজিকভাবে ও পারিবারিকভাবে তিনি সংকোচে থাকেন। রাখছেন নিজেকে গুটিয়ে। ছেলেমেয়েরা ভাবছে তার যোগ্যতা নেই বিধায় তিনি পদোন্নতি পাচ্ছেন না। ফলে তার বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে তিনি মিশতেও পারছেন না। সেই একই ব্যাংকে ওপরের দিকে একটা পদে ঠিকই গত বছর পদোন্নতি হয়েছে। ফলে এক ধরনের অসন্তোষ নিয়ে নিচের দিকের কর্মকর্তারা কাজ করছেন। এর প্রভাব পড়েছে গ্রাহক সেবায়। সেবার মান দিনের পর দিন কমছে। কেননা তারা মনে করছেন যেহেতু বেতন বাড়ে না বা পদোন্নতি নেই, কাজ করে কী লাভ। যেহেতু কাজের কোনো স্বীকৃতি নেই তাই তারা মানসিকভাবে ক্লান্ত। আবার একটি বেসরকারি ব্যাংকে এক দিনে ১৩৪ জন কর্মী ছাঁটাইয়ের খবরও আছে আমাদের কাছে। সবকিছু মিলিয়ে বলা যায় যে, ডিউ ডিলিজেন্সের ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে।

এখনো ব্যাংকিং খাত দেশের মানুষের কাছে একটা ভরসার জায়গা হিসেবে সুপরিচিত। ব্যাংক অনেক ভালো ভালো কাজ করে। সমাজের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ছাড়াও সামাজিক দায়বদ্ধতার স্থান থেকেও। ব্যাংকের মানবসম্পদের ব্যবহার অনেক সময় সঠিকভাবে হয় কি-না সেটা নিয়ে আলোচনার সুযোগ আছে। অনেক সময় দেখা যায়, কাজটি যার নয়, তিনি করছেন বা তাকে দিয়ে করানো হচ্ছে। অথবা যে কাজ যার করার কথা তিনি করছেন না। ফলে একজন ব্যক্তির কাছ থেকে তার সর্বোচ্চ আউটপুট পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিদিন নতুন কাজ, নতুন গ্রাহকের মুখোমুখি হতে হয়। ফলে সেই ব্যাংক কর্মকর্তাকে প্রতিদিন আপডেট থাকতে হবে। ব্যাংক তাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে তার ঘাটতিগুলো দূর করবে। কিন্তু দেখা যায়, কিছু ব্যক্তিকে বারবার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় ফলে তিনি আর প্রশিক্ষণ পেতে চান না। সেই ক্ষেত্রে অনেক সময় হিতে বিপরীত হয়। আবার অনেক সময় দেখা যায় এক ব্যক্তি এক ডেস্কে বা একই শাখায় বছরের পর বছর কাজ করছেন ফলে সেই কর্মকর্তার দক্ষতা অর্জন হচ্ছে না। আবার একইভাবে ব্যাংকের অন্য কোনো কর্মকর্তা তৈরি হচ্ছেন না, যিনি কিনা সেই ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে কাজ করতে পারবেন। অনেক সময় দেখা যায় বিভাগীয় প্রধান বা শাখাপ্রধান নিশ্চিন্তে থাকার জন্য সেই ব্যক্তির বদলি চান না। বা বদলি করা হলেও আবার তাকেই ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। ব্যাংকের গ্রাহকদের স্বার্থ সুরক্ষায় বা হয়রানি বা অভিযোগ কমানোর জন্য তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। সঠিক, নিরাপদ ও মানসম্পন্ন দ্রুত সেবা। এই তিনটি কাজ যদি করা যায়, তাহলে অভিযোগের কিছু থাকবে না বলে ধারণা করা যায়। ব্যাংকগুলো সে চেষ্টা করছেও। এজন্য প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে উন্নত সেবা দিতে ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ করছে যে হারে সেই হারে সেবার মান বাড়াতে পারছে না। আবার এও ঠিক যে, ব্যাংকের কার্যক্রমের ব্যাপ্তি যেভাবে বাড়ছে, তাতে সবকিছু একসঙ্গে ঠিক করে ফেলা যাবে না। তবে সমন্বয়ের ঘাটতি আছে। ব্যাংকের চাকরির শুরুতে কর্মীদের এক মাসের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সেখানে ব্যাংকের সামগ্রিক বিষয়ের ওপরে প্রশিক্ষণ এসব বিষয় থাকে। এরপর সময়ে সময়ে অন্যান্য প্রশিক্ষণেও এসব বিষয় থাকে। তবে সবচেয়ে যেটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা হচ্ছে কর্মীকে তার দায়িত্বের প্রতি যতœশীল হবে হবে। সততা ও নির্মোহভাবে কাজ করতে হবে। দায়িত্বশীলতা, সততা ও নির্মোহ মনোভাব কারও থাকলে গ্রাহক অসন্তুষ্ট হওয়ার কোনো কারণ নেই। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, কর্মকর্তার খুঁটির জোর থাকায় ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট তার প্রতি একটু নরম থাকার চেষ্টা করে।

একটা সময় ছিল যখন সরকারি ব্যাংকগুলোই দেশব্যাপী সেবা দিত। বেসরকারি ব্যাংক কম ছিল। যারা ছিল তারাও প্রধানত শহর পর্যায়ে কাজ করত। এক সময় বেসরকারি ব্যাংকের শহরে পাঁচটি শাখার বিপরীতে গ্রামাঞ্চলে একটি শাখা খোলা হতো। এখন ব্যাংকের সংখ্যা বেড়েছে। শহরাঞ্চল, গ্রামাঞ্চলের শাখার সংখ্যা প্রায় সমান সমান। এ ছাড়া এজেন্ট ব্যাংকিং, উপশাখা, এসএমই শাখা ইত্যাদিও এসেছে। ফলে ব্যাংকগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি গ্রাহককে সেবা দিচ্ছে। আর এখন এসএমই, এমএসএমই এসব খাতকেই ব্যাংক বেছে নিচ্ছে। তবে ব্যক্তিবিশেষে অনেক কিছু নির্ভর করে।  সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক খাতের সর্বনিম্ন বেতন নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের মত রয়েছে। বেসরকারি ব্যাংকের বেতন কাঠামো সরকারি খাতের তুলনায় ভালো। ব্যাংকগুলোর নিজস্ব সার্ভিস রুলস রয়েছে। নির্ধারিত বেতন কাঠামো রয়েছে। কিন্তু ব্যাংক ব্যবস্থাপনা শুধু মুনাফার দিকে তাকিয়ে কী করে খরচ কম করা যায় সেই চিন্তা মাথায় রেখে কর্মকর্তাদের সুযোগ-সুবিধার দিকে হাত দেয়। অতিরিক্ত লক্ষ্যমাত্রা দিয়ে তাদের ওপরে চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। ফলে এক ধরনের মানসিক যন্ত্রণা থেকে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। বেতন নির্ধারণের বিষয়টি নিয়ে এবিবি, বিএবি যৌথভাবে প্রতিবাদ করেছে। ফলে কাজটি এখন বিতর্কিত হয়ে পড়েছে। ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স (বিএবি) এবং এমডিদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ ব্যাংকে গিয়ে বিষয়টি তুলে ধরেন। বেসরকারি তফসিলি বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ন্যূনতম বেতন-ভাতা নির্ধারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি এবং নীতি বিভাগের দেওয়া দুটি বিজ্ঞপ্তির বৈধতা হাইকোর্ট পর্যন্ত পৌঁছেছে।

ব্যাংকের কর্মকর্তারা ও কর্মচারীরা হলেন এর চালিকাশক্তি। স্বল্প বেতন আর অতিরিক্ত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে, পদোন্নতি না দিয়ে ব্যাংকের মুনাফা কোনোভাবেই কাম্য নয়। যদিও বেসরকারি ব্যাংকের মালিক তার প্রতিষ্ঠানের বেতন কাঠামো ঠিক করবেন সেটা তার নিজের পর্ষদের ওপরে ছেড়ে দেন। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, নিজের ঘরের ভেতরে এক ধরনের চাপা উত্তেজনা কাজ করে বা বেতন কম পাওয়ার ফলে কর্মকর্তারা নানান ধরনের অপরাধের সঙ্গে নিজেকে সংযুক্ত করেন। দেশে বিশেষ করে ঢাকা শহরের জীবনযাত্রার খরচ এখন অনেক বেশি। তাই এই জীবনের সঙ্গে তাল মেলাতে তারাসহ সাধারণ মানুষ হিমশিম খাচ্ছেন। ব্যাংক একটা নিয়মের ভেতরে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান, সবার আশা থাকবে, বাংলাদেশ ব্যাংকের বেতন কাঠামো নিয়ে ব্যাংক মালিক ও কর্মকর্তারা নতুন করে ভাবনাচিন্তা করবেন এবং তাদের জনবলের কথা ভেবে এই বেতন কাঠামো পুনর্নির্ধারণ করবেন। নিয়মিত পদোন্নতি দেবেন, বছরে ১৫ দিনের আবশ্যিক ছুটি নিশ্চিত করবেন। এর ফলে কর্মকর্তাদের কর্মতৎপরতা বৃদ্ধি পাবে। বাড়বে ব্যাংকের প্রতি, কাজের প্রতি তাদের আগ্রহ। যে কোনো ভালো কাজের বা সেবার পেছনে কাজ করে মানসিক প্রশান্তি। আর এই স্থিরতা ও প্রশান্তি একমাত্র ব্যাংক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ দিতেই পারেন। যদি তারা ব্যাংক কর্মকর্তাদের এদের নিজের সন্তান মনে করেন। নিজেদের মুনাফা বা অন্য সুবিধাদির সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকার ও গ্রাহকদের সুবিধার কথা ভাবনায় আনা দরকার।

লেখক ব্যাংকার ও গবেষক

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত